কক্সবাজার

ভাসমান অপরাধীদের অবাধ রাজত্ব

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২৩, ১২:১৫ পিএম

নাতাশা মার্জিয়া ও অর্ণব মোস্তাকিন সুযোগ পেলেই সপরিবারে ছোটেন কক্সবাজারে। কিন্তু বিনোদনের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা তারা পান না। কক্সবাজারে হোটেলভাড়া আকাশচুম্বী, খাবারের দামও তা-ই। ঘুরতে বেরোলে অটোরিকশা থেকে শুরু করে সব বাহনে আদায় করা হয় ধারণার অতিরিক্ত টাকা। বিচগুলোতে হকারদের উৎপাত, তদারকির কেউ নেই। এ কারণে কক্সবাজারে তারা যেতে চান না। নাতাশা-অর্ণবের মতো বেশিরভাগ পর্যটকের একই অভিযোগ। ট্যুরিজম এবং তার অনুষঙ্গী আতিথেয়তার (হসপিটালিটি) বিষয়ে কারও কোনো নজর নেই। কক্সবাজার নামেই পর্যটন শহর।

একটি পর্যটনকেন্দ্রের বিকাশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থানগুলোর নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং অতিথিপরায়ণতা। রেস্তোরাঁ ও আবাসন সুবিধা, যানবাহন সুবিধা, নাইট লাইফ, স্ট্রিট ফুড- এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অথচ সাগরপাড়ের কক্সবাজারে প্রাকৃতিকভাবে থাকা দর্শনীয় স্থান ছাড়া আর কিছু নেই। সন্ধ্যা হলে কক্সবাজার ঘুমায়। ঘুমন্ত শহরে পর্যটনও ঘুমিয়েই থাকে। এ কারণে জিডিপির মাত্র ৪ শতাংশ আসে পর্যটনশিল্প থেকে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য পযর্টনশিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা সংশ্লিষ্টদের নেই।

জেলা প্রশাসন, পর্যটন করপোরেশন ও সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার জেলায় পাহাড়, সমুদ্র, নদী, ঝরনা, পাথুরে সৈকত, পাথুরে পাহাড়, আদিনাথ মন্দির, সোনাদিয়া দ্বীপ, রামুর বৌদ্ধবিহার, রাবার বাগান, চা বাগান, গর্জন বিহার, টেকনাফের মাথিনের কুয়া, সেন্টমার্টিন দ্বীপ, কুতুবদিয়ার বাতিঘর ছাড়াও অসংখ্য দর্শনীয় স্থান আছে। এসব দেখতে প্রতিবছর লাখ লাখ দেশি পর্যটক কক্সবাজারে এলেও বিদেশি পর্যটক প্রায় শূন্যের কোঠায়।

পর্যাপ্ত বিনোদন-আমোদের ব্যবস্থা না থাকায় বিদেশি পর্যটকরা ক্রমেই কক্সবাজারবিমুখ হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ না থাকা, পর্যটন করপোরেশনের কর্তৃত্ব না থাকা ও অন্যান্য সংস্থার দ্বন্দ্বের কারণে পর্যটনে অগ্রগতি নেই।

কক্সবাজার প্রেস ক্লাবের সভাপতি আবু তাহের চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি ভ্রমণপিপাসু লোক। বিভিন্ন দেশ ঘুরেছি। সেখানকার পর্যটন রেস্তোরাঁ, আবাসন, নাইট লাইফ ও স্ট্রিট ফুডে ভর করেই চলে। আমাদের প্রতিবেশী দেশেও তা-ই। আমাদের প্রশাসনই শুধু এসবের ধার ধারে না। এ শহর সন্ধ্যার পর ঘুমিয়ে পড়ে। বিনোদনহীন অবস্থায় হোটেলে রাত কাটায় পর্যটকরা। আমাদের এখানে স্ট্রিট ফুডকে উৎসাহিত না করে আনহাইজিনিক আখ্যা দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বন্ধ করে দেওয়া হয়, অথচ একে স্বাস্থ্যকর রাখার প্রয়াস নেই। স্ট্রিট ফুড ছাড়া পর্যটন অকল্পনীয়। স্ট্রিট ফুড বিক্রেতাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে মানসম্মত খাবার পরিবেশনে দক্ষ করা দরকার।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের পর্যটনে স্থানীয়দের অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে। এ কারণে স্থানীয়দের মধ্যে বেকারত্ব রয়েছে, ফলে পর্যটন জোনে ছিনতাইসহ নানা অপরাধ হয়। প্রশাসন এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষ স্থানীয় যুবকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে পর্যটনের কাজে লাগাতে পারে। কিন্তু এ শহরে তা হয় না।’

বে ভিউ রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী আবু তাহের বলেন, “বিদেশিদের টানতে নাইট লাইফের ব্যবস্থা করতেই হবে। অথচ এখনো একটি ‘নাইট বাজার’ বসানো যায়নি। সংশ্লিষ্টদের ভাবনায় তা আছে কি না জানা নেই। পর্যটন করপোরেশন নিজেরই ব্যবসাতে লোকসান গুনছে। ব্যবসা করা তাদের কাজ নয়। তাদের কাজ বিভিন্ন আইডিয়া উদ্যোক্তাদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে পর্যটনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। কেউ যদি তার হোটেলের রুফটপে বা সামনের খালি জায়গায় বিনোদনের জন্য গানের আসর বসাতে চায়, তাহলে বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির অনুমোদন লাগে। আর তা পেতে লাগে ছয় মাস। অনুমতির মেয়াদ এক বা দুই মাস। মোটা টাকাও দিতে হয়। মেয়াদ শেষে রিনিউয়ের জন্য আবার টাকা।’

সৈকতের লাবণী পয়েন্ট থেকে কলাতলী পয়েন্ট পর্যন্ত তিন কিলোমিটার এলাকায় সবচেয়ে বেশি লোক জড়ো হয়। কিন্তু এলাকায় অসুস্থ পর্যটকদের প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই, মায়েদের জন্য নেই ব্রেস্ট ফিডিং সেন্টার। এ শহরে অত্যাধুনিক মানের কোনো শপিং মল নেই, থিয়েটার হল ও সিনেমা হল নেই। ডিসকো বার, ক্যাসিনো, দেশি-বিদেশি সার্কাস প্রদর্শনীর ব্যবস্থাও নেই। বারের সংখ্যা খুবই কম।

সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে পর্যটন করপোরেশন কক্সবাজারের ম্যানেজার রায়হান উদ্দিন আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিদেশি পর্যটক টানতে বেসরকারি উদ্যোগ না থাকলেও সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে। সেসব কার্যকর করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ, রেললাইন সম্প্রসারণ ও আইকনিক রেলস্টেশন নির্মাণসহ টেকনাফের সাবরাংয়ে গড়ে তোলা হচ্ছে একান্ত পর্যটন এলাকা। বিদেশিদের টানতে এ জোনে থাকবে ডিসকো বার, ক্যাসিনোসহ নাইট লাইফের সব আয়োজন।’

তিনি বলেন, ‘একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বছর দুয়েক শহরের মোটেল প্রবালের একটি অংশে চায়নার নারীদের একটি সার্কাস দেখানোর ব্যবস্থা করি। মাসখানেক না যেতেই নানা সংস্থার বিরোধিতায় সেটি বন্ধ হয়ে যায়। প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা শিগগিরই করা হবে। ব্রেস্ট ফিডিং সেন্টার ট্যুরিস্ট পুলিশ করেছিল কিন্তু কেন তা বন্ধ হয়েছে আমার জানা নেই।’

কক্সবাজার হোটেল-মোটেল অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছুটির দিনগুলোতে পর্যটক বেড়ে যায়। কক্সবাজারে বেড়াতে আসা এক-দেড় লাখ মানুষের আবাসন ব্যবস্থা আছে। তারপরও এখানে আসার পর অনেকে থাকার জায়গা খোঁজেন। সিট ফাঁকা না থাকায় তাদের বেশি ভাড়া দিতে হয়। আগে থেকে থাকার ব্যবস্থা না করে কক্সবাজারে আসা উচিত নয়। তবে অন্যান্য দেশের তুলনায় কক্সবাজারে হোটেল ভাড়া বেশি। প্রশাসনের নজর নেই, তাই এসব হয়।’

তিনি বলেন, ‘কক্সবাজারে দখলদারি বেড়েছে। ঝাউবাগান সাবাড় হয়ে যাচ্ছে। পর্যটকদের অবারিত সুযোগ দেওয়া যাচ্ছে না। হোটেলগুলো ইচ্ছেমাফিক ভাড়া নিচ্ছে। যেখানে সেখানে ময়লা-আবর্জনা। মোড়ে মোড়ে শুঁটকির দোকান, পর্যটকরা বিরক্ত হন।’

কক্সবাজার জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত পৃথিবীর দীর্ঘতম অখণ্ডিত সমুদ্রসৈকত। ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকত বালুকাময়, কাদা নেই। সৈকতসংলগ্ন এলাকায় শামুক-ঝিনুক নানা প্রজাতির প্রবালসমৃদ্ধ বিপণিবিতান, হোটেল-মোটেল-কটেজ, সজ্জিত বার্মিজ মার্কেটে পর্যটকদের বিচরণে পর্যটন মৌসুমে প্রাণচাঞ্চল থাকে। তবু নানা সমস্যায় জর্জরিত কক্সবাজার পর্যটন শহর। আছে ভাসমান অপরাধী। আমরা চেষ্টা করছি অপরাধমুক্ত পর্যটন শহর গড়ে তুলতে। কিন্তু প্রশাসনের একটি মহল সহায়তা করছে না।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত