যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে খাদ্য বন্ধ করেছে ইসরায়েল

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৩, ০৭:৩২ এএম

পঞ্চাশ বছর আগে ১৯৭৩ সালে তৃতীয় আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর আরব দেশগুলোর সঙ্গে আর কোনো যুদ্ধ না হলেও ফিলিস্তিন-ইসরায়েল দ্বন্দ্ব-সংঘাত বন্ধ হয়নি। যদিও সংঘাত বন্ধে শান্তির ফরমুলা হিসেবে বিভিন্ন সময় দুই রাষ্ট্র সমাধানের কথা বলেছে, কিন্তু সেটা আর বাস্তবে রূপ নেয়নি। ফিলিস্তিন এবং ইসরায়েল দুটি আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্রের সমাধান প্রথম এসেছিল ১৯৪৭ সালের নভেম্বরে জাতিসংঘের মাধ্যমে। সে সময় বলা হয়, ইসরায়েল হবে ইহুদিদের জন্য এবং ফিলিস্তিন আরবদের জন্য। তবে ইহুদিরা মোট ভূখণ্ডের ১০ শতাংশের মালিক হলেও তাদের দেওয়া হয় মোট জমির অর্ধেক। যেটা আরবরা মানেনি। এরই ধারাবাহিকতাতেই হয় প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ। কিন্তু একটা সময় এসে ঠিকই ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিন উভয়পক্ষই দুই রাষ্ট্র সমাধানে ঐকমত্য হয়। কিন্তু সেটা কীভাবে হলো? এবং পরে কেন আবার ব্যর্থও হলো সেটা একটা বড় প্রশ্ন। ফিলিস্তিন এবং ইসরায়েল পৃথক দুটি রাষ্ট্রের ধারণা প্রথমবারের মতো বাস্তবতার দিকে এগোতে শুরু করে ১৯৯৩ সালে নরওয়ের অসলোতে ফিলিস্তিন-ইসরায়েলের শান্তিচুক্তির মাধ্যমে। যেটা ‘অসলো অ্যাকর্ড’ নামে পরিচিতি।

অসলোতে দুই রাষ্ট্র সমাধান মেনে নেওয়া হলেও সেই রাষ্ট্র কবে গঠন হবে তার কোনো সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি। এমনকি ইসরায়েলের বাইরে আলাদা একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চারটি বিষয়েরও কোনো সমাধান করা হয়নি। এখানে মূল বিষয়গুলো হচ্ছে দুই রাষ্ট্রের সীমান্ত কোথায়, কীভাবে নির্ধারণ হবে সেটা। জেরুজালেম কার অধীনে থাকবে। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ভেতরে থাকা ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের কীভাবে সরিয়ে নেওয়া হবে। এবং ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের পর থেকে ইসরায়েলের ভেতরে থাকা যেসব ফিলিস্তিনি বাস্তচ্যুত হয়েছেন, তারা ইসরায়েলে কীভাবে ফিরবেন। চুক্তিতে বলা হয়েছিল, পাঁচ বছরের মধ্যে একটি ফিলিস্তিনি কর্র্তৃপক্ষ গঠনের পর এগুলো আলোচনার ভিত্তিতে পরে ঠিক করা হবে। কিন্তু সেটা আর কখনোই হয়নি। ১৯৯৬ সালে ইসরায়েলে ডানপন্থিরা ক্ষমতায় আসার পর ইসরায়েলের সরকারও আর শান্তি প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে চায়নি। পরবর্তী বছরগুলোতে বিভিন্ন সময় দুই পক্ষের বৈঠক হলেও সমাধান আসেনি।

এ সময় ইসরায়েল মূলত নজর দিয়েছে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণের ওপর এবং জেরুজালেমকে তারা ইসরায়েলের রাজধানীও ঘোষণা করেছে। আমেরিকা সেটাকে স্বীকৃতিও দিয়েছে। সব মিলিয়ে এখন যে বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, তাতে করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব কি-না তা নিয়ে অনেকের মধ্যেই সন্দেহ রয়েছে।

এদিকে ফিলিস্তিনের গাজায় চলমান সংঘাত নিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বক্তব্যেও প্রতিক্রিয়ায় চরম ঔদ্ধত্য দেখিয়েছে ইসরায়েল। জাতিসংঘের কর্মীদের ভিসা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরকার। আন্তোনিও গুতেরেসের পদত্যাগ দাবি করে তেল আবিব আরও হুমকি দিয়েছে, জাতিসংঘকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার সময় এসেছে এবার। সম্প্রতি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশনে আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, ইসরায়েলে ভয়ংকর এক হামলা চালিয়েছে হামাস। তবে এ হামলা যে হঠাৎ শূন্য থেকে হয়নি, এটাও সবাইকে বুঝতে হবে। ফিলিস্তিনের জনগণ ৫৬ বছর ধরে শ্বাসরুদ্ধকর দখলদারির শিকার। তারা তাদের ভূখণ্ড দখল করে অবৈধ ইহুদি বসতি দেখেছেন। তারা সহিংসতায় জর্জরিত হয়ে চলেছেন। জাতিসংঘ প্রধান আরও বলেন, গাজায় ইসরায়েল যা করছে, তা স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্দশা যেমন হামাসের ভয়ংকর হামলার ন্যায্যতা দিতে পারে না। তেমনি আবার এ হামলার জেরে জাতিগতভাবে ফিলিস্তিনি জনগণকে শাস্তি দেওয়া কখনো ন্যায্যতা পেতে পারে না।

গুতেরেসের বক্তব্যের পরপরই ঔদ্ধত্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া জানায় ইসরায়েল। গুতেরেসের এ মন্তব্যের পর সেদিনই তার পদত্যাগ দাবি করে বক্তব্য দেন জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত গিলার্ড এরডান। তিনি বলেন, গুতেরেস জাতিসংঘের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত নন। তার পদত্যাগ করা উচিত। ইসরায়েলের এক সংবাদমাধ্যমকে এরডান বলেন, গুতেরেসের বক্তব্যের কারণে আমরা জাতিসংঘের কর্মীদের ভিসা দেব না। ইতিমধ্যে জাতিসংঘের মানবিক ত্রাণসহায়তা বিষয়ক প্রধান মার্টিন গ্রিফিথসকে ভিসা দেওয়া হয়নি। এরপরও গাজায় যুদ্ধবিরতির জন্য আবারও আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ।

তবে সহিংসতা বন্ধে বিভক্ত হয়ে পড়েছে বিশ্ব। আরব বিশ্বের পাশাপাশি রাশিয়া ও চীন যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানালেও পশ্চিমা দেশগুলো এখনো ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা চালানোর অনড় অবস্থানের পক্ষে। এদিকে গাজায় খাবার ও পানির তীব্র হাহাকার চলছে। আগে থেকেই নাজুক পরিস্থিতিতে থাকা গাজার বাসিন্দাদের এখন অনাহার-অর্ধাহারে দিন কাটছে। জাতিসংঘ বলছে, ইসরায়েলি হামলায় গাজার অর্ধেকের বেশি বাসিন্দা গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। সামান্য ত্রাণসহায়তায় নির্ভরশীল তারা। দাতব্য সংস্থাগুলোর দেওয়া খাবারের জন্য মানুষের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে গাজা জুড়ে। সংস্থাগুলো বলছে, তাদের কাছে যে খাবার আছে, তা দিয়ে এতসংখ্যক মানুষের চাহিদা মিটছে না। দাতব্য সংস্থা অক্সফাম বলছে, গাজাবাসীর বিরুদ্ধে অনাহারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সংস্থাটি বলছে, যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে খাদ্য বন্ধ করে দেওয়াকে কোনোভাবেই বৈধতা দেওয়ার সুযোগ নেই। গাজায় অব্যাহত বোমাবর্ষণে ক্ষতির শিকার হওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি, ওষুধ ও চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মী সংকটে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক গাজার হাসপাতাল। এতে করে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় চরম বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক গবেষকরা মনে করেন, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন করা খুবই চ্যালেঞ্জিং, এটা বাস্তবায়ন করা ১৯৯০-এর দশকের তুলনায় খুবই কঠিন। কারণ, পশ্চিম তীর এবং জেরুজালেমের ইহুদি বসতি। ১৯৯৩ সালে অসলো চুক্তির সময় এটা ছিল এক লাখ ২০ হাজার। গেল তিন দশকে ইহুদি বসতিস্থাপনকারী বেড়ে হয়েছে সাত লাখ। এছাড়া খোদ ইসরায়েলের আইন অনুযায়ীই অবৈধ এরকম ইহুদি বসতিও আছে। এরকম বসতি সম্প্রসারণ এবং ইসরায়েলের রাজনীতিতে এর প্রবল সমর্থনের কারণে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন কঠিন হয়ে পড়েছে। তাছাড়া দুই রাষ্ট্র সমাধানের প্রতিও এখন আর ইসরায়েলের আগ্রহ নেই। অন্যদিকে ফিলিস্তিনিরাও হামাস এবং ফাতাহ দুই দলে বিভক্ত। এবং তাদের মধ্যে ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য কথা বলা বা শান্তি প্রক্রিয়া এগুনোর মতো একক এবং বিশ্বস্ত নেতা নেই। তাহলে কি দুই রাষ্ট্র সমাধান আর সম্ভব নয়? ইসরায়েলের তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেইর লিটভ্যাক অবশ্য বলছেন, সুযোগ এখনো আছে। কিন্তু ইসরায়েল কি দুই রাষ্ট্র সমাধান আর চায়? লিটভ্যাক বলছেন, ইসরায়েল সেটা চায় না। তারা যেটাকে সমাধান মনে করে সেটা হচ্ছে, পরিস্থিতি যেভাবে আছে, সেভাবেই থাকুক। কিন্তু ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনের মধ্যে এখন যে নতুন যুদ্ধাবস্থা, সেখানে যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা অচলাবস্থার পরিবর্তন কে করবে সেটা একটা বড় প্রশ্ন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শান্তির উদ্যোগ নিলে সুফল আসতে পারে। ঐতিহাসিকভাবে আমেরিকা যখন মধ্যপ্রাচ্যে কিছু করতে চেয়েছে, তখন সেটার বাস্তবায়নও হয়েছে। মিসর-ইসরায়েল শান্তিচুক্তি, জর্ডানের সঙ্গে চুক্তি এমনকি সাম্প্রতিককালে আব্রাহাম অ্যাকর্ড-এর সবগুলোর পেছনে আমেরিকার ভূমিকা আছে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা নিয়ে আমেরিকার আগ্রহ আছে কিনা, এমন প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। দুই যুগ আগে নাইন-ইলেভেনের পর আমেরিকার চোখ অসলো শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন থেকে সরে যায় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে। সেটা শেষ হলে তারা ব্যস্ত হয়ে পড়ে ইরান, রাশিয়া, চীন নিয়ে। কিন্তু এখন আমেরিকাকে আবারও মধ্যপ্রাচ্যে সক্রিয় হতে হচ্ছে। কারণ এখানে অবহেলা করলে এর ফল সবাইকেই ভোগ করতে হবে, কিছু সময় পর পর সংঘাত সামনে আসবে। আমেরিকা শান্তির উদোগ নিলে হয়তো সেটা আশা দেখাতে পারে। কিন্তু এখন ইসরায়েল-গাজা সংকট যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে এগুচ্ছে, সেখানে আমেরিকা-ইসরায়েল কিংবা হামাস, শান্তির কথা কেউই বলছে না। সংকটটা এখানেই। যাইহোক শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি কোনদিকে মোড় নেয় তা সময়ই বলে দেবে।

লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত