তাকবির পাঠ প্রধান প্রধান ইবাদতের নিদর্শন

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২৩, ১১:৩৭ এএম

সৃষ্টিকর্তা দয়াময় আল্লাহর জন্য প্রকৃত আনুগত্য ও দাসত্ব তৈরি হয় চূড়ান্তরূপে তার প্রতি মুহব্বত পোষণ ও অবনমন হওয়া থেকে। মহান আল্লাহর নাম ও গুণাবলি সম্পর্কিত জ্ঞানই সব জ্ঞানের মূল ও শ্রেষ্ঠাংশ, এটা এমন জ্ঞান যার ওপর আল্লাহর একত্ব ও ইবাদত প্রতিষ্ঠিত। মানুষ তাদের সৃষ্টিকর্তাকে জানার বিষয়ে অধিক মুখাপেক্ষী। তার নাম ও গুণাবলি সম্পর্কে জ্ঞানার্জন ছাড়া তা জানার কোনো উপায় নেই। বস্তুত আল্লাহর নাম ও গুণাবলি সম্পর্কিত জ্ঞানের পরিমাণ অনুপাতে রবের প্রতি বান্দার দাসত্ব, সুসম্পর্ক, মুহব্বত ও সম্মান প্রদর্শন হয়ে থাকে। তাই আল্লাহর নাম ও গুণাবলি সম্পর্কে বান্দার জ্ঞান যত বৃদ্ধি পাবে, ততই তার ইমান বৃদ্ধি পাবে ও বিশ্বাস সুদৃঢ় হবে। আল্লাহ বান্দাকে তার কাছে সে পর্যায়ে রাখেন বান্দা নিজের হৃদয়ে আল্লাহকে যে মর্যাদায় রাখে।

সর্বশক্তিমান প্রভুর সব নামই প্রশংসাবাচক, মহান আল্লাহ এসবগুলোকে সুন্দর বলে বর্ণনা করেছেন। কেননা এগুলো পূর্ণতার গুণের প্রমাণবাহক। তার একটি নাম হলো ‘আল-কাবির’ তথা মহান; তিনি স্বীয় সত্তায়, নাম ও গুণাবলিতে সুমহান, মহিমা ও অহংকারে ভূষিত।

যে ব্যক্তি উপলব্ধি করবে যে, আল্লাহতায়ালা তার সৃষ্টজীবের ওপর সমুন্নত এবং তিনি সবকিছুর চেয়ে মহান; তখন সে আল্লাহতায়ালাকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করবে। ফলে সে ছাড়া অন্য কারও উপাসনা করবে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর এটা এজন্য যে, নিশ্চয় আল্লাহই সত্য এবং তারা তার পরিবর্তে যাকে ডাকে, অবশ্যই তা বাতিল। আর নিশ্চয় আল্লাহ তো সমুচ্চ, সুমহান।’ -সুরা আল-হজ : ৬২

সৃষ্টজীব সংখ্যায় অগণিত, সুমহান আল্লাহ ছাড়া কেউ এগুলোর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য জ্ঞান আয়ত্ত ও উপলব্ধি করতে পারে না। মহান আল্লাহ কালাম তথা কথা বলার গুণে গুণান্বিত এবং তার কথা মহিমা ও মহত্ত্ব দ্বারা বিশেষায়িত। নবী কারিম (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা যখন আসমানে কোনো হুকুম জারি করেন অর্থাৎ স্বীয় ইচ্ছায় কোনো বিষয়ে কথা বলেন, তখন ফেরেশতারা তার কথার প্রতি আনুগত্য অর্থাৎ বিনয় প্রকাশার্থে স্বীয় পাখাসমূহ হেলাতে থাকে। তাদের পাখার হেলানোর ধ্বনি যেন পাথরের ওপর শিকলের ঝনঝনির ধ্বনি। এরপর তাদের হৃদয় থেকে যখন ভীতি দূরীভূত করা হয় তখন তারা বলে অর্থাৎ যখন তাদের ভয় ও আতঙ্ক কেটে যায় তখন। ফেরেশতারা একে অপরকে বলতে থাকে, তোমাদের প্রতিপালক কী বলেছেন? তারা বলে, যা সত্য তিনি তাই বলেছেন এবং তিনি সুউচ্চ মহান।’ অহংকার ও কর্র্তৃত্ব আমাদের প্রভুরই, তিনিই তার সৃষ্টিকুলের শাসক, তাদের প্রতি ন্যায়পরায়ণ। ইরশাদ হয়েছে, ‘সুতরাং যাবতীয় কর্র্তৃত্ব সমুচ্চ মহান আল্লাহরই।’ -সুরা আল মুমিন : ১২

আল্লাহতায়ালা তার বান্দাদের তার বড়ত্ব ঘোষণা করতে আদেশ করেছেন, তাকে সম্মান প্রদর্শন এবং তার প্রতি আরোপিত সমস্ত দোষত্রুটি থেকে তাকে পবিত্র ঘোষণা করত। নভোম-ল ও পৃথিবীবাসী সবার ইবাদতের উদ্দেশ্য হলো তার বড়ত্ব ও মহিমা ঘোষণা এবং তাকে সম্মান জানানো। এ কারণেই তাকবির পাঠ প্রধান প্রধান ইবাদতের একটি নিদর্শন। যেমন নামাজের তাকবির হলো আল্লাহর অহংকার ও মহিমার সামনে নিজেকে অবনমিত ও বিনয়ীরূপে প্রকাশ করা। দিনের নামাজের তাকবিরসমূহ আজান থেকে শুরু করে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এবং এর নিয়মিত সুন্নতের জিকির-আজকার শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনশত পঁচাত্তরটি তাকবির।

হজ হলো দীনের একটি দৃশ্যমান নিদর্শন। এর স্লোগান হলো একত্ববাদের ঘোষণা এবং সাফা-মারওয়াতে ও পাথর নিক্ষেপের সময়ে ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি দিয়ে আল্লাহর প্রশংসা করা।

আল্লাহর কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ দিন হলো জিলহজের প্রথম দশ দিন। এ দিনগুলোতে তার কাছে অধিক প্রিয় আমল হলো তাকবির ধ্বনি দেওয়া। নবী কারিম (সা.) বলেছেন, ‘এমন কোনো দিন নেই যার আমল জিলহজ মাসের এই দশ দিনের আমল থেকে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়। তাই তোমরা এ সময়ে তাহলিল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ), তাকবির (আল্লাহু আকবার) ও তাহমিদ (আলহামদুলিল্লাহ) বেশি বেশি করে পড়ো।’ -মুসনাদে আহমাদ

আনন্দ উৎসবে তাকবির ধ্বনি দেওয়া সুন্নত। যেমন দুই ঈদে, আনন্দ উদযাপনে এবং যখন সুসংবাদ শোনা যায়। নবী কারিম (সা.) বলেন, ‘আমি আশা করি যে, জান্নাতবাসীদের মধ্যে তোমরাই অর্ধেক হবে। হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, তখন আমরা তাকবির ধ্বনি দিলাম।’ -সহিহ বোখারি

আল্লাহর কোনো নিদর্শন পরিলক্ষিত হলে যেমন সূর্যগ্রহণ এবং বিস্ময়কর বা ভয়ংকর মুহূর্তে তাকবির ধ্বনির মাধ্যমে আল্লাহর মহত্ত্ব প্রকাশ করতে হয়। কিছু লোক নবী কারিম (সা.)-এর কাছে আবেদন করেন যে, তিনি যেন তাদের জন্য একটি গাছ নির্ধারণ করে দেন যা দ্বারা তারা বরকত গ্রহণ করবে। তখন তিনি বললেন, ‘আল্লাহু আকবার! এটা তো বনি ইসরাইলের কথার মতো হলো। তারা বলেছিল, এদের (কাফেরদের) যেমন অনেক ইলাহ (উপাস্য) আছে আমাদের জন্যও সেরূপ ইলাহ বানিয়ে দাও।’-নাসায়ি

যাত্রা শুরুর সময় উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা ও ভয় থাকতে পারে। তাকবির ধ্বনি দিয়ে আল্লাহর প্রশংসা করা ভ্রমণকারীর জন্য সান্ত্বনা এবং একাকিত্ব অনুভবকারীর জন্য প্রশান্তিস্বরূপ। নবী কারিম (সা.) সফরে বের হওয়ার সময় যখন তার উটের ওপরে বসতেন, তখন তিনি তিনবার ‘আল্লাহু আকবার’ বলতেন।’ -সহিহ মুসলিম

সৃষ্টিকুলের মধ্যে যেগুলোতে কোনো মহত্ত্ব রয়েছে, যেমন- উঁচু স্থান; এগুলো প্রত্যক্ষ করার সময় তাকবির পাঠ করা জায়েজ। হজরত জাবির (রা.) বলেন, ‘আমরা যখন উঁচুতে আরোহণ করতাম তখন বলতাম ‘আল্লাহু আকবার।’ -সহিহ বোখারি

তিনি যখন জমিনের কোনো উঁচু স্থানে উঠতেন তখন তাকবির দিতেন। মুসলিম ব্যক্তি তার দিনের পরিসমাপ্তি ঘটায় তাকবির পাঠের মাধ্যমে। সে যখন বিছানায় ঘুমাতে যায় তখন তেত্রিশবার করে তার রবের তাসবিহ ও তাহমিদ পাঠ করে এবং চৌত্রিশবার তাকবির পাঠ করে। মহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তাকবির পাঠ শরিয়তসম্মত। হেদায়েত লাভ একটি বিশাল নেয়ামত, যা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের দাবি রাখে। এ নেয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের অন্তর্ভুক্ত হলো- দীনের নিদর্শনাবলি এবং আল্লাহ যা পছন্দ করেন ও ভালোবাসেন সেসব বিষয়ের পথনির্দেশ করার জন্য আল্লাহর ‘তাকবির’ পাঠ করা।

অনুরূপভাবে উক্ত নেয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের অন্তর্ভুক্ত হলো ইবাদত পালনের মাধ্যমে হেদায়েতের ওপর অবিচলতার জন্য আল্লাহর ‘তাকবির’ পাঠ করা। শায়খুল ইসলাম (রহ.) বলেছেন, ‘হেদায়েত লাভ, জীবিকা অর্জন এবং বিজয়ের জন্য তাকবির পাঠ করাকে শরিয়তসম্মত করা হয়েছে। কারণ এই তিনটি হলো- একজন মানুষের সবচেয়ে কাক্সিক্ষত বস্তু। এগুলো তার স্বার্থ ও কল্যাণের সমন্বয়কারী।’ ‘আল্লাহু আকবার’ এটা এক মহান শব্দ, যা পাঠ করতে আল্লাহ আদেশ করেছেন; যাতে তার বড়ত্ব সবার হৃদয় দখল করে। ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন, ‘বলা হয়েছে যে, আরবদের কাছে মহিমা ও সম্মানসূচক অধিক অর্থবোধক শব্দ হচ্ছে- আল্লাহু আকবার।’

এটা দীন ইসলামের শব্দ যার ওপর আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহু আকবার বলার সওয়াব অফুরন্ত, এর দ্বারা উচ্চ মর্যাদা অর্জিত হয় এবং এটি এমন শব্দ যা আল্লাহ পছন্দ করেন। নবী কারিম (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সর্বাধিক পছন্দনীয় কথা চারটি। সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং আল্লাহু আকবার।’ -সহিহ মুসলিম

জিকিরকারীর জন্য এগুলো সদকাস্বরূপ এবং এগুলো তার জন্য কল্যাণময় ও উপকারী। জিকিরের মজলিশসমূহ যেগুলোতে আল্লাহর তাসবিহ ও তাকবির পাঠ করা হয়, সেগুলোকে ফেরেশতাম-লী স্বীয় পালক দ্বারা দুনিয়ার আসমান পর্যন্ত বেষ্টন করে রাখে।’ -সহিহ বোখারি

তাছাড়া তাকবির, তাসবিহ ও তাহমিদ পাঠের কারণে আসমানের দরজা খুলে দেওয়া হয়। কেয়ামতের দিন এগুলো মিজানের পাল্লায় অনেক ভারী হবে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, বাহ! বাহ! পাঁচটি জিনিস মিজানে কতই না ভারী! ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, ‘আল্লাহু আকবার’, ‘সুবহানাল্লাহ’ ও ‘আলহামদুলিল্লাহ’ আর নেক সন্তান, যে মারা গেলে তার পিতামাতা তাতে সওয়াব কামনা করেন।’ -মুসনাদে আহমাদ

২৭ অক্টোবর শুক্রবার, মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। অনুবাদ মুহাম্মদ আতিকুর রহমান

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত