এবারের আসরের শুরুতেই নিজের দেশ নিয়ে খুব উচ্চাকাক্সক্ষা প্রকাশ করেছিলেন প্রোটিয়া কিংবদন্তি এবি ডি ভিলিয়ার্স। তার বুকভরা প্রত্যয় আরও দৃপ্ত হয়ে উঠেছিল ডি কক—মার্করামদের ব্যাট হাতে ফর্ম দেখে। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ইডেন গার্ডেনসে সেমির আগে ডি ভিলিয়ার্স বলেছিলেন, ‘সেমিফাইনাল দক্ষিণ আফ্রিকাকে অনেক কষ্টকর মুহূর্তের সাক্ষী করেছে, আমি আশা করি ২০২৩ হবে পরিবর্তনের বছর।’
কথায় আছে ‘যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হয়।’ তেমনি স্বপ্ন সত্যি হয়নি ডি ভিলিয়ার্সের, আরও একবার অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নিতে হয়েছে প্রোটিয়াদের। তবে এবারের ম্যাচের পর প্রোটিয়াদের ‘চোকার্স’ তকমায় অভিহিত না করে অনেকেই ‘ফাইটার্স’ বলে সাহস জোগাতে চাইছেন। কিন্তু তাতে কি কিছু বদলাবে! দিনশেষে ইতিহাস যে লেখা হবে বিজয়ীর স্তুতি গেয়েই।
১৯৯৯ বিশ্বকাপ সেমির বর্ণনায় যেমন অ্যালান ডোনাল্ডের রানআউটই আলোচিত হয়, হয় না ‘হোয়াইট লাইটনিং’—এর ৩২ রানে ৪ উইকেটের জাদুকরী স্পেলের কথা। ’৯২ সেমির বৃষ্টির গল্প যতটা না মানুষের মুখে মুখে, জন্টি রোডস কিংবা ম্যাকমিলান—রিচার্ডসনের জুটি ততটা নয়। সেই ’৯২ থেকেই এক আসর পর পর নিয়ম মেনে সেমিফাইনাল খেলে আসছে দক্ষিণ আফ্রিকা। তবে ১৯৯৯ বিশ্বকাপের আসরটি ছিল এবারের চেয়েও ভিন্ন।
‘তোমরা যদি আমাদের চোকার্স বলো, তাহলে ১৯৯৭ সালের আগের ইতিহাস ধরে বলতে হবে। সেসব এখন অতীত হয়ে গেছে।’ ১৯৯৯ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নামার আগে এই উক্তি করেছিলেন প্রোটিয়া কোচ বব উলমার। বব উলমারের ওই বক্তব্যে পেছনে যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত কারণ ছিল। ১৯৯২ বিশ্বকাপ সেমিতে ইংল্যান্ডের কাছে বৃষ্টি আইনের মারপ্যাঁচে জিততে থাকা ম্যাচটিও হারতে হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকাকে। এরপর বদলে যাওয়া প্রোটিয়াদের ১৯৯৮ সালটি ছিল সর্বোচ্চ শিখরে ওঠার বছর। কমনওয়েলথ গেমসে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে স্বর্ণপদক জেতে দক্ষিণ আফ্রিকা। তার ছয় মাস পরেই আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনালে উইন্ডিজকে হারিয়ে শিরোপা নিজেদের করে। বিশ্ব ক্রিকেটের বড় মঞ্চে ওই একবারই নিজেদের ‘চ্যাম্পিয়ন’ হিসেবে পরিচয় দিতে সমর্থ হয়েছিল দেশটির ক্রিকেটাররা। স্বভাবতই কোচ উলমার ভেবেছিলেন, হোঁচট খাওয়ার দিন বুঝি গত হলো। অথচ তিনি ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পেরেছিলেন কি, ক্রিকেট বিধাতা কী লিখে রেখেছেন প্রোটিয়াদের ভাগ্যে।
দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে ‘চোকার্স’ খেতাব বলতে আমরা যা বুঝি তার শুরুই হয় বব উলমারের ওই উক্তির পর থেকে। তার পরের দিনই যে ২১৪ রান তাড়া করতে নেমে মর্মান্তিক হোঁচট খেতে হয় দক্ষিণ আফ্রিকাকে। ’৯৯ বিশ্বকাপের ওই সেমিতে অ্যালান ডোনাল্ডের সেই ঐতিহাসিক রানআউট আর দেশটির অগণিত সমর্থকের হৃদয় ভাঙার গল্পের শুরু সেখান থেকেই। সেবারও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিপক্ষ ছিল অস্ট্রেলিয়া। ওই ঘটনার পর দুই যুগ পার হয়ে গেলেও বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলার স্বাদ এখনো চেখে দেখতে পারেনি প্রোটিয়ারা। ডি ভিলিয়ার্স ও প্রোটিয়া ক্রিকেটের সমর্থকদের হৃদয়ে আরও একবার ঘা দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার কাছে সেমিফাইনাল হেরেছে প্রোটিয়ারা। মাঝখানে ঘরের মাঠে পরের আসরে প্রথম পর্বই পেরোতে পারেনি তারা। ২০০৭ বিশ^কাপের সেমিফাইনালে আবারও অস্ট্রেলিয়ার মুখোমুখি হয় দক্ষিণ আফ্রিকা। গ্রায়েম স্মিথ—ডি ভিলিয়ার্স— ক্যালিস—গিবস—প্রিন্স—বাউচারদের নিয়ে গড়া দলটি মাত্র ১৪৯ রানেই অলআউট হয়ে যায়। আরও একবার হৃদয় ভাঙে প্রোটিয়া সমর্থকদের। ২০১৫ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালেও দক্ষিণ আফ্রিকা চোক করে, তবে সেবার কিউইদের বিপক্ষে।
বব উলমার প্রয়াত হয়েছেন ২০০৭ বিশ্বকাপ আসরের মাঝেই। তার পর কেটে গেছে ১৬টি বসন্ত। এখনো সেই চোকার্স তকমা বয়েই চলেছে প্রোটিয়ারা। এবার গ্রুপপর্বের ম্যাচে অস্ট্রেলিয়াকে দাপটের সঙ্গে হারিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ওয়ানডেতে দক্ষিণ আফ্রিকার রেকর্ড চমৎকার। সবশেষ ১৮ বারের দেখায় ১৫ বারই অজিদের হারিয়েছে প্রোটিয়ারা। তবে বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচে এই পরিসংখ্যান ছিল একেবারেই উল্টো, কখনো অস্ট্রেলিয়াকে হারাতে পারেনি তারা। এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না।
প্রোটিয়ারা সাহস নিতে পারেনি স্প্যানিশ ফুটবল দল, কিউইদের রাগবি দল কিংবা এউইন মরগানের নেতৃত্বাধীন ইংল্যান্ডের কাছ থেকে। দেরিতে হলেও শিরোপা ছোঁয়ার প্রচেষ্টায় এরা প্রত্যেকেই সফল এক একটি উদাহরণ। পারল না কেবল প্রোটিয়ারাই। অধরাই থেকে গেল ফাইনাল খেলার স্বপ্ন। ফাইটার্স, চোকার্স–যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন! ক্রিকেটার হিসেবে বিশ্বমঞ্চে নামডাকওয়ালা কুইন্টন ডি কক, ডেভিড মিলার, রাসি ফন ডার ডুসেন, কেশব মহারাজরা তাদের পূর্বজদের মতোই আক্ষেপ নিয়ে বিশ্বকাপ স্বপ্নের ইতি টানলেন।