রওশনের চিঠির নেপথ্যে কে এই রহস্যময় মামুনুর

আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০২৩, ০২:৪৪ পিএম

শনিবার দুপুরে নির্বাচন কমিশনে জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদের নামে যে চিঠি পাঠানো হয় সেটি নিয়ে ছিল দিনভর আলোচনা। যে আলোচনায় বারুদ ঢালেন রওশন এরশাদ নিজেই। সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘এই চিঠি সম্পর্কে তিনি জানেনই না।’ 

প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল বরাবর এই চিঠিটি জমা দেন রওশন এরশাদের মুখপাত্র দাবি করা কাজী মামুনুর রশীদ। যে চিঠিতে বলা হয়, মহাজোটের শরিক হিসেবে আগের তিনবারের মতো এবারও জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশ নেবে।

চিঠি চালাচালি নিয়ে জাপায় বিতর্ক এবারই প্রথম নয়। এর আগেও রওশন এরশাদের হয়ে চিঠি ছড়িয়েছে। এ পর্যন্ত রওশন এরশাদ ও জি এম কাদেরকে নিয়ে যতো বিতর্ক দেখা দিয়েছে তাতে রওশন এরশাদের পক্ষে যে কয়েকটা নাম গণমাধ্যমে জায়গা করে নিয়েছে তার মধ্যে অন্যতম কাজী মামুনুর রশীদ। 

গত আগস্টে দলটির চেয়ারম্যান জি এম কাদের যখন ভারত সফরে ছিলেন তখন রওশন এরশাদকে জাপার চেয়ারম্যান ঘোষণা করে গণমাধ্যমে চিঠি পাঠানো হয়। যদিও পরবর্তীতে এই চিঠির কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। রওশন এরশাদও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেননি।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে দেখা যায়, নিজেকে রওশন এরশাদের মুখপাত্র পরিচয় দিয়ে ২২ আগস্ট বিভিন্ন গণমাধ্যমে ওই চিঠিটি পাঠিয়েছিলেন মামুনুর রশীদ। এরপর বিষয়টি ভাইরাল হলে তিনি আত্মগোপনে চলে যান এবং গতকালকের আগ পর্যন্ত তাকে কোথাও সরব দেখা যায়নি। 

রওশন এরশাদ স্বাক্ষরিত যে চিঠি নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হয়েছিল তা সত্য কি না এমন প্রশ্নের জবাবে মামুনুর রশীদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রওশন এরশাদ চিঠিতে স্বাক্ষর করেন এবং আমি সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে ইসিতে গিয়ে এই চিঠি দিয়ে আসি। এ সময় তার ছেলে সাদ এরশাদ উপস্থিত ছিলেন।’ তবে রওশন এরশাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি কোনো চিঠি পাঠাইনি। আমি চিঠির বিষয়ে কিছু জানি না।’ 

জাতীয় পার্টি থেকে আপনার অনুসারী ও জি এম কাদেরের অনুসারীরা আলাদা নির্বাচনে অংশ নেবে কি না- এমন প্রশ্নের উত্তরে রওশন এরশাদ বলেন, ‘আলাদা অংশ নেব কেন? ওরা নির্বাচনে অংশ নেবে না বলছে?’ আপনি কী নির্বাচনে জি এম কাদেরের সাথে আছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জি এম কাদেরের সাথেই তো আছি।’ 

রওশন এরশাদের এই বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে মামুনুর রশীদ বলেন, ‘তাহলে চিঠিতে আমার বাপ স্বাক্ষর করেছে।’ গত আগস্টে গণমাধ্যমে চিঠি পাঠানোর পর থেকে আপনাকে পাওয়া যায়নি কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সে সময় ওই চিঠিতেও রওশন এরশাদ স্বাক্ষর করেছিলেন। গণমাধ্যমে চিঠি পাঠানোর পরদিন আমি জরুরি কাজে দেশের বাইরে চলে যাই। এরপর তিনি ফোন কেটে দেন।’ 

কাজী মামুনুর রশীদ জাতীয় পার্টির সভাপতিমণ্ডলীর সাবেক সদস্য। যিনি দলীয় স্বার্থ ও শৃঙ্খলা বিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে ২০২০ সালে জাপা থেকে বহিষ্কৃত হন। এরপর তিনি হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের আরেক স্ত্রী বিদিশার সঙ্গে যুক্ত হয়ে জাতীয় পার্টির নামে আরেকটা গ্রুপ তৈরির চেষ্টা করেন। যেখানে বিদিশা চেয়ারম্যান ও কাজী মামুনুর রশীদকে মহাসচিব হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। মামুনুর রশীদ ২০২১ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর নিজ এলাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন, যেখানে প্রধান অতিথি করা হয়েছিল বিদিশাকে। 

ওই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে বিদিশা বলেছিলেন, ‘আপনাদের সন্তান কাজী মো. মামুনুর রশিদ এখন সারা দেশের নেতা। এরশাদের রেখে যাওয়া জাতীয় পার্টির দায়িত্বে আছেন তিনি।’ একই অনুষ্ঠানে মামুনুর রশীদ বলেন, ‘রাতের অন্ধকারে যারা জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন, তাদের কাছে এরশাদের জাতীয় পার্টি নিরাপদ নয়। জাতীয় পার্টি নিরাপদ বিদিশা এরশাদ ও এরিক এরশাদের কাছে।’ 

শুধু তাই নয় বিদিশার সমর্থনে ২০২১ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যানও হয়েছিলেন মামুনুর রশীদ। কিন্ত বিদিশা-মামুনুর রশীদ খুব বেশিদিন একসাথে থাকতে পারেননি। নানা কারণে বনিবনা না হওয়ায় বিদিশার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় মামুনের। ফলে তিনি বিদিশার সঙ্গ ত্যাগ করে রওশন এরশাদের সাথে যুক্ত হন এবং ধীরে ধীরে রওশন ও জি এম কাদেরের দ্বন্দ্বকে উসকে দিতে থাকেন। 

রওশন এরশাদের সাথে যুক্ত হওয়ার পরও মামুনুর রশীদ থেমে থাকেননি। জাতীয় পার্টি থেকে বহিষ্কৃত কয়েকজন নেতাকর্মী এবং রওশন এরশাদ অনুসারীদের নিয়ে তিনি একটি বলয় গড়ে তোলেন। তাদের কাজকর্মও নানা সময় বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল। এমনকি রওশন এরশাদ যখন থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন ছিলেন তখনও মামুনুর রশীদ এবং আরও কয়েকজন মিলে রওশন এরশাদকে দিয়ে জাতীয় পার্টির সম্মেলনের আহ্বান করেছিলেন। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২২ সালের ৫ আগস্ট জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে ফোনে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে একাধিক বার্তা পাঠিয়েছিলেন কাজী মামুনুর রশীদ। সে সময় তিনি ‘বরইগাছের পাতার ছবি’ ও ‘কবরের ছবি’ পাঠিয়েছিলেন জি এম কাদেরকে। এ ঘটনার দুই দিন পর ৭ আগস্ট উত্তরা পশ্চিম থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন জি এম কাদেররে সহকারী একান্ত সচিব মো. আবু তৈয়ব।

জি এম কাদেরকে কবরের ছবি পাঠানোর বিষয়টি একটি গণমাধ্যমের কাছে স্বীকার করেছিলেন কাজী মামুনুর রশীদ। তিনি জানিয়েছিলেন, তাকে একজন কবররে ছবি পাঠিয়েছিল যা তিনি জি এম কাদেরসহ ১০০-১৫০ জন মানুষকে পাঠিয়েছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল প্রত্যেকে যেন কবরের চিন্তা করেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত