আকাঙ্ক্ষার নির্বাচন যে ৫ বছর পর পর আশঙ্কার নির্বাচনে পরিণত হয়, এই চক্র থেকে উত্তরণের পথ খুঁজছেন সবাই। কিন্তু পথ কী হবে আর পদ্ধতিই বা কেমন হবে তা নিয়েই চলছে বিরোধ। রাজনীতিতে বিতর্ক থাকবেই এবং এই বিতর্ক জনগণের রাজনৈতিক চেতনাকে উন্নত করে। আবার যখন দেশের সামগ্রিক কিছু বিষয় এবং রাজনীতিতে সংকটজনক পরিস্থিতি তৈরি হয় তখন কিছু বিষয়ে একমত হওয়া প্রয়োজন। এই প্রয়োজনের কথা বলছেন যারা, তারা রাজনীতিতে কিংবা ক্ষমতাসীনদের কাছে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ কেউ নন। তাই তাদের উদ্বেগ এবং যুক্তির কথা পাত্তাই পায়নি। রাজনীতিকে যেভাবে চর্চা করা হচ্ছে, তাতে এসব ভাবনা ভবিষ্যতেও মূল্য পাবে কিনা বলা মুশকিল।
বাংলাদেশের রাজনীতিকে খেলার সঙ্গে তুলনা করতে করতে এবং ‘খেলা হবে’ কথাটিকে বহুবার বলতে বলতে ব্যাপারটা শুনতে একঘেয়ে লাগছিল। কারণ খেলবে কারা, কোন মাঠে, কোন নিয়মে, রেফারি বা আম্পায়ার হবেন কে, আম্পায়ারের ভূমিকা কী হবে তা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক হয়েছে। খেলা হতে গেলেও তো কখন খেলা হবে সে বিষয়ে একমত হতে হয়, না হলে একপক্ষ যদি খেলতে না আসে তাহলে নিয়ম অনুযায়ী ওয়াকওভার পেয়ে বিজয়ী হবে অপরপক্ষ। শক্তিশালী প্রতিপক্ষ না এলে দুর্বল দলের সঙ্গে খেলে অথবা নিজেরাই দুই ভাগ হয়ে দুই দলে পরিণত হয়েও খেলার নামে সময় কাটানো যায়, কিন্তু তাতে খেলার আনন্দ, আর বিজয়ের গৌরব আর মানুষের স্বীকৃতি কোনোটাই থাকে না। কারণ জয়-পরাজয়ের গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো ভালো খেলা। যেখানে আনন্দ থাকবে, থাকবে উৎকর্ষের প্রচেষ্টা। আগের চেয়ে মান আরও ভালো হয়েছে কিনা, দুর্বলতাগুলো দূর হয়েছে কিনা তার একটা যাচাই হবে। কারচুপি নয়, অন্যায় করে হারিয়ে দেওয়া নয়, জিতেছি যোগ্যতায় এটা ভাবতে কার না ভালো লাগে! কিন্তু রাজনীতি কি খেলার সঙ্গে তুলনীয় বিষয়। রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত একটা দেশের জনগণের অর্থনীতি, সংস্কৃতি। একে খেলার সঙ্গে তুলনা করাটা খুবই নিম্নমানের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যা নেতাদের মুখ থেকে এখন সাধারণ মানুষের মধ্যেও প্রচলিত হয়ে গেছে।
ফুল ফুটছে, আরও ফুটবে, শত ফুল ফোটার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এটিও এখন বহুল চর্চিত একটি রাজনৈতিক বুলিতে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ফুল ফোটার কথা বলেছেন। অনেক ফুল ইতিমধ্যেই ফুটতে শুরু করেছে এবং আরও নাকি ফুটবে। জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, কোন ফুল যে কোন মালীর যত্ন ফুটবে এবং কোন ফুলে কোন দেবতা তুষ্ট হবেন? অতীতে সরকারি প্রশ্রয়ে রাজানুগত কিংস পার্টি গড়ে তোলার কথা জনগণ ভুলে যায়নি। তারা ফুটেছিল অল্প সময়ের জন্য, ঝরেও গেছে দ্রুত এবং মানুষ তাদের নাম ভুলেও গেছে। বেশিরভাগই বিস্মৃতির অতল গহ্বরে হারিয়ে গেছে। কিন্তু সুবিধা নেওয়ার সংস্কৃতিটা স্থায়ী করে দিয়ে গেছে, যা রাজনীতিতে এক অমোচনীয় কালির দাগের মতো থেকে গেছে এবং রাজনীতিকে অনৈতিক সুবিধার হাতিয়ার বানানোর নতুন নতুন উদাহরণ তৈরি করেছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন কোনো দলের ব্যাপার নয়। নির্বাচনের মাধ্যমে একটি দল রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনার আইনি অধিকার পায়, কিন্তু এর জন্য বহুপাক্ষিক আয়োজন প্রয়োজন হয়। নির্বাচনে ভোট বা সম্মতি দেয় জনগণ, ভোট নিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় বিজয়ী রাজনৈতিক দল। নির্বাচনের আগে-পরে শৃঙ্খলা রক্ষা করার দায়িত্ব পালন করে পুলিশ ও প্রশাসন আর নির্বাচন পরিচালনা করে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করতে হলে তার জন্য প্রয়োজন, ভয়হীন সুষ্ঠু পরিবেশ, যাতে ভোটাররা ভোটের আগে এবং ভোটের ফলাফল যাই হোক না কেন, ভোটের পরও নিরাপদ থাকতে পারেন। রাজনৈতিক দল যারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন তাদের প্রত্যাশা থাকে তারা যেন সুষ্ঠু পরিবেশ পান, সমান সুযোগ পান, নির্বাচনী কর্র্তৃপক্ষ যেন নিরপেক্ষ আচরণ করে, পুলিশ এবং প্রশাসন যেন পক্ষপাতিত্ব না করে, এক কথায় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড যেন সৃষ্টি করা হয়। নির্বাচন কমিশনের সংবিধানসম্মত ক্ষমতা আছে, তা ব্যবহার করার অধিকার আছে কিন্তু সেই ক্ষমতা কীভাবে কাজে লাগাবেন সেই পরীক্ষা দিতে হয় তাকে। কমিশন চাইলে রাষ্ট্রীয় দপ্তরগুলো নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রয়োজনমাফিক সহায়তা করবেন। কিন্তু এসব প্রয়োজন এবং প্রত্যাশা চাপা পড়ে যায় ক্ষমতাসীন দলের পরিকল্পনা ও ক্ষমতার কাছে। ক্ষমতাসীন দল রাষ্ট্রের সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যবহার করে নির্বাচনে জিতে আসার চেষ্টা করে, ফলে এক অসম প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হয়। অতীত ইতিহাস বলে এমন ঘটনা হয়েছে, একবার-দুবার নয়, যতবার দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়েছে ততবার।
বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছিল ১৯৭৩ সালে। সে নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল ২৯৩টি আসন লাভ করেছিল। সেই নির্বাচন কেমন হয়েছিল তা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, সেই দৃষ্টান্ত কোনো গৌরবের নয়। দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছিল ১৯৭৯ সালে। সেই নির্বাচনে কয়েক দিন আগেই গড়ে তোলা দল ৩০০টি আসনের মধ্যে ২০৭টি আসনে বিজয়ী হয়েছিল। তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৯৮৬ সালে। তখনো ক্ষমতায় অধিষ্ঠিতদের আসন ছিল ১৫৩টি। অনুগতদের সহায়তায় ও সমর্থনে ৭ম সংশোধনী পাস করে নেয় সামরিক শাসক। একই ঘটনা ঘটেছে ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে ২৫১টি আসনে জয়লাভ, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ২৮৯টি আসনে বিজয়ী, ২০১৪ সালে ২৩৪টি আসন ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে ২৫৮টি আসনে বিজয়ী ঘোষণা করা। ফলে ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করে ক্ষমতাসীন দল এমনভাবে জিতে যায়, যাতে প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন করতে পারে আর যত জনপ্রিয়তা নিয়ে বিরোধী দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক না কেন তারা ক্ষমতায় যাওয়ার মতো আসন অর্থাৎ ১৫১টি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।
এসব অভিজ্ঞতা থেকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন নিরপেক্ষ হয় না। কারণ যতই বলা হোক না কেন যে, প্রশাসনের কর্তাব্যক্তি বলে কেউ নেই, সবাই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। কিন্তু বাস্তবে তারা সরকারের প্রতি আজ্ঞাবহ থাকে আর পুলিশ থাকে বিরোধী দল ও মতের ওপর খড়গহস্ত। ফলে তাদের দ্বারা সুষ্ঠু নির্বাচন তো দূরের কথা স্বাভাবিকভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ, প্রচারণা চালানো সম্ভব হয় না। জনমত যাচাই হয় না, নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হয় মাত্র। ১৭৩ দিন হরতাল, অবরোধ, ঘেরাওয়ের মাধ্যমে ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান প্রবর্তিত হওয়ার পর নির্বাচনী রাজনীতিতে কিছুটা স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে বিতর্কিত এবং যারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রবর্তনের জন্য আন্দোলন করেছিল তাদের শাসনামলেই এই ব্যবস্থা বাতিল করার কারণে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ আর থাকল না। যার ফলাফল দেখা গেছে, ২০১৪ দশম এবং ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। ফলে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ, অবিশ্বাস এবং অনাস্থা তুঙ্গে উঠেছে আর নির্বাচন পড়েছে এক নতুন জটিলতার মুখে।
এই জটিল ও সংশয়মূলক পরিস্থিতিতে ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী দেশ এখন নির্বাচন সময়ে আছে এবং ভোটগ্রহণ হবে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি। তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ নভেম্বর। তফসিল তো ঘোষিত হলো, নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন নির্বাচন পরিচালনা করবে কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই গেল, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে কারা এবং নির্বাচন কতটুকু গ্রহণযোগ্য হবে? তফসিল পরিবর্তনের আভাস দেওয়া হলেও নির্বাচন নিয়ে আস্থা তৈরির পদক্ষেপ তেমন দৃশ্যমান হচ্ছে না।
ইতিমধ্যে আবার নির্বাচন নিয়ে জোট গঠনের হিড়িক পড়েছে। অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা এই যে, ভয় এবং প্রলোভনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড শুধু নির্বাচনকে বিতর্কিত করে তাই নয়, দেশের মানুষের নৈতিক চারিত্রিক মান নষ্ট করে দেয়। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর মানুষ দেখছে দুই বিপরীত চিত্র। একদিকে নির্বাচনের মনোনয়ন পেতে গেঞ্জি ক্যাপ পরে, ঢাকঢোল পিটিয়ে মহাআড়ম্বরে বিশাল মিছিল বা বহর নিয়ে আগমন, অন্যদিকে বিরোধী দলের কার্যালয় সুনসান নীরবতা।
বিরোধী দলের নেতাদের শুধু গ্রেপ্তার আতঙ্ক নয়, প্রধান নেতাদের জামিন না হওয়া, অনেক নেতাকর্মীর বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। ফলে নির্বাচনের প্রাক্কালে এক পক্ষে উল্লাস, অন্যপক্ষে আতঙ্ক বিরাজ করছে। অন্যদিকে আকস্মিক ভোটের জোট গড়ে ওঠা, নির্বাচনে যাবে কী যাবে না, এই দোদুল্যমানতায় থাকতে থাকতে সরকার সহযোগী বিরোধী দলের নির্বাচনে যাওয়ার প্রস্তুতি নানা কৌতূহল ও গুজবের জন্ম দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আশা কি ফলবতী হবে? ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের সংঘাতের পর দীর্ঘদিনের সহিংসতা, এক-এগারো এবং ২০১৪ সালের নির্বাচনে ব্যাপক সহিংসতার পর ৫ জানুয়ারির প্রায় বিনা ভোটে ১৫৩ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার স্মৃতি তো এখনো রাজনীতিতে অস্বস্তির জন্ম দেয়। অতীতের খারাপ ঘটনা মানুষ ভুলে যেতে চায়। কিন্তু যদি কালো অতীত ফিরে আসার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয় তাহলে হতাশা ও বেপরোয়া মনোভাব দুটোরই জন্ম হতে পারে। সাধারণ জনগণের চাওয়া খুবই সাধারণ অতীতের তিক্ত ঘটনা রাজনীতিতে যে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে, তা থেকে মুক্তি পাওয়া এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের একটা স্থায়ী পদ্ধতি গড়ে তোলা। এর জন্য আর কত অপেক্ষা করতে হবে?
লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক
