করোনার গ্রাসে জিপিএ

আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০২৩, ০৬:০০ এএম

আমাদের দেশে ২০২০ সালের মার্চ মাসে করোনার ধাক্কা লাগে। ২০২১ সালের অক্টোবরে ইউনিসেফ ও ইউনেসকো এশিয়ায় শিক্ষা খাতের ওপর ‘কভিড-১৯-এর প্রভাব ও মোকাবিলা কার্যক্রমবিষয়ক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়েছিল, কভিড-১৯ মহামারী শুরুর পর থেকে বাংলাদেশের স্কুল এবং কলেজে পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। এর ফল পাওয়া গেল দুই বছর পর। বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-সংশ্লিষ্ট অনেকেই বলছেন, পূর্ণ নম্বরে সব বিষয়ে পরীক্ষা গ্রহণ এবং শিখন ঘাটতি ও শ্রেণি কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটার ফলে এইচএসসিতে জিপিএ ৫-এ ভরাডুবি হয়েছে। আবার শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, এই ফলাফল করোনার আগের ফলাফলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, দশম শ্রেণি থেকে পড়ালেখায় ঘাটতি তৈরি হওয়া এই ব্যাচের এইচএসসিতে এসে সব বিষয়ে পূর্ণ নম্বরে পরীক্ষায় বসতে হয়। ফলে পাসের হার সামান্য কমলেও জিপিএ ৫-এ ভরাডুবি হয়েছে। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে সোমবার প্রকাশিত ‘করোনার ফলে জিপিএ ৫ অর্ধেক’ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। একদিকে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি জানাচ্ছেন, গতবার পরীক্ষা সহজ ছিল। কম বিষয়, কম সময় ও কম নম্বরের প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল। এবার পূর্ণ নম্বর ও পূর্ণ সময়ে পরীক্ষা হয়। এ জন্য পরীক্ষাও তুলনামূলক কঠিন হয়। ফলে পাসের হার ও জিপিএ ৫ কিছুটা কমেছে।

আবার আন্তঃশিক্ষা সমন্বয় বোর্ড ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তপন কুমার সরকার বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা এসএসসিতে কম বিষয় ও নম্বরে পরীক্ষা দিয়েছিল। এবার তারা সব বিষয়ে প্রায় পূর্ণ নম্বরেই পরীক্ষা দিয়েছে। করোনাকালে যেহেতু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরাসরি বন্ধ ছিল, তাতে পড়ালেখার কিছুটা ঘাটতি হতেই পারে। তবে আমরা যদি করোনার আগের ২০১৯ সালের এইচএসসির ফলের সঙ্গে এবারের ফলের তুলনা করি, তাহলে দেখা যাবে ফল কিন্তু একই আছে; অর্থাৎ আমরা ফলাফলের দিক দিয়ে কিন্তু একই জায়গায় আছি।’

বরাবরের মতো এবার জিপিএ ৫ প্রাপ্তিতে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছে ঢাকা বোর্ড। এই বোর্ডে ৩১ হাজার ৭৫২ জন শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ পেয়েছেন। আর সবচেয়ে কম জিপিএ ৫ পেয়েছেন সিলেট বোর্ডের শিক্ষার্থীরা। আর বোর্ডভিত্তিক পাসের হারে এবার সবচেয়ে কম পাস করেছেন যশোর বোর্ডে। তাদের পাসের হার ৬৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি পাস করেছেন কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে। তাদের পাসের হার ৯১ দশমিক ২৫ শতাংশ।

গতবারের তুলনায় পাসের হার ও জিপিএ ৫ কমেছে। এর পেছনে অন্যতম দায় ইংরেজি বিষয়ে খারাপ করা। পাশাপাশি পূর্ণ সময় ও নম্বরে পরীক্ষা হওয়ায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। সত্যিকার অর্থে করোনাকালে এ ব্যাচের পড়ালেখায় ঘাটতি ছিল। সব বোর্ডেই এবার ইংরেজিতে শিক্ষার্থীরা খারাপ করেছেন। অথচ এই ব্যাচ বাংলা, ইংরেজির মতো একাধিক বিষয়ে পরীক্ষা ছাড়াই এসএসসি উত্তীর্ণ হয়েছিল। তারই প্রভাব পড়েছে ফলাফলে।

করোনার সময় ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা করতে হয়েছে অনলাইনে। আবার বড় ধরনের বিপদে পড়ে ২০২১ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীরা। তারা দশম শ্রেণিতে ওঠার কিছুদিন পরই করোনার কারণে বন্ধ হয়ে যায় স্কুল। অনলাইনে কোনো রকম ক্লাস হলেও তাতে সবাই তাল মেলাতে পারেনি। এই ব্যাচের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা হয় ইংরেজি ছাড়া মাত্র তিনটি ঐচ্ছিক বিষয়ের ছয়টি পত্রে। ফলে পড়ালেখা তেমনভাবে করতে না পারলেও ভালো ফল নিয়ে এসএসসি পাস করে তারা। এরপর আবার একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে পড়তে হয় অনলাইন ক্লাসের ফাঁদে। যে কারণে এবার এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যাচ্ছে জিপিএ হ্রাস। 

করোনার মতো ভাইরাসে যেকোনো সময়ই আক্রান্ত হতে পারেন শিক্ষার্থীরা। কিন্তু এর বিপরীতে কলেজগুলোর শিখনপদ্ধতি এবং শ্রেণি কার্যক্রমে কোনোভাবেই যেন ঘাটতি না হয়, সেদিকে কলেজ কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি থাকা দরকার। তাহলেই আসবে কাক্সিক্ষত ফলাফল। পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীর মনস্তত্ত্বের দিকটিও লক্ষ রাখা দরকার। এ বিষয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষের বিশেষ দৃষ্টি থাকা প্রয়োজন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত