নতুন নতুন বিষয় বিশ্ব মুঠোয়

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০২৩, ১১:০৮ এএম

চতুর্থ শিল্প-বিপ্লবের ফলে সারা বিশে^ই নতুন ধারার নানা কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি হবে। নতুন যুগের এসব চাকরির জন্য প্রয়োজন হবে উঁচু স্তরের কারিগরি দক্ষতা, যা চিন্তা করেই দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চতুর্থ শিল্প-বিপ্লবের উপযোগী নতুন নতুন বিষয় নিয়ে হাজির হয়েছে। এতে দেশে বসেই যুগোপযোগী ও আধুনিক বিষয়গুলোতে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করার সুযোগ পাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। এতে বিশ্ব অনেকটাই হাতের মুঠোয় চলে এসেছে।

জানা যায়, আমাদের দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন শিক্ষার্থীরা বিএসসি ইন ডেটা সায়েন্স, রোবোটিকস অটোমেশন অ্যান্ড মেকাট্রনিকস, মেরিটাইমস ট্রান্সপোর্টেশন অ্যান্ড লজিস্টিক, বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং, সাইবার সিকিউরিটি, অ্যাপারেল মার্চেন্ডাইজিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট, নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যান্ড টেকনোলজি, স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট, রিয়েল স্টেট ম্যানেজমেন্ট, ওয়েব অ্যান্ড ই-কমার্স, ডেটা অ্যানালাইটিকস অ্যান্ড ডিজাইন থিংকিং ফল বিজনেসসহ একাধিক আধুনিক বিষয়ে পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এমনকি তা বিদেশেরও অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। আবার থাকলেও আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা সেসব বিষয়ে পড়ার তেমন সুযোগ পান না।

জানা যায়, গত ২৬ নভেম্বর দেশে এইচএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশ হয়। এতে উত্তীর্ণ হয়েছেন ১০ লাখ ৬৭ হাজার ৮৫২ জন। এসব শিক্ষার্থীর বেশিরভাগই ভর্তি হবেন উচ্চশিক্ষায়। কিন্তু আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে আসনসংখ্যা মাত্র ৬৬ হাজার। তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজে শিক্ষার্থীদের পড়ার সুযোগ থাকলেও তাতে শিক্ষার্থীরা খুব একটা আগ্রহী নন। ফলে শিক্ষার্থীদের আগ্রহের জায়গা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু শিক্ষার্থীরা কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বেন, কোন বিষয়ে পড়বেন; তা নিয়ে অনেকটাই সিদ্ধান্তহীনতাই ভোগেন। চতুর্থ শিল্প-বিপ্লব বা আগামী কর্মবাজার অনুযায়ী কোন বিষয়ে পড়লে সহজেই তারা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারবেন, তা নিয়েও তাদের সঠিক ধারণা নেই। ফলে অনেকেই বিদেশে পাড়ি জমান। অথচ আমাদের দেশের বেশ কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যুগোপযোগী কিছু বিষয় নিয়ে পাল্লা দিচ্ছে বিশে^র সঙ্গে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ চন্দ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা কিন্তু এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ট্র্যাডিশনাল প্রোগ্রামের আবেদন অনেকটাই ফিরিয়ে দিচ্ছি। যেসব প্রোগ্রামের মাধ্যমে স্কিলড ম্যানপাওয়ার বানানো সম্ভব, সেগুলোর প্রতিই জোর দিচ্ছি। বিশেষ করে মেকাট্রনিকস, রোবোটিকস, আর্টিফিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো বিষয়গুলো খুলতে উৎসাহিত করছি। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবগুলো যাতে স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী চলে, সেজন্য কমিটি করা হয়েছে। নিয়মিতভাবে কারিকুলামও আপডেট করা হচ্ছে।’

ইউজিসি সূত্র জানায়, দেশে এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১১৪টি। এর মধ্যে শিক্ষা কার্যক্রম চালু আছে ১০২টির। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে মোট আসন সংখ্যা ৩ লাখ ৭৬ হাজার। তবে সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০২১ সালে অধ্যয়নরত ছিল ৩ লাখ ১০ হাজার ১০৭ জন। আর ২০২১ সালে ভর্তি হয়েছিল ৯৩ হাজার ৫০৩ জন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংখ্যা ১৫ হাজার ৩৯৩ জন।

সূত্র জানায়, ১০২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালু থাকলেও মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ২৫ থেকে ৩০টির বেশি হবে না। ইতিমধ্যে এর অনেকেই বিশ্ব র‌্যাংকিংয়েও জায়গা করে নিয়েছে। তারা আধুনিক ক্যাম্পাসে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা দিচ্ছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো বিষয় বছরে ডুয়াল সেমিস্টার জানুয়ারি ও জুলাই মাসে এবং ট্রাই-সেমিস্টারের বিষয়গুলোতে স্প্রিং (জানুয়ারি-এপ্রিল), সামার (মে-আগস্ট), ফল (সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর)-এ ভর্তির সুযোগ রয়েছে। তবে সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েই মোট আসনের তিন ভাগ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও তিন ভাগ দরিদ্র মেধাবীর জন্য সংরক্ষিত রাখার নিয়ম রয়েছে। এ ছাড়া এসএসসি-এইচএসসিতে জিপিএ ৫ ও সেমিস্টার ফলে ১০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত স্কলারশিপেরও সুযোগ দেয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কর্মবাজারের সঙ্গে যদি উচ্চশিক্ষার মিল না থাকে তাহলে সে শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ভালো চাকরি পাওয়া কঠিন। বর্তমানে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি জানতে চায়, নতুন কোন ওষুধ জীবনরক্ষাকারী হবে বা নতুন ভাইরাসের আক্রমণ থেকে রক্ষা করবে? জিন বা প্রোটিনের সিকোয়েন্স ডেটা বিশ্লেষণ করে এখন এসব প্রশ্নের উত্তর বের করা হচ্ছে। টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি জানতে চায়, তার ব্যবহারকারীদের কী ধরনের ইন্টারনেট প্যাকেজ দিলে তারা বেশি বেশি ব্যবহার করবে এবং তাতে কোম্পানির মুনাফা বাড়বে। কৃষি খাতে আমাদের দরকার মাটিতে পানির পরিমাণ, ফসলের বৃদ্ধি, আবহাওয়ার পূর্বাভাসসহ নানারকম ডেটার সমন্বয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম অ্যালগরিদম। এ ধরনের নানা ডেটার দিগন্ত ভবিষ্যতে আরও অবারিত হবে। আর সেজন্যই দরকার ডেটা সায়েন্স, যা ইতিমধ্যে চলে এসেছে আমাদের দেশেও।

ডেটা সায়েন্সের মূল বিষয়গুলোর মধ্যে আছে প্রোগ্রামিং, পরিসংখ্যান, কম্পিউটিং, মেশিন লার্নিং, ডিপ লার্নিং, এআই ইত্যাদি। তাছাড়া বিভিন্ন প্রায়োগিক ক্ষেত্রে কাজ করার জন্যও ডেটা সায়েন্টিস্টকে তৈরি হতে হয়, কারণ কোথায় নেই এর ব্যবহার! ডেটা সায়েন্সের চাকরির বিজ্ঞাপনগুলোর দিকে তাকালেই দেখা যাবে ছোট-বড় সব প্রতিষ্ঠানেরই এখন প্রয়োজন ডেটা সায়েন্স জানা দক্ষ লোকবল। আগে যেমন কম্পিউটার বা ওয়েব ডেভেলপমেন্ট জানা লোকের প্রয়োজন ছিল অনেক বেশি।

অন্যদিকে কলকারাখানা থেকে ফসলের মাঠ সব জায়গায়ই আগামীতে জায়গা করে নেবে রোবট। আর এ রোবট বানাতে ও পরিচালনা করতে প্রয়োজন রোবোটিকস অটোমেশন অ্যান্ড মেকাট্রনিকস। দেশে অনলাইনের বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট এবং ওয়েব অ্যান্ড ই-কমার্স। ইদানীং আমরা প্রায়ই পড়ছি সাইবার হুমকিতে। দিন দিন তথ্যপ্রযুক্তি উন্নতি হওয়ায় প্রতিক্ষেত্রেই এ হুমকি থাকবে। ফলে সাইবার সিকিউরিটি বিষয়েও পড়ালেখা চালু করেছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।

জানা যায়, দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উচ্চশিক্ষা বিস্তারে নতুন নতুন বিষয় হাজির করে বড় ভূমিকা পালন করে আসছে। বর্তমানে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ব্যাপক আকারে ডিজিটালাইজেশন করা হয়েছে। এর ফলে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে তথ্য ও প্রযুক্তির মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার কোর্স কারিকুলাম দেখে বাংলাদেশের বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা আসছেন। বর্তমানে ৩৬টির বেশি দেশের শিক্ষার্থী বাংলাদেশের বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছেন। এতে একদিকে যেমন বহির্বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হচ্ছে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের হারও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত