শতবর্ষী মাদ্রাসা ও গ্রামের মুসলমান সমাজ

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৩, ১০:৫২ পিএম

হতে পারে, আমার মাথায় এখন কালো চুল নেই বললেই চলে। অথবা একটু আধটু সিনেমা বা লেখালিখি করি। এই দুই কারণেই হয়তো ইদানীং সভা-সমাবেশে ডাক-টাক পাই। সভাপতি, প্রধান বা বিশেষ অতিথি হিসেবে। উপমহাদেশে আবার অঘোষিত এক নিয়ম আছে, যা এমন এক অলঙ্ঘনীয় বিষয়, না মানলে লোকে ঠিক সেভাবে সিরিয়াসলি নেবে না। সভাপতি বা প্রধান অতিথি হলে আপনাকে মঞ্চে বসে থাকতে হবে অত্যন্ত গম্ভীর মুখে। ভুলেও কখনো হাসবেন না। লোকে ছ্যাবলা ভাববে। যারা আপনাকে অতিথি করে নিয়ে এসেছেন, মাইকে ঘোষণাও হয়েছে যে আপনি অমুক অথবা তমুক, হেসে ফেললে, শুধু নিজের নয়, তাদের দিকেও লোকজন সন্দেহের দিকে তাকাবে। আপনি আদৌ বুদ্ধিজীবী কিনা তাই নিয়েই প্রশ্ন উঠে যাবে।

এমন এক পরিস্থিতি হয় বলে আমি আজকাল খুব কোথাও যেতে চাই না। তবে এটাও ঠিক যে আমি এমন কোনো তালেবর বা এলেম না, যে ঘনঘন ডাক পাই। কলকাতা শহরে সেলিব্রেটি সংখ্যা এত বেড়ে গেছে, ফলে সেখানে জায়গা পাওয়া খুবই কঠিন। সেখানে তিন ক্যাটেগরির প্রাধান্য। টিভিতে, দুনিয়ার সমস্ত ব্যাপারে জ্ঞান আছে যাদের তারা, রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে এমন মানুষ। আর পেজ থ্রি সেলেব, গল্পকার, কবি, সিনেমা বা টেলিভিশন চ্যানেলে সম্প্রচারিত সিরিয়ালে মোটে এক দু’বার দেখা গেছে তাদের দাম আকাশছোঁয়া। নক্ষত্র, সে সিনেমা বা খেলা যে কোনো মহলের হোক, তাদের ডাকতে আবার টাকা লাগে মোটা অঙ্কের। এতসব ক্যাটাগরি পেরিয়ে ঝটতি পড়তি আমাদের মতো দু-একজনের ভাগ্যেও কখনো সখনো শিকে ছেঁড়ে।

আমি আবার, সত্যি বলতে কি গ্রাম, মফস্বলে ডাক পেলে না করতে পারি না। পশ্চিমবঙ্গের গ্রাম বা মফস্বলেও বাঙালি মুসলমানের অস্তিত্ব যথেষ্ট। মালদা, মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান, হাওড়া, দিনাজপুর, দুই চব্বিশ পরগনা, হুগলীর বিস্তৃত এলাকায় বাঙালি মুসলমানের বাস। ভারতের সব রাজ্যের সঙ্গে এ বঙ্গের ফারাক হচ্ছে, দেশের অন্যান্য রাজ্যে শহরের জনসংখ্যায় মুসলমান কম নেই। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের শহরে বাঙালি মুসলমানের হার প্রায় শূন্য। তাদের যাবতীয় উপস্থিতি গ্রামে। ১৯৪৭-এ দেশভাগের পর থেকে জনবিন্যাস পুরো বদলে গেছে।

এখন আটাশ, ঊনত্রিশ শতাংশ বঙ্গ মুসলমান গ্রামের বাসিন্দা। এটা ঠিক যে গত কয়েক বছর ধরে মুসলমান সমাজের মধ্যে নতুন এক মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্ম হচ্ছে বা হয়েছে। এখন অনেক ডাক্তার, অধ্যাপক, শিক্ষক, লেখক মুসলমান ঘরে আপনি দেখতে পাবেন। কয়েক বছর আগেও যা কল্পনা করা যেত না। তারা কেউ কেউ চেষ্টা করছেন বটে শহরে থিতু হওয়ার। কিন্তু নানা কারণে সে চেষ্টাও সবসময় সফল হতে পারা সহজ নয়। ফলে কোনো সন্দেহ নেই, আজও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মুসলমানদের জীবনযাপনের খোঁজ পেতে আপনাকে গ্রামে গ্রামে ঘুরতে হবে।

প্রতিবেশীকে না চিনলে কোনোদিনই শুধু সাম্প্রদায়িকতা দূর হটো বলে স্লোগান তুলে জনমনে ক্রমবর্ধমান বিদ্বেষ দূর করা অসম্ভব। আমি কোনো সমাজসংস্কারক না। তবুও সময় সুযোগ পেলেই সংখ্যালঘু অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে যাই, পড়শিদের জানতে। তাদের কাছ থেকে জীবনের পাঠ নিতে। কাল যেমন গেলাম চমৎকার এক গ্রামে। খাজনাবাহালা হাই মাদ্রাসার শতবর্ষের সমাপ্তি অনুষ্ঠানে। ১৯২১ সালের এই প্রতিষ্ঠানের একশো বছর আগেই হয়ে গেছে। কভিডের কারণে দু’বছর বাদে সমাপ্তি অনুষ্ঠান।

মঞ্চে যথারীতি বসে আছি গম্ভীর মুখে। রামগরুড়ের ছানা হয়ে। কঠিন এক বিষয় এপারের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও ওপারের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জীবন নিয়ে গুরুগম্ভীর বক্তব্য রাখতে হবে কিছুক্ষণ বাদে। ফলে, দেখতে না পেলেও, আন্দাজ করতে পারছি, মুখটা কেমন ফাঁসির আসামির মতো করুণ হয়ে রয়েছে। এমন এক স্পর্শকাতর বিষয়, যাই বলি, তাতেই বিতর্ক উঠবে। বাইরে ঠান্ডা বেশ। তবুও ঘামছি। পেছনের সারিতে মাস্টার মশাইরা দল বেঁধে বসে। আমার শৈশবের বন্ধু সাংবাদিক তীর্থ, সেও পেছনে নির্বিকার বসে আছে। সামনে ছাত্রদের দল। আমার কথা শোনার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই বোঝাই যাচ্ছে। মাস্টার মশাইদের কড়া শাসনের ভয়ে সবাই চুপচাপ। ওরাও চায় না শুনতে। আমিও চাই না বলতে। কিন্তু নিরুপায় দুপক্ষ। মাইকে সুন্দর গজল হচ্ছে। এমন সময় এক তরুণ শিক্ষক হাতে ধরিয়ে দিলেন শতবর্ষ স্মারক গ্রন্থ। এসব অনুষ্ঠানে, সাধারণভাবে দেখেছি, যেসব ম্যাগাজিন, স্যুভেনির দেওয়া হয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা অতি নিম্নমানের। ওই, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা গ্রাম পঞ্চায়েত নেতা কিংবা মাননীয় প্রধান শিক্ষকের জ্ঞানগর্ভ বাণী বা সস্তা দরের গল্প বা কবিতা। দশ পাতার স্যুভেনিরে চব্বিশ পাতার বিজ্ঞাপন। বলাই বাহুল্য লেখা গৌণ, বিজ্ঞাপন মুখ্য। মনের অগোচরে পাপ নেই। ফলে বলতে দ্বিধা নেই যে এখানেও সেই সব সাত-পাঁচ ভেবে খানিকটা যেন হালকাভাবেই ‘ইকরা’ নামের পত্রিকাটি হাতে নিলাম। হাতে নিয়ে, ভেতরের পাতায় চোখ বোলাতে বোলাতে ক্রমে মুগ্ধ হতে লাগলাম। দুই বঙ্গেই মাদ্রাসা, মক্তব শুনলেই যাদের নাক সিঁটকায়, তাদের অবশ্যই পড়া দরকার পত্রিকাটা।

৪৯৬ পাতার সু-মুদ্রিত এই স্মারক গ্রন্থটির পাতা উল্টোতে কখন যে আপনি ইতিহাসের পথে হাঁটতে শুরু করেছেন, নিজেও তা টের পাবেন না। শুধু ইতিহাস নয়, অতীত বর্তমানের গ্রামবাংলার সমাজ, রাজনৈতিক ছবি স্পষ্ট ভেসে উঠবে গ্রন্থটি পড়লে। সূচির পৃষ্ঠায় চোখ বুলিয়ে নিন। খাজনাবাহালা হাই মাদ্রাসার ইতিহাস, এলাকা পরিচিতি, শ্যামপুর, জনপদ ও সংস্কৃতি, উনিশ শতকের মুসলিম শিক্ষার সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত, ভারতের মাদ্রাসা শিক্ষা পদ্ধতির সেকাল ও একাল, দেশভাগ, বাংলা সাহিত্য ও মুসলমান সমাজ, বাউল সম্রাট লালন শাহ, হাওড়া জেলার মুসলমান পুঁথি লেখক, কলকাতার মসজিদ এরকম অজস্র মণিমুক্তা ছড়িয়ে আছে গ্রন্থটির প্রতি পাতায়।

বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ লেখা পুনর্মুদ্রিত হয়েছে। তার মধ্যে পুর্ণেন্দু পত্রীর ‘স্মৃতির শিল্প ছায়া’, আব্দুর রউফের ‘আমার কথা’ উল্লেখযোগ্য। লেখক তালিকাও যথেষ্ট সমীহ করার মতো। আবু রাইহান, এমদাদুল হক নুর, গৌতম বসু মল্লিক, শুভদীপ সাঁতরা, ইমানুল হক, ড. সইফুল্লা, ড. নিরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ বিশিষ্টজনের লেখা পত্রিকাটির মান বাড়িয়েছে। এমন চমৎকার গ্রন্থটির সম্পাদনা করেছেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক মনিরুল ইসলাম।

এই পত্রিকাকে আপনি স্মারক গ্রন্থ বলবেন না। যে কোনো গবেষণা গ্রন্থের চেয়ে এর গুণমান কিছু কম না। এক মলাটে যদি কেউ দেশভাগ পরবর্তী সময়ে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান জনজীবন জানতে আগ্রহী হন, তাহলে এটি অবশ্যই সংগ্রহ করতে হবে। অখণ্ড বঙ্গে মক্তব মাদ্রাসা গড়ে ওঠার প্রেক্ষাপট ও আজকের মাদ্রাসা শিক্ষা কী অবস্থায় চলছে তাও জানতে গেলে এই ম্যাগাজিন পড়া কৌতূহলী পাঠক, গবেষকদের অবশ্য কর্তব্য। আপনি হয়তো বলবেন, এই গ্রন্থে মোটের ওপর হাওড়া জেলার খন্ড চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ফলে সারা রাজ্যের মাদ্রাসা শিক্ষা বোঝা সম্ভব নয়। কথাটা আংশিক সত্যি। কিন্তু আমি যেহেতু সারা রাজ্যের মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা মোটামুটি দেখেছি। ফলে এই আঞ্চলিক ক্ষেত্র সমীক্ষা থেকেই সারা পশ্চিমবঙ্গের ছবি স্পষ্ট হবে। এই গ্রন্থ হাতে নিয়ে চোখ বুজলে আপনি একশো বছর আগের হাওড়া জেলার শ্যামপুর অঞ্চলকে যেন ফ্ল্যাশব্যাকে দেখতে পাবেন।

খাজনাবাহালা তো শুধু একটা গ্রাম নয়। একে ঘিরে আরও অসংখ্য গ্রাম। কুপনন্দন, সাইবেনিয়া, জগদীশপুর, মোসা, কাঁটাগাছি, রায়দিঘি, মালিপুর শালুক পাড়া, চাঁপাবাড় ইত্যাদি বিভিন্ন গ্রামের লোক মিলে ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছিল আজকের এই শতবর্ষী পুরনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ১৯২৪ সালে জেলা বোর্ড বরাদ্দ করেছিল মাসে কুড়ি টাকা। ১৯২৬ সালে অখণ্ড বঙ্গের সরকার বরাদ্দ করেছিল মাসে পঞ্চাশ টাকা। জমিদার পরেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও হাজি খাজা বকশ মল্লিক দুই টাকা দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। আর এক জমিদার নীরদ মিশ্রের অবদান ছিল এই মাদ্রাসার উন্নতির পেছনে। ১৯৩৮ সাল খাজনাবাহালা মাদ্রাসার কাছে তো নিশ্চিত অখণ্ড বঙ্গের ইতিহাসেও এক উল্লেখযোগ্য বছর। তৎকালীন অজগাঁয়ের এক অখ্যাত মাদ্রাসা দেখতে এসেছিলেন অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক।

এই সব গণ্যমান্য লোকজনের সহায়তা সত্ত্বেও মাদ্রাসা বহুবার সংকটে পড়েছে বহুবার। বিশেষ করে দেশভাগের আগে থেকে বিশ শতকের ষাট দশক পর্যন্ত। দেশভাগ এ বঙ্গের বাঙালি মুসলমানের অস্তিত্ব বিপন্ন করে তুলেছিল। হার না মানা লড়াই বাঁচিয়ে রেখেছিল বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে। তার অন্যতম খাজনাবাহালা হাই মাদ্রাসা। তার জন্য পুরো কৃতিত্ব, আশপাশের অগণন গ্রামবাসীর। তারা মায়ের মমতায় প্রিয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ঝড়ঝাপটা থেকে আগলে রেখেছিলেন। সেই জনতার দলে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও, হিন্দু জনগোষ্ঠী কিছু কম ছিল না। আজও পশ্চিমবঙ্গের সরকারি মাদ্রাসায় হিন্দু শিক্ষক ও ছাত্র শতাংশের হিসেবে কম নয়।

লেখক: প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত