বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম পরাশক্তি অস্ট্রেলিয়া। হার না মানা মানসিকতার সঙ্গে নিখুঁত পেশাদারিত্ব যাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু সেই দলটিই হয়ে উঠেছিল কিছুটা নড়বড়ে। খুব যে খারাপ খেলছিল তা কিন্তু নয়, তবে ক্রিকেট মাঠে আগের মতো তাদের দাপট দেখা যাচ্ছিল না। ঘুরে দাঁড়িয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব আরেকবার প্রতিষ্ঠা করতে অবশ্য বেশি সময় নেয়নি অস্ট্রেলিয়া। দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে বছরটা নিজেদের করে নিয়েছে তাসমান সাগর পাড়ের দলটি। ওয়ানডে বিশ্বকাপ জয়ের আগে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপও জিতেছে তারা। ইংল্যান্ডের মাটিতে ধরে রেখেছে অ্যাশেজ। তাই ২০২৩ সালকে অস্ট্রেলিয়ার স্বপ্নের বছর বললে ভুল হবে না মোটেও। শুধু অস্ট্রেলিয়ার রাজত্বই নয়, বছরটি জুড়ে ছিল আরও অনেক চমক জাগানো পারফরম্যান্স, কিছু দলের উত্থান ও কারও পতনের সাক্ষী হয়েছেন ক্রিকেটপ্রেমীরা।
গত অক্টোবর-নভেম্বরে ভারতে হয় ওয়ানডে বিশ্বকাপের ত্রয়োদশ আসর। রেকর্ড পাঁচবারের শিরোপাজয়ী অস্ট্রেলিয়া প্রতিযোগিতাটি শুরু করে টানা দুই ম্যাচ হেরে। তাদের ছন্নছাড়া পারফরম্যান্সে অনেকেই হয়তো শুরুতে বাজি ধরেননি দলটিকে নিয়ে। অস্ট্রেলিয়ার মতো দল ঘুরে দাঁড়াবে না, তা কি হয়? টানা ৯ ম্যাচ জিতে অর্জনের মুকুটে আরেকটি পালক যোগ করে তারা। ষষ্ঠবারের মতো ঘরে তোলে বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফিটি। এর আগে জুনে অস্ট্রেলিয়া জেতে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের দ্বিতীয় চক্রের ফাইনাল। দুইটি ফাইনালেই তাদের প্রতিপক্ষ ছিল ভারত। বলা যায়, এশিয়ার দলটির জন্য ২০২৩ সাল ছিল হৃদয় ভাঙার। দুটি শিরোপা জয়ের খুব কাছে গিয়েও খালি হাতে ফিরতে হয় তাদের।
মজার বিষয় হলো, অস্ট্রেলিয়ার দুটি জয়ের নায়ক একজনই, ট্রাভিস হেড। ওভালে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে তার ১৭৪ বলে ১৬৩ রানের ইনিংস প্যাট কামিন্সদের ২০৯ রানের জয়ে রাখে বড় ভূমিকা। এরপর আহমেদাবাদে বিশ্বকাপ ফাইনালে স্বাগতিক দর্শকে ঠাসা গ্যালারির সামনে প্রবল চাপের মধ্যেও জ্বলে ওঠেন তিনি। রান তাড়ায় খেলেন ১২০ বলে ১৩৭ রানের চোখ ধাঁধানো ইনিংস। তার অসাধারণ পারফরম্যান্সে টানা ১০ ম্যাচ জিতে ফাইনালে ওঠা ভারতকে ৬ উইকেটে হারিয়ে শিরোপা উল্লাস করে অস্ট্রেলিয়া। দুটি ম্যাচেই সেরার পুরস্কার জেতেন বাঁহাতি এই ব্যাটসম্যান। অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপ জয়ের পথচলায় গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের অবদানও কম নয়। বিশ্বকাপে দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়েন তিনি, নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ৪০ বলে। আফগানিস্তানের বিপক্ষে চরম বিপর্যয়ে চোট নিয়ে খেলে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ওয়ানডেতে ডাবল সেঞ্চুরি করেন তিনি।
বিশ্বকাপের আগে গত জুন-জুলাইয়ে ইংল্যান্ডের মাটিতে ঐতিহ্যবাহী অ্যাশেজ সিরিজ খেলে অজিরা। ইংলিশদের আলোচিত ‘বাজবল’ কৌশলকে গুঁড়িয়ে প্রথম দুই টেস্ট জিতে সিরিজ জয়ের দুয়ারে ছিল তারা। কিন্তু শেষ দুই ম্যাচে বাজবল দিয়েই জয়ে ফেরে স্বাগতিকরা, ভাঙে সফরকারীদের আশা। অবশ্য নানা বিতর্কের পাঁচ ম্যাচের সিরিজটি ২-২ ড্র হওয়ায় ‘ছাইদানি’ নিয়ে ঘরে ফিরতে পেরেছে অস্ট্রেলিয়াই। নারী ক্রিকেটেও অস্ট্রেলিয়ার দাপট ছিল ২০২৩ সালে। এই বছরের নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতেছে তারা। ফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে ১৯ রানে হারিয়ে টানা তৃতীয়বার ঘরে তুলেছে টি-টোয়েন্টির বৈশ্বিক আসরের শিরোপা। তবে টেস্টে ভারতের গিয়ে ধাক্কা খেয়েছে তারা। প্রথমবারের মতো লাল বলের সংস্করণে ভারতের বিপক্ষে হারের তেতো স্বাদ পেতে হয়েছে তাদের।
হতাশার বছরে ভারত পুরুষ দলের সবচেয়ে বড় সাফল্য এশিয়া কাপ জয়। অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়া আসরটি শেষ পর্যন্ত হয় হাইব্রিড মডেলে, কিছু ম্যাচ আয়োজক দেশ পাকিস্তানে ও ভারতের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায়। ফাইনালে শ্রীলঙ্কাকে উড়িয়ে অষ্টমবার এশিয়ার সেরা হয় ভারত। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে অস্ট্রেলিয়াকে হারাতে না পারলেও দেশটির মাটিতে গিয়ে ঠিকই বোর্ডার-গাভাস্কার সিরিজ ২-১ ব্যবধানে জিতে এসেছে তারা।
এই বছরই ইতিহাসে নাম লেখান বিরাট কোহলি। গড়েন ওয়ানডেতে সবচেয়ে বেশি পঞ্চাশ সেঞ্চুরির রেকর্ড। ছাড়িয়ে যান কিংবদন্তি শচিন টেন্ডুলকারের ৪৯ সেঞ্চুরির কীর্তি। বিশ্বকাপটাও দুর্দান্ত কাটে কোহলির। প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে এক আসরে সাতশ রানের কীর্তি গড়েন তিনি। ১১ ম্যাচে ৯৫.৬২ গড় ও ৯০.৩১ স্ট্রাইক রেটে তার রান ৭৬৫। ভারতীয় মহাতারকার সৌজন্যে এক বিশ্বকাপে প্রথমবার দেখা যায় ৯টি পঞ্চাশ ছোঁয়া ইনিংস, যেখানে সেঞ্চুরি ছিল তিনটি। টেস্ট ক্রিকেটে অষ্টম বোলার হিসেবে ৫০০ উইকেটের মাইলফলক ছোঁয়ার কীর্তি ২০২৩ সালে গড়েন অস্ট্রেলিয়ার অফ স্পিনার নাথান লায়ন।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের জন্য বছরটি ছিল কষ্টের। প্রথমবারের মতো ওয়ানডে বিশ্বকাপে যে খেলতে পারেনি প্রথম দুই আসরের চ্যাম্পিয়নরা। বাছাইয়ের গ্রুপ পর্বে জিম্বাবুয়ে ও নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে হারের পর সুপার সিক্সে স্কটল্যান্ডের কাছে হেরে শেষ হয়ে যায় তাদের আশা। তবে বছরে কিছু সাফল্যও পেয়েছে ক্যারিবিয়ানরা। টি-টোয়েন্টিতে টানা তিনটি সিরিজ জিতেছে তারা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জিতেছে ওয়ানডে সিরিজ। ডাচদের ২০২৩ সালটা কেটেছে দারুণ। বিশ্বকাপে তারা দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটে দিয়েছে বড় চমক। বাংলাদেশের বিপক্ষেও তুলে নিয়েছিল জয়। ক্রিকেটে কতটা উন্নতি করেছে, সেটার প্রমাণ বিশ্বকাপে দিয়েছে আফগানিস্তান। শিরোপাধারী হিসেবে আসরে অংশ নেওয়া ইংলিশদের হারিয়ে বিস্ময় উপহার দেয় তারা। পরে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে জিতে সম্ভাবনা জাগায় সেমিফাইনালে খেলার।
২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব হয়েছে এই বছর। সেখানে চমক দেখিয়েছে উগান্ডা ও কানাডা। আফ্রিকা অঞ্চল থেকে প্রথমবারের মতো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে আফ্রিকার ‘ক্রেনস’ খ্যাত উগান্ডা। তাদের ঐতিহাসিক সাফল্যে কপাল পুড়েছে জিম্বাবুয়ের। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপে দেখা যাবে না সিকান্দার রাজাদের। আমেরিকা অঞ্চলের বাছাই থেকে প্রথমবার টি-টোয়েন্টির বৈশ্বিক আসরের টিকিট নিশ্চিত করেছে কানাডা।
এই বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিদায় নিয়েছেন ইংল্যান্ডের তারকা পেসার স্টুয়ার্ট ব্রড ও দক্ষিণ আফ্রিকা নারী দলের পেস বোলিং গ্রেট শবনিম ইসমাইল। চলমান পাকিস্তান সিরিজ শেষে টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসরে যাবেন অস্ট্রেলিয়ান ওপেনার ডেভিড ওয়ার্নার। ভারত সিরিজ দিয়ে আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের ইতি টেনে দেবেন দক্ষিণ আফ্রিকান ব্যাটসম্যান ডিন এলগার।
২০২৩ সালকে ওয়ানডের বছরও বলা যায়। এই বছর মোট ২১৮টি ওয়ানডে হয়েছে, এক পঞ্জিকাবর্ষে যা সর্বোচ্চ। এর আগে এক বছরে সবচেয়ে বেশি ওয়ানডে হয়েছিল ২০০৭ সালে, ১৯১টি। এবার টেস্ট হয়েছে ৩৪টি, টি-টোয়েন্টি ৪৩৮টি। এখন পর্যন্ত চলতি বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি রান করেছেন শুবমান গিল, ৭ সেঞ্চুরি ও ১০ ফিফটিতে ২১২৮। সবচেয়ে বেশি উইকেট নিয়েছেন রবীন্দ্র জাদেজা, ২৩.৭৪ গড়ে ৬৬টি।
