বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ও কবি আবুবকর সিদ্দিক প্রয়াত হলেন গত ২৮ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার। একটি দীর্ঘ ও বৈচিত্রপূর্ণ জীবনের অবসান হলো। এই সময়ে তাঁর চেয়ে জ্যেষ্ঠ কবি ও কথাশিল্পী বাংলাদেশ আর কেউ ছিলেন না। তিনি ছিলেন সেই মহীরুহগণের সর্বশেষ প্রতিনিধি, যাঁরা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে যাঁদের নাম। তিনি জন্মেছিলেন ১৯৩৬ সালের ১৯ আগস্ট, বাগেরহাটের গোটাপাড়া গ্রামে। দীর্ঘদিন শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত ছিলেন। প্রথমে চাখার ফজলুল হক কলেজে শিক্ষকতা শুরু করলেও পরবর্তীকালে বি এল কলেজ, পি.সি কলেজ, ফকিরহাট কলেজ ও কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। এরপর দীর্ঘদিন তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেন। ১৯৯৪ সালের ৭ জুলাই সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করেন। এরপর ঢাকার নটর ডেম কলেজ এবং কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেন।
অনুজ লেখক হিসেবে আমি পেয়েছিলাম আবুবকর সিদ্দিকের অপত্য স্নেহ। অবসর জীবনের একটা সময়ে তিনি সাভারে থাকতেন, সাভার বাজারের পেছনে একটা ভাড়া বাড়ির তৃতীয় তলায়। আমার বাসা ছিল সাভারের রেডিও কলোনি এলাকায়। প্রতিদিন সেখান থেকে ঢাকায় অফিস করতাম। হঠাৎ একদিন তিনি আমার বাসায় হাজির। তাঁর মতো একজন বিশিষ্ট কবি ও কথাশিল্পী আমার বাসায়, এটা ছিল আমার জন্য বিস্ময়। তিনি আমার প্রথম দিকের একটি উপন্যাসের খুব প্রশংসা করলেন। বললেন, উপন্যাসটি আমি আমার বন্ধু হাসনাত আবদুল হাইকেও পড়তে দিয়েছি।
সেদিন আমার বাসায় তিনি সারা বিকেল ছিলেন। সেদিনের পর থেকে তাঁর সঙ্গে আমার গড়ে ওঠে সুসম্পর্ক। প্রায়ই তাঁর বাসায় যেতাম। ঢাকা থেকে অফিস শেষ করে চড়ে বসতাম সাভারের বাসে। সাভার বাজারে নেমে ঢুকে পড়তাম তাঁর বাসার গলিতে। কখনো গলির মুখে গিয়ে উপরে তাকিয়ে দেখতাম সাদা গেঞ্জি পরা আবুবকর সিদ্দিক পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছেন বারান্দার একটি ইজি চেয়ারে। দৃষ্টিতে শূন্যতা। কিছু দেখছেন, কিংবা কিছুই দেখছেন না। উপর থেকে তিনি চাবি ফেলতেন। কলাপসিবল গেটের তালা খুলে আমি ঢুকে পড়তাম তাঁর বাসায়। রাত সাতটা-আটটা, এমনকি কখনো কখনো দশটা পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে আড্ডা দিতাম, গল্প-উপন্যাস বিষয়ে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনতাম। শুনতে শুনতে ঋদ্ধ হতাম। নিজের ভেতরে গড়ে তুলতাম একটি শিল্পপরিমণ্ডল।
তাঁর বাসাভর্তি ছিল বই আর বই। বিশ্বসাহিত্যের নানা বই। আমি তখন সামান্য সাংবাদিক, অল্প টাকা বেতন পাই, বই কেনার মতো অত টাকা ছিল না। আমার ভেতর পাঠের তীব্র তৃষ্ণা। বিশ্বসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ বইগুলো আমি তাঁর কাছ থেকে ধার করে নিয়ে আসতাম। পড়ে আবার ফেরত দিতাম। দু-একটা বই তাঁর অজান্তে রেখেও দিতাম। তিনি বুঝতে পারতেন, কিন্তু কিছু বলতেন না। মনে মনে বুঝি হাসতেন। একবার শুধু বলেছিলেন, আনা কারেনিনাটা পড়া শেষ হলে ফেরত দিও। আমি হেসেছিলাম। পরে আর ফেরত দিইনি।
তিনি আমাকে অনেকটা বাধ্য করেছিলেন অরুণ সোমের অনুবাদে মিখাইল শলোখভের চার খণ্ডেরবিশাল উপন্যাস প্রশান্ত দন পড়তে। কিন্তু উপন্যাসটি কোথাও খুঁজে পাচ্ছিলাম না। অনেক কষ্টে নানাজনের কাছ থেকে উপন্যাসটির ফটোকপি সংগ্রহ করলাম। মাথায় জেদ ছাপল। এ বই এত দুর্লভ কেন? বাংলাদেশের পাঠকেরা তো বঞ্চিত হচ্ছে। বাংলা বাজারের রোদেলা প্রকাশনীর রিয়াজ খানকে বললাম বইটা ছাপতে। ছেপে দিলেন তিনি। অরুণ সোমের অনুমতি ছাড়াই। কাজটা অবশ্য ঠিক হয়নি আমার। পরে বুঝতে পেরেছি। অরুণ সোমের অনুমতি নেওয়া প্রয়োজন ছিল। এটা আমার ভুল। অবনত মস্তকে এই ভুল স্বীকার করছি।
শ্রদ্ধেয় আবুবকর সিদ্দিকের উৎসাহেই দেবেশ রায়ের তিস্তা পুরাণ, তিস্তাপারের বৃত্তান্ত, খরার প্রতিবেদন, মফস্বলি প্রতিবেদন, আপাতত শান্তি কল্যাণ হয়ে আছি উপন্যাসগুলো পড়েছি। পড়েছি বিশ্বসাহিত্যে আরো নানা উপন্যাস। একবার কবি রাহেল রাজিবকে দেওয়া যুগান্তরের ঈদ সংখ্যায় প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি আমার উপন্যাস সম্পর্কে বিস্তারিত বলেছিলেন। বলেছিলেন, এই তরুণের সম্ভাবনা আছে, একদিন সে ভালো করবে। একজন তরুণ লেখক সম্পর্কে এই কথাগুলো আমার জন্য ছিল একটি পুরস্কারের চেয়ে বেশি। যুগান্তরের সেই সংখ্যাটি এখন আর আমার সংগ্রহে নেই। কবি রাহেল রাজিবের কাছে থাকলেও থাকতে পারে।
আবুবকর সিদ্দিক কবি, গীতিকার, কথাশিল্পী, শিক্ষক। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে : ধবল দুধের স্বরগ্রাম, বিনিদ্র কালের ভেলা, হে লোকসভ্যতা, মানুষ তোমার বিক্ষত দিন, হেমন্তের সোনালতা, নিজস্ব এই মাতৃভাষায়, কালো কালো মেহনতী পাখি, কংকালে অলংকার দিয়ো, শ্যামল যাযাবর, মানব হাড়ের হিম ও বিদ্যুত, মনীষাকে ডেকে ডেকে প্রভৃতি। তাঁর চার পরিচয়ের মধ্যে কথাশিল্পী পরিচয়টি ছিল আমার কাছে প্রধান। তাঁর কবিতার চেয়ে গল্প-উপন্যাস পাঠক হিসেবে আমার কাছে ছিল প্রিয়, এখনো আছে। তাঁর জলরাক্ষস, খরাদাহ উপন্যাস পড়ে বিস্মিত হয়েছিলাম। বাংলাদেশে এমন অসাধারণ উপন্যাস লিখিত হয়েছে! ভালো লেগেছি তাঁর আরো দুটি উপন্যাস : বারুদপোড়া প্রহর, একাত্তরের হৃদয়ভস্ম। তাঁর গল্পগ্রন্থ চরবিনাশকাল, মরে বাঁচার স্বাধীনতা, ভূমিহীন দেশ, কুয়ো থেকে বেরিয়ে, ছায়াপ্রধান আঘ্রাণ, শ্রেষ্ঠ গল্প পড়ে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলাম যে, সেই মুগ্ধতার রেশ বহু দিন আমার মধ্যে ছিল। এখনো মাঝেমধ্যে সেই মুগ্ধতা উঁকি দিয়ে যায়। তাঁর বড় মিয়া, কালো কুম্ভির প্রভৃতি গল্প বাংলা ছোটগল্পের ইতিহাসে অক্ষয় হয়ে থাকবে।
সাহিত্যিক হিসেবে আবুবকর সিদ্দিক এই দেশে ছিলেন অনেকটা কোণঠাঁসা। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে আমাদের শীর্ষ সাহিত্যিকরা তাঁকে উপেক্ষা করে গেছেন দিনের পর দিন। তিনি ছিলেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জেনারেল এরশাদের স্ত্রী বিদিশার বাবা, অর্থাৎ এরশাদের শ্বশুর। উপেক্ষার এটা একটা কারণ হতে পারে। না-ও হতে পারে। উপেক্ষার কারণ হয়ত অন্য, যা আমি জানি না, আমার প্রজন্ম জানে না। প্রণম্য কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক ও তাঁর মধ্যে ছিল মান-অভিমানের সম্পর্ক। হাসান স্যারের সঙ্গে যখন কথা হতো, তখন সিদ্দিক স্যারের প্রসঙ্গ উঠলেই তিনি তাঁর সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠতেন। একইভাবে সিদ্দিক স্যারের সঙ্গে আলাপের সময় হাসান স্যারের প্রসঙ্গ উঠলে তিনিও সমালোচনায় মেতে উঠতেন। দুজনে তখন শিশুর মতো আচরণ করতেন। দুজনের সেই কলহ আমি কৌতূহলের সঙ্গে উপভোগ করতাম। ভাবতাম, বড় বড় সাহিত্যিকরাও তবে ঝগড়াঝাটি করে! দুজনের সেসব ঝগড়া থেকে শিক্ষণীয় বিষয়গুলো গ্রহণ করে নিতাম।
বিগত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আবু বকর সিদ্দিক থাকতেন ঢাকার বাইরে, খুলনায়, তাঁর ভাইয়ের বাড়িতে। লেখালেখিতে তেমন সক্রিয় ছিলেন না। অসুস্থতার মধ্যে দিনাতিপাত করছিলেন। আগে মাঝেমধ্যে ফোনে তাঁর সঙ্গে কথা হতো। শেষের দিকে আর হতো না। দৈহিকভাবে তিনি চিরতরে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন, কিন্তু আত্মিকভাবে তিনি আমার কাছে থাকবেন আজীবন। তাঁকে অন্তিম প্রণিপাত।
লেখক: কথাসাহিত্যিক
