ফুটবলাঙ্গনের ২০২৩-এর শুরুটা ভীষণ সাদামাটা এবং অবশ্যই বিতর্কের কালো চাদরে ঢেকে থাকা। সেই চাদর সরিয়ে শেষটা উজ্জ্বল হয়েছে মাঠের ফুটবল। তাতে হয়েছে আশার সঞ্চার, সেটা ছেলেদের ফুটবলে যতটা, ঠিক ততটাই মেয়েদের ফুটবলে।
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের চার মেয়াদের সভাপতি সালাউদ্দিন নতুন বছর শুরুই করেছিলেন বিতর্ক দিয়ে। বছরের শুরুতেই কেনাকাটায় অসংগতি, ভুয়া বিল-ভাউচার করে অর্থ আত্মসাৎ, ত্রুটিপূর্ণ অডিট রিপোর্ট নিয়ে সরব ফুটবল অঙ্গন। ফিফা বাফুফের সিনিয়র সহ-সভাপতি সালাম মুর্শেদী, আলোচিত সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগ, বিতর্কিত প্রধান হিসাব কর্মকর্তা আবু হোসেন ও সহকারী হিসাব কর্মকর্তা অনুপম সরকারকে কারণ দর্শানো নোটিস পাঠিয়েছিল আগের বছরের শেষভাগে। তবে এই আলোচনায় সেভাবে আসেনি বাফুফে সভাপতির নাম। তবে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে নিজেই এই আলোচনায় নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। ঠিক যেন ‘ঠাকুর ঘরে কে রে? আমি কলা খাইনি’-র মতো অবস্থা। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে হুট করে সংবাদ সম্মেলন করে নিজেকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন সালাউদ্দিন। অসংলগ্ন কথাবার্তায় তিনি বছরের প্রথমভাগের প্রায় পুরোটা জুড়েই বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছেন। এর মাঝেই জন্ম নেয় দেশের ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে কালো অধ্যায়ের। বাফুফেকে অনিয়ম, দুর্নীতি, জালিয়াতির আখড়ায় রূপ দিয়ে শেষ পর্যন্ত বাঁচতে পারেননি তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগ। বাফুফে প্রধানের ছত্রছায়ায় থেকে বাফুফেতে রাম রাজত্ব কায়েম করেছিলেন এই কর্মকর্তা। তবে তার কুকীর্তি চোখ এড়ায়নি ফুটবলের বিশ্ব নিয়ন্তা সংস্থা ফিফার। দীর্ঘ সময় তদন্ত করে ফিফা নিজেদের দেওয়া বরাদ্দ নিয়ে নয়-ছয়ের অনেক প্রমাণ খুঁজে পায়। তারা বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে সোহাগকে ২ বছরের ফুটবল নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি আর্থিক জরিমানা করে। পরবর্তী সময়ে বাফুফেও সোহাগকে আজীবন নিষিদ্ধ করে এবং তদন্ত কমিটি গঠন করে আরও কয়েকজনকে অভিযুক্ত করে। যদিও বছর শেষ হতে চললেও সেই তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি বাফুফেকে।
এ বছর সরকারের সঙ্গেও প্রকাশ্যে সংঘাতে গিয়েছেন বাফুফের সভাপতি। অলিম্পিক বাছাইয়ে নারী দলকে মিয়ানমারে খেলতে না পাঠানোর জন্য সরকারকে দায়ী করে বাফুফে। এ নিয়ে ভীষণ ক্ষেপে যান ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল। এরপর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কারণে প্রকাশ্যে বাফুফের সমালোচনা করেছেন ক্রীড়াঙ্গনের অভিভাবক।
সোহাগ কা-ের পাশাপাশি আলোচনায় এসেছে নারী জাতীয় দলের কোচ ছোটনের চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত। গেল বছর সাফ জিতে আসার পর থেকেই ছোটন বেশি বেশি ম্যাচের জন্য তাগাদা দিয়ে আসছিলেন। আবার সাফের সাফল্যের পেছেন ছোটনের চেয়ে তৎকালীন টেকনিক্যাল ডিরেক্টর পল স্মলিকেই বেশি কৃতিত্ব দিয়েছেন বাফুফে প্রধান থেকে শুরু করে নারী কমিটির আলোচিত প্রধান মাহফুজা আক্তার কিরণ। তাছাড়া কোচ ও মেয়েদের বেতন-ভাতা প্রত্যাশা মতো বাড়ানো হয়নি। ছোটনের সব কাজেই দোষ ধরতে শুরু করেছিলেন পল স্মলি। তাই এই বঞ্চনা সইতে না পেরে দীর্ঘদিনের চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন ছোটন। ক’দিন পর দেখা যায় মালদ্বীপে ভালো প্রস্তাব পেয়ে পল স্মলিও সটকে পড়েন বাফুফে থেকে। সালাউদ্দিন অবশ্য ছোটনকে ফেরানোর অনেক চেষ্টাই করেছেন বলে জানা গেছে। তবে ছোটন নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থেকেছেন। আর ফেরেননি বাফুফেতে। প্রিয় কোচের চলে যাওয়ার আগে পরে সিরাত জাহান স্বপ্নাসহ, আঁখি খাতুন, আনুচিং মোগিনি, সাজেদা খাতুনের মতো জাতীয় দলের নারী ফুটবলার খেলা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন প্রাপ্য সম্মান ও সুযোগ-সুবিধা না পেয়ে। তাছাড়া বাফুফে রীতিমতো সার্কাসে পরিণত হয়েছিল নারী ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ আয়োজনের ঘোষণা দিয়ে এবং শেষ পর্যন্ত সেটা আয়োজন করতে না পেরে। বসুন্ধরা কিংসের সঙ্গে কিরণ ধরে-বেঁধে কিছু দল নিয়ে আয়োজন করেন লিগ। যা অনুমিতভাবেই জিতে নেয় জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের নিয়ে দল গড়া কিংস, হয় হ্যাটট্রিক চ্যাম্পিয়ন।
দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ আসর সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের বছর ছিল এবার। যে আসরটি সেই ২০০৩ সালের পর থেকেই আক্ষেপ হয়ে আছে বাংলাদেশের জন্য। তবে সেই আক্ষেপ এবার কিছুটা হলেও ঘুচেছে স্প্যানিশ কোচ হাভিয়ের কাবরেরার অধীনে জাতীয় দল বদলে যাওয়া ফুটবল খেলায়। একটা ব্যালেন্সড দল গঠন প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকায় বছরের শুরুতে সিশেলসের মতো আধা পেশাদার দলের কাছে হারের লজ্জায় ডুবতে হয়েছে বাংলাদেশকে। তবে সেই ধাক্কা সামলে তারা সাফের জন্য সেরা প্রস্তুতি নেয়। কম্বোডিয়াকে তাদের ঘরের মাঠে হারিয়ে কুড়িয়ে নেয় আত্মবিশ্বাস। এরপর সাফের গ্রুপপর্বে লেবাননের কাছে হারলেও বাংলাদেশকে দেখা যায় ভয়ডরহীন ফুটবল খেলতে। গ্রুপের শেষ দুই ম্যাচ ছিল মালদ্বীপ ও ভুটানের বিপক্ষে। গ্রুপপর্ব পেরিয়ে ১৪ বছর পর সেমিফাইনালে পৌঁছুতে সেই দুই ম্যাচে জয়ের বিকল্প ছিল না। কাবরেরার শিষ্যরা দুই ম্যাচেই অসাধারণ ফুটবল খেলে জেতে ৩-১ গোলের ব্যবধানে। দীর্ঘদিন পর গ্রুপপর্বের বাধা পেরিয়ে সেমিফাইনালেও মিলেছে এক অন্যরকম বাংলাদেশের। কুয়েতের বিপক্ষে চোখে চোখ রেখে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে এসে ১-০ গোলে হেরে বিদায় নিতে হয় বাংলাদেশকে।
বিশ্বকাপ ও এশিয়ান কাপের যৌথ বাছাইয়ের প্রথমপর্বের প্রস্তুতি হিসেবে ঘরের মাঠে আফগানিস্তানের সঙ্গে প্রীতি সিরিজে দুই ম্যাচ ড্র করে বাংলাদেশ। বাছাইয়ের প্রথমপর্বে মালেতে দেখা গেছে কাবরেরার মন্ত্রে বদলে যাওয়া বাংলাদেশকে। ১-১ গোলে ড্রয়ের আত্মবিশ্বাস সঙ্গী করে তারা দেশে ফিরে আসে। ঘরের মাঠে ফিরতি দেখায় মালদ্বীপকে ফের হারের হতাশায় ডুবিয়ে বাংলাদেশ নাম লিখায় বাছাইয়ের দ্বিতীয়পর্বে। বছরের শেষভাগে এসে বাংলাদেশ খেলেছে বাছাইয়ের দুটি ম্যাচ। প্রথমটি মেলবোর্নে গিয়ে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৭-০-তে হারতে হয়েছে। তবে বছরের শেষ ম্যাচে বাংলাদেশ ঘরের মাঠে ১-১ এ রুখে দিয়েছে র্যাংকিংয়ে অনেকটা এগিয়ে থাকা লেবাননকে।
কিংস এই মৌসুমেও অন্যদের ছাড়িয়ে ঘরোয়া সাফল্য নিজেদের করে নেয় পেশাদার পথে হেটে। যদিও এবারও এএফসি কাপে তাদের সঙ্গী হয়েছে হতাশা। শেষ ম্যাচ প্রশ্নবিদ্ধ রেফরিংয়ের শিকার হয়ে তাদের হারতে হয় ওড়িশা এফসির কাছে। ফলে পরের ধাপে যাওয়ার স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়। তবে ঘরোয়া ফুটবলে তাদের চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো কেউ ছিল না। বছরের প্রথমভাগে তারা লিগ শিরোপার পাশাপাশি জিতেছে স্বাধীনতা কাপ। বছরের শেষভাগে এসে সেই আসরের শিরোপা ধরে রেখে আরেকটি সফল মৌসুম শুরুর ইঙ্গিত দিয়েছে তারা। কিংসের মালিক বসুন্ধরা গ্রুপ বছরজুড়েই বাফুফের শীর্ষ লিগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন লিগের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে আগের মতো এবারও। নারী ফুটবল উন্নয়নেও তারা অনেক অর্থ দিয়েছে বাফুফেকে।
নারী ফুটবলেও বইছে সুবাতাস। এ বছর সাফ অনূর্ধ্ব ২০ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জিতেছে বাংলাদেশ। ফাইনালে তারা নেপালকে হারিয়েছে ৩-১ গোলে। বছরের শেষ দিকে সিঙ্গাপুরের সঙ্গে ২ ম্যাচের প্রীতি সিরিজে বাংলাদেশের মেয়েরা সবাইকে চমকে দিয়েছে যথাক্রমে ৩-০ ও ৮-০ গোলের জয়ে। এ বছর বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে সাফ অনূর্ধ্ব-১৭ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ। যেখানে প্রথমবারের মতো আমন্ত্রিত দল হিসেবে খেলতে এসে চ্যাম্পিয়ন হয় রাশিয়া। বাংলাদেশ হয় রানার্স-আপ।
অনেক বিতর্কের মাঝেও বাফুফের দুই-তিনটে ভালো কাজও করেছে। দীর্ঘদিনের দাবির কারণে হোক, কিংবা চাপে পড়ে, বাফুফে এবার নারী ফুটবলারদের বেতন বাড়িয়েছে বহুগুণে। এ বছর বাফুফের এলিট অ্যাকাডেমির কর্মকা-গুলো প্রশংসিত হয়েছে। বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে এবারও অ্যাকাডেমি টিম ভালো খেলেছে। অ্যাকাডেমির খেলোয়াড়দের নিয়ে বাফুফে ব্যতিক্রমধর্মী নিলামের আয়োজন করে এ বছর। আর বছরের একেবারে শেষভাগে সারা দেশের অধিভুক্ত অ্যাকাডেমিগুলোকে নিয়ে বড় বাজেটের টুর্নামেন্ট আয়োজন করছে বাফুফে। নতুন মৌসুম শুরুর পরপরই তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ কমিটির দায়িত্বে নিয়ে আসেন সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে সহ-সভাপতি নির্বাচিত হওয়া ইমরুল হাসানকে। বসুন্ধরা কিংসের সাফল্যের নেপথ্যের নায়ক ইমরুল দায়িত্ব নিয়েই উদ্যোগী হয়েছেন আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যালেন্ডারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের ফুটবল পরিচালনার। জাতীয় দলকে বদলে ফেলার পুরস্কারও বাফুফে দিয়েছে কোচ হাভিয়ের কাবরেরাকে। এই ডিসেম্বরেই দ্বিতীয় প্রস্থে চুক্তি নবায়ন করা হয়েছে কোচের এবং সেটা বর্ধিত বেতনে।