৭ জানুয়ারি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশে, কিন্তু এই নির্বাচনে সীমান্তের ওপারের দেশ ভারতকে নিয়েও বেশ আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশের নির্বাচনে ভারত কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? তা নিয়ে বিস্তারিত এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি নিউজ।
বুধবার (৩ জানুয়ারি) এ বিষয়ে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রধান বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বর্জন করায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগই টানা চতুর্থ সংসদীয় মেয়াদে পুনরায় নির্বাচিত হতে যাচ্ছে।
প্রায় ১৭ কোটির জনসংখ্যার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের সীমান্তের তিন দিক দিয়েই ঘিরে আছে ভারত।
বিবিসি বলছে, ভারতের কাছে বাংলাদেশ শুধু প্রতিবেশী দেশ নয়। এটি একটি কৌশলগত অংশীদার এবং একটি ঘনিষ্ঠ মিত্র, বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলির নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ বাংলাদেশ৷
আর তাই ভারতীর নীতিনির্ধারকদের যুক্তি যে, ঢাকায় একটি বন্ধুপ্রতীম শাসকগোষ্ঠী প্রয়োজন দিল্লির। ১৯৯৬ সালে প্রথম নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর শেখ হাসিনার ক্ষমতায় ফিরে আসা দেখতে চায় দিল্লি, এটাও কোনো গোপন কথা নয়।
শেখ হাসিনা বরাবরই দিল্লির সঙ্গে ঢাকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে ন্যায্যতা দিয়েছেন। ২০২২ সালে ভারত সফরের সময়, তিনি বলেছিলেন যে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিল ভারত। আর তাই ভারতের সরকার, জনগণ এবং সশস্ত্র বাহিনীকে ভুলে যাওয়া উচিত নয় বলেও জানান তিনি।
তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলের প্রতি ভারতের এই সমর্থনের তীব্র সমালোচনা জানিয়েছে বিরোধী দল বিএনপি।
দলটির একজন সিনিয়র বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভী বিবিসিকে বলেছেন যে, "ভারতের উচিত বাংলাদেশের জনগণকে সমর্থন করা, কোনো বিশেষ দলকে নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা বাংলাদেশে গণতন্ত্র চায় না।"
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়ে এবং একটি ‘ডামি নির্বাচন’কে সমর্থন দিয়ে বাংলাদেশের জনগণকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে দিল্লি।
তবে বাংলাদেশের নির্বাচনে হস্তক্ষেপের জন্য দিল্লির বিরুদ্ধে বিএনপি যে অভিযোগ করছে সে বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র। বিবিসির এক প্রশ্নের জবাবে ওই মুখপাত্র বলেন, নির্বাচন হলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। নিজেদের ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত নিতে হবে বাংলাদেশের জনগণকে। একটি ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও অংশীদার হিসেবে আমরা দেখতে চাই বাংলাদেশে একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন।
এদিকে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী দলের প্রত্যাবর্তন নিয়ে উদ্বিগ্ন ভারতও। এই দলদুটি আবার বাংলাদেশে ইসলামপন্থিদের ফেরার পথ করে দিতে পারে বলে ধারণা ভারতের। যেমনটি ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে এই জোট ক্ষমতায় থাকার সময় হয়েছিল।
বিবিসিকে বাংলাদেশের সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, "তারা অনেক জিহাদি গ্রুপের উত্থান হতে দিয়েছিল যেগুলি বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছিল। যার মধ্যে ২০০৪ সালে শেখ হাসিনাকে হত্যার প্রচেষ্টা এবং পাকিস্তান থেকে আসা অস্ত্র ভর্তি ১০টি ট্রাক আটক করাও ছিল।"
২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর পরই শেখ হাসিনা ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলের জাতিগত কিছু বিদ্রোহী গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন। তাদের কেউ কেউ বাংলাদেশে অবস্থান করে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছিলেন। এসব পদক্ষেপের কারণে দিল্লির প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন শেখ হাসিনা।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সাংস্কৃতিক, জাতিগত ও ভাষাগত সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের সমর্থনে ভারতীয় সেনা পাঠিয়ে পাকিস্তানের কাছ থেকে বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল দিল্লি।
বিবিসি বলছে, চাল, ডাল এবং শাকসবজির মতো অনেক প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের জন্য ঢাকা দিল্লির উপর নির্ভরশীল। তাই রান্নাঘর থেকে ব্যালট পর্যন্ত বাংলাদেশে ভারত প্রভাবশালী।
এছাড়া ভারত অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ২০১০ সাল থেকে বাংলাদেশকে ৭০০ কোটিরও বেশি ঋণ দিয়েছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়েক দশক ধরে, অভিন্ন নদীর জলসম্পদ ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধ থেকে শুরু করে একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগ কারণে এই সম্পর্কের মধ্যেও উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।
ঢাকায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের ডিস্টিঙ্গুইশড ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য্য বিবিসিকে বলেছেন, বাংলাদেশে ভারতের একটি নেতিবাচক ভাবমূর্তি আছে। এর জন্ম হয়েছে এই ধারণা থেকে যে, ভারত বাংলাদেশে এমন একটি সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে, যার সম্ভবত গণতান্ত্রিক বৈধতা নেই। এ ছাড়া দুই দেশের মধ্যে অসম চুক্তি হচ্ছে বলেও একটি দৃষ্টিভঙ্গি জনমনে বিরাজ করছে। ফলে একটি ধারণা সৃষ্টি হয়েছে যে, বাংলাদেশ তার প্রতিবেশী দেশ থেকে সর্বোত্তম সমর্থন পাচ্ছে না।
২০০৯ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসেন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং পরবর্তীতে আরও দুটি নির্বাচনে জয়লাভ করেছে তার দল। তবে ব্যাপক ভোট কারচুপির অভিযোগ রয়েছে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে এবং এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে দলটি।
বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারত সড়ক, নৌ ও রেল যোগাযোগের সুবিধা পেয়েছে তার উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহনের জন্য। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, ভূমিবেষ্টিত নেপাল এবং ভুটানের সঙ্গে ভারতীয় ভূখণ্ডের ভিতর দিয়ে স্থলপথে পুরোপুরি বাণিজ্য চালু করতে সক্ষম হয়নি ঢাকা।
ঢাকায় একটি বন্ধুপ্রতীম সরকার থাকার জন্য ভারতের আরও কৌশলগত কারণ আছে বলছে বিবিসি। বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্যের সঙ্গে সড়ক ও নৌপথে পরিবহণ সুবিধা চায় দিল্লি। এখন ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে তার ‘চিকেন নেক’ নামের ২০ কিলোমিটার করিডোর- যা নেপাল, বাংলাদেশ ও ভুটানের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে, সেই পথে উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে সড়ক ও রেল সংযোগ আছে।
ভারতের কর্মকর্তাদের মধ্যে ভীতি কাজ করে যে, যদি তার প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের সঙ্গে বড় ধরনের কোনো যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়, তাহলে এই করিডোর কৌশলগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।
মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে বাংলাদেশি কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পশ্চিমা কিছু সরকার যখন নিষেধাজ্ঞা দিতে চেয়েছে, তখন এর বিরোধিতা করছে ভারত।
এদিকে বাংলাদেশে উপস্থিতির বিস্তার ঘটাতে উদগ্রীব চীন। ভারতের বিরুদ্ধে তারা এ অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই করছে।
ভারতের সাবেক কূটনীতিক পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, আমরা পশ্চিমাদেরকে এই বার্তা দিয়েছি যে, যদি আপনারা শেখ হাসিনার ওপর চাপ সৃষ্টি করেন, তাহলে তিনি চীন শিবিরের দিকে অগ্রসর হবেন, যেমনটা অন্য দেশগুলো করেছে। তা হবে ভারতের জন্য একটি কৌশলগত সমস্যার কারণ। এমন পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করার সামর্থ আমাদের নেই।
দুই সরকারের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও ভারতে এলে কিছু বাংলাদেশিদের মধ্যে সন্দেহ দেখা দেয়। ঢাকার একজন সবজি ব্যবসায়ী জমিরউদ্দিন বিবিসিকে বলেন, "আমি মনে করি না ভারতীয়রা সব ক্ষেত্রে বন্ধুত্বপূর্ণ। আমরা একটি মুসলিম জাতি হওয়ায় ভারতের সাথে আমাদের সবসময় সমস্যা হয়।"
তিনি আরও বলেন, "আমাদের আগে নিজেদের রক্ষা করতে হবে এবং তারপর অন্যের উপর নির্ভর করতে হবে। অন্যথায়, আমরা সমস্যায় পড়ব।"
দিল্লি যখন ইসলামপন্থী পুনর্গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বিগ্ন, সেখানে বাংলাদেশের অনেকেই সীমান্তের ওপারে কী ঘটছে তা নিয়ে চিন্তিত৷
বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ হিন্দু।
দিল্লি এ বিষয়ে পরিষ্কার যে, শেখ হাসিনা নেতৃত্বে থাকায় তাদের স্বার্থ রক্ষা হবে। কিন্তু চ্যালেঞ্জিং বিষয় হবে বাংলাদেশের জনগণের কাছে পৌঁছানো।
