প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ ‘ভালোবাসার গল্প’ (১৯৭৭) থেকেই তিনি বিপুলভাবে সংবর্ধিত, পাঠকপ্রিয়। বাংলাদেশের প্রথম জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলনের প্রথম উপন্যাস ‘যাবজ্জীবন’। মহায়তন ‘নূরজাহান’ তার নাম বহন করে চলেছে, হয়েছে দুই বাংলায়ই নন্দিত। কথাসাহিত্যের প্রায় সব শাখায় সাবলীল তিনি। ছোটগল্প, নভেলা, উপন্যাস, সম্পাদনা মিলিয়ে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা দেড় শতাধিক। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন ১৯৯২ সালে, ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য একুশে পদক পান ২০১৯ সালে। ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের পরিচালক ও কালের কণ্ঠের প্রধান সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলনের সঙ্গে শুক্রবারের আড্ডায় বসেছিলেন দেশ রূপান্তরের সহকারী সম্পাদক তাপস রায়হান, আলোকচিত্র সম্পাদক সাহাদাত পারভেজ, হেড অব ইভেন্টস অ্যান্ড ব্র্যান্ডিং শিমুল সালাহ্উদ্দিন, জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদক সালাহ উদ্দিন শুভ্র এবং সহ-সম্পাদক এনাম-উজ-জামান বিপুল
আড্ডা শুরুর আগের কথা। মাত্র অফিসে ঢুকছেন। দাঁড়িয়ে আছেন গ্রাউন্ড ফ্লোরে, লিফটের সামনে। এমন সময় দেখা হলো তাপস রায়হানের সঙ্গে। হাতঘড়ি দেখিয়ে বললেন আমার আসার কথা ৪টায়। এখনো ৩ মিনিট বাকি। হাহাহাহাহাহা। চলো, যাই...? তিনি অফিসে ঢুকলেন। শিমুল সালাহ্উদ্দিন তাকে দেখে হৈ হৈ করে উঠলেন। একে একে আরও অনেকেই। এরপর শুরু হলো প্রাণবন্ত আড্ডা।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : মানুষের এমন কপাল, সে আয়নায় নিজেকে উল্টো দেখে। যার প্রজ্ঞা আছে সে নিজেকে চিনতে পারে। মিলন ভাই, আপনি কবে থেকে নিজেকে চিনতে পারলেন?
ইমদাদুল হক মিলন : আমার বড় হয়ে ওঠার দিনটি খুব মনে আছে। আমাদের একটার পর একটা ভাইবোন হয়েছিল। আমরা মোট ১১ ভাইবোন। একজন ১৮ দিন বয়সে মারা গেলেন। বড়ভাই করোনায় মারা গেলেন, একজন ভাই তার আগে মারা যায়। এখন আমরা ৬ বোন আর ২ ভাই বেঁচে আছি। যে দিনটির কথা বলছিলাম, তখন আমরা বিক্রমপুর নানাবাড়িতে থাকি। বর্ষাকাল, আমার মায়ের আরেকটা বাচ্চা হবে। তিন-চারটা ভাইবোন আমরা তখন একটুখানি বড় হয়েছি। আমার বোধহয় ৫ বছর হবে, তখনো স্কুলে ভর্তি হইনি। সেদিন দুপুরে হঠাৎ আমার নানাবাড়ির একজন কাজের লোক বলল, চলো এখানে একটা হাজাম বাড়ি আছে ওখানে তোমাদের নিয়ে যাব। ওই হাজাম বাড়িতে আমরা আড্ডা দিতে, খেলতে যেতাম। দুপুরবেলা ভাত-টাত খাওয়ার পরে আমাদের নিয়ে গেলেন। আমরা সারা বিকেল সেখানে থাকলাম। তারপর বিকেলের দিকে হঠাৎ বলেন এবার চলো বাড়ি যাই। আমরা ফিরে এসে দেখি আমার বোন হয়েছে। বুঝলাম, আমার মায়ের সন্তান জন্ম দেওয়ার সময়টা তার কষ্ট পাওয়ার শব্দটা যেন বাচ্চাদের কানে না যায়, এ জন্য আমাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এ দিনটির কথা আমার খুব মনে পড়ে। আমি বড় হয়ে উঠছি, সেদিন টের পেলাম। আরেকটা স্মৃতির কথা এ প্রসঙ্গে বলা যায়। আমার নানির সংগ্রহে কিছু বই ছিল। নানি স্কুলে পড়েননি কখনো। তবে তার আলমারিতে কয়েকটা বই ছিল। নানাবাড়ি ছিল মেদিনীমণ্ডল। আমার পৈতৃক বাড়ি ‘পয়শা’ বলে একটা গ্রাম। সেটা লৌহজংয়ে। মেদিনীমণ্ডল হচ্ছে এখন যে মাওয়ায় পদ্মা সেতু হয়েছে এর ঠিক আগের গ্রাম। আমার ছেলেবেলায় ওই এলাকায় ১০-১২ হাত পানি থাকত। এখন কল্পনাই করা যাবে না যে, এটা বাংলাদেশের কোনো গ্রাম। আর ‘পয়শা’ গ্রামের নাম হয়েছে কারণ ওখানে প্রচুর ধান হতো। ধান বিক্রি করে টাকা-পয়সা পেত বলে পয়শা।
সারা দিন-রাত তখন বৃষ্টি হতো। দশ দিন ধরে টানা বৃষ্টি আর থামতই না। বৃষ্টি সব ভাসিয়ে নিয়ে যেত। তারপর শরৎকাল আসত। তবে আমাদের শরৎকালটা মনে থাকত না। আমাদের মনে থাকত শীতকাল। শীতের রোদ কিন্তু কড়া হয়। এমন শীতে আমার নানি দেখলাম উঠানের রোদে একটা পাটি বিছিয়ে তাতে বই শুকাতে দিয়েছেন। আমার মনে আছে, বঙ্কিমচন্দ্রের ‘কপালকুণ্ডলা’, ‘বিষাদ সিন্ধু’ ছিল মীর মশাররফ হোসেনের, শরৎচন্দ্রের কয়েকটা বই ছিল। বইগুলো বর্ষায় স্যাঁতসেঁতে হয়ে যেত। যখন ওগুলো রোদে দিত, তা থেকে একটা গন্ধ আসত। এ গন্ধটা আমাকে আকৃষ্ট করত। আমার মনে হয় যে, আলাদা রকম এসব বইয়ের গন্ধের ভেতর দিয়ে আমি ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠেছিলাম।
আরেক দিনের কথা বলতে পারি। আমার এক মামা, আমার সমানই। সে আমাকে একটা ধাক্কা দিল অকারণে। আমাকে মাঠের মধ্যে একটা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। আমার চেয়ে বয়সে কিছু বড় এবং শক্তিশালী ছিল। আমার মনে হলো, আমি তো কোনো অন্যায় করিনি। তাহলে সে এমন করল কেন! আমার মনের মধ্যে প্রতিশোধের বাসনা তৈরি হলো। তার কয়েক দিন পর মামা আমাকে এসে বলল, চল খেলতে যাই। আমাদের বাড়ির সামনে তখন একটা পুকুর ছিল। আমরা নতুন পুকুর বলতাম। ওই পুকুরের সঙ্গে একটা ছোট মাঠ, নির্জন একটা গ্রাম। সেই পুকুর পাড়ে খেলার সময় মামা নতুন শার্ট পরে গেছেন। নানা তাকে সেটা কিনে দিয়েছিলেন। ওই শার্ট মাঠের মধ্যে খুলে রেখে মামা খেলতে নেমেছেন। একপর্যায়ে তার বাবা মানে আমার নানা তাকে ডেকে পাঠালেন। আমার আপন নানা নন তিনি। মায়ের মেজো কাকা। আপন নানাকে আমি দেখিনি। মামাকে ডাক দেওয়ার পর আমি ভাবলাম যে, এবার প্রতিশোধটা নেব। আমি একটা মাটির ঢেলা নিয়ে ওর নতুন শার্টে পেঁচিয়ে পুকুরে ফেলে দিলাম। মামা ফিরে আসার পর কেন যেন তার শার্টের কথা মনে পড়ল না। হয়তো নানা বকেছেন সেই ভয়ে ভুলে গেছেন। দুদিন পর নানা জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওই তোর শার্টটা কই’? মামা তখন আমার কাছে আসলো। আমাকে ‘মামু’ বলে ডাকতো। বলল, ‘মামু আমার শার্টটা কই?’ এরপর নানা তার ঘেটি ধরে বেদম মারল। আমি বিষয়টা এনজয় করলাম। এসব অনুভূতির মধ্য দিয়ে মানুষ বড় হয়ে ওঠে।
তাপস রায়হান : আপনি এসএসসি দিয়েছিলেন ’৭০ সালে?
ইমদাদুল হক মিলন : আমি কিন্তু ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হইনি। আব্বা আমাকে সরাসরি গ্রামের একটা হাইস্কুলের ক্লাস টুতে ভর্তি করিয়ে দিলেন। পরে আমরা গে-ারিয়া চলে আসি ’৬৪ সালে। সেখানে আমাকে আর আমার বড়ভাইকে আব্বা গে-ারিয়া হাইস্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। তখন ’৬৬ সাল, বাবা আমাকে ভর্তি করিয়ে দিলেন ক্লাস সিক্সে। ’৭১ সালে আমি এসএসসি ক্যান্ডিডেট হলেও পরীক্ষা দিই বাহাত্তরে। কিন্তু একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তানিরা একটা পরীক্ষা নিয়েছিল। আমরা সেই পরীক্ষা দিইনি। কিন্তু আমাদের এক বন্ধু ছিল। আমাদের মধ্যে সে একমাত্র মুক্তিযোদ্ধা। তার নাম মোহাম্মদ আলী, ডাক নাম বুলু। সে করল কী একটা চিনা বাদামওয়ালার চাঙারি গলা ঝুলিয়ে, মাথায় গামছা বেঁধে, লুঙ্গি বেঁধে পোগোজ স্কুলে একটা বোমা মেরে দিয়ে এলো। ভ-ুল করে দিল পরীক্ষা। স্বাধীনতার পর আমাদের সেই পরীক্ষা হলো ’৭২ সালের এপ্রিল মাসে। এরপর জগন্নাথে ইন্টারমিডিয়েট, জগন্নাথে ইকোনমিক্সে অনার্স।
সালাহ উদ্দিন শুভ্র : আপনার লেখালেখির দিকে যদি ফিরি। সাধারণত বাংলা কথাসাহিত্য ছিল জটিল বাক্য ও ভারি ভারি শব্দ দিয়ে তৈরি। সেখানে আপনি শুরু করলেন সহজ-সরল গদ্য দিয়ে। এর শুরুটা কীভাবে হলো?
ইমদাদুল হক মিলন : আমি যখন লেখালেখি শুরু করি এবং বুঝতে পারি যে, আমার লেখা মানুষ পড়ছে তখন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম জনপ্রিয় লেখক হব। পৃথিবীর কেউ বোধহয় এভাবে ভাবে না যে, তিনি জনপ্রিয় লেখক হবেন। জনপ্রিয় লেখক হওয়াটা ক্রেডিটের ব্যাপার না। কিন্তু আমি প্রথমেই ভাবলাম যে জনপ্রিয় হব। আমি একটা জায়গা দিয়ে হেঁটে গেল লোকে বলবে ইমদাদুল হক মিলন যাচ্ছে। এটা আমি চেয়েছি। প্রথমে আমি ভেবেছি যে, কারা বই পড়ে? তখন দেখলাম যে, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা পড়ে, গৃহবধূরা পড়ে। গৃহবধূরা কী ধরনের বই পড়ে? প্রেমের সহজ-সরল কাহিনি। কলেজ-ইউনিভার্সিটির ছেলেমেয়েরাও তাই পড়ে। ওই বয়সটায় তারা প্রেমের আবহে থাকতে ভালোবাসে। দেবদাসও পড়ে, আবার মিলনাত্মক প্রেমের কাহিনিও পড়ে। আমার লক্ষ্য ছিল এমন একটা সহজ ভাষাভঙ্গি তৈরি করা, যা হবে অ্যাট্রাকটিভ। এক পৃষ্ঠা পড়লে যেন পরের পৃষ্ঠা পড়ার আগ্রহ তৈরি হয়। আমি এমন একটা ভাষা তৈরির চেষ্টা করলাম। ছোট ছোট বাক্য, সহজ-সরল শব্দ। যে মুখের ভাষায় আমরা কথা বলি, তা সাহিত্যে নিয়ে আসার চেষ্টা করি। যদি কাউকে ফলো করার কথা আসে, তাহলে বলব সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভাষা আমাকে আকৃষ্ট করেছে। বাংলা ভাষায় সরল কিন্তু আকর্ষণীয় গদ্য প্রথম লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, এরপর বুদ্ধদেব বসু। এদের গদ্য সরল। কিন্তু সরল গদ্যের মধ্যে সবকিছু আছে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আপনার প্রিয় লেখকদের কথা শুনি?
ইমদাদুল হক মিলন : দেশি-বিদেশি প্রিয় লেখকের কথা বললে শেষ হবে না। আমি যদি তলস্তয়ের ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ উপন্যাসের কথা বলি, শুরুতে কিন্তু আমি ঢুকতে পারিনি সে উপন্যাসে। পৃথিবীর সর্বকালের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। স্কুলে-ইন্টারমিডিয়েটে এ বইয়ে আমি ঢুকতে পারিনি। অনার্স পড়ার সময় জেদ চাপল যে এটা আমি পড়বই। আশি-নব্বই পৃষ্ঠা পড়ার পর মনে হলো যুদ্ধের ভেতর ঢুকে যাচ্ছি। দুই হাজার পৃষ্ঠার উপন্যাস মন্ত্রমুগ্ধের মতো পড়ে গেলাম। দস্তয়েভস্কির ‘অভাজন’ আর ‘লাঞ্ছিত নিপীড়িত’ পড়ে আচ্ছন্ন হয়ে গেছি। আরেকটা উপন্যাসের কথা কেউ বলে না নোবেলজয়ী রাশান সাহিত্যিক মিখাইল শলোকভের ‘অ্যান্ড কোয়াইট ফ্লোজ দ্য ডন’। ওই একটি উপন্যাস লিখে নোবেল পেয়েছিলেন। আমাদের যেমন আছে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘পদ্মা নদীর মাঝি’; তেমন নদী নিয়ে উপন্যাসটি। আরেকটা উপন্যাস ‘ইস্পাত’। এ উপন্যাস খুব প্রভাবিত করেছিল। তারপর পৃথিবী কাঁপিয়ে দেওয়া উপন্যাস ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ এবং কামুর ‘আউটসাইডার’।
তাপস রায়হান : আপনার লেখার ধরনটা কী রকম? আপনার ভাগ্য খুব সুপ্রসন্ন বলে মনে হলো। ভাগ্য যেভাবে আপনার ওপর আপনা থেকেই বর্ষিত হয়েছে, লেখাও কি সেভাবে বর্ষণের মতো আসে? আপনি কি আগে ভাবেন পরে লেখেন, নাকি লিখতে লিখতে অগ্রসর হন?
ইমদাদুল হক মিলন : ভাগ্য যে আমার ওপর সুপ্রসন্ন তা আমি স্বীকার করি। আমি আমার ভাগ্যের কাছে সত্যি খুব ঋণী। ভাগ্য আমাকে প্রচুর বন্ধু দিয়েছে, অনেক মানুষকে দিয়েছে যারা আমার মাথায় ছায়া দিয়েছে। সত্যি ভাগ্য আমার সামনে অনেক দরজা খুলে দিয়েছে। আমি গল্প-উপন্যাস ভেবে লিখি। আমি একটা থিম ভাবি। ভেবে আমার মনে হয় যে এটা নিয়ে গল্প হতে পারে। থিম আগে মাথায় না এলে গল্প বা উপন্যাস লেখা যায় না বলে আমার ধারণা।
সাহাদাত পারভেজ : মিলন ভাই, আগে না ভেবে কি কিছুই লেখেন না?
ইমদাদুল হক মিলন : কিছু হয় কী কলম ছাড়া গদ্য বলা যেতে পারে। মানে কলমটা ছেড়ে দিয়েছি। ধরা যাক, মাহমুদুল হকের বিষয়ে আমি লিখব। আমার সিনিয়র ফ্রেন্ড। তো ওটা আমি শুরুই করলাম এভাবে যে, মাহমুদুল হকের ডাকনাম বটু। তারপর কলম চলতে থাকল। এ রকম লেখাও হয়। কিন্তু গল্প-উপন্যাস লেখার আগে আমি ভাবি। শুরু দিকে অবশ্য তাও ভাবতাম না।
সালাহ উদ্দিন শুভ্র : মনে হয়েছে আপনি হুমায়ূন আহমেদের চেয়ে ভালো লেখেন। সেটা বিক্রি বা জনপ্রিয়তার অর্থে না, লেখার অর্থে। বিষয়টাকে কীভাবে দেখেন? পরে ধরন বদলে ফেলেছিলেন? এনাম-উজ-জামান বিপুল বললেন হুমায়ূন আহমেদও লিখেছিলেন, আমি যখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসি, তখন দেখেছি মিলন জনপ্রিয় লেখক।
ইমদাদুল হক মিলন : হুমায়ূন ভাইকে প্রথম যেদিন দেখলাম, উনি আমার কাছে ‘ও রাধা ও কৃষ্ণ’ বইয়ের অটোগ্রাফ নিতে এসেছিলেন। কিন্তু পরে যেটা আমি সচেতনভাবে করেছি, সেটা হলো... তোমরা লক্ষ্য করবে যে আমার প্রথম বই হলো ‘ভালোবাসার গল্প’। বারোটা অত্যন্ত কাঁচা মেজাজের ওই বয়েসের লেখা প্রেমের গল্প। এর পরের বইটার নামই ‘নিরন্নের কাল’। যে লেখকের প্রথম বই ‘ভালোবাসার গল্প’ তার পরের বই ‘নিরন্নের কাল’ তুমি মেলাতে পারবে? সেই গল্পগুলো ছিল দুর্ভিক্ষ ও দাঙ্গা নিয়ে। এর কারণ হলো, আমি যখন মোটামুটি মানিক, বিভূতি, সমরেশ বসু এদের লেখা পড়তে শুরু করলাম, সুনীল, শীর্ষেন্দু, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস পড়তে শুরু করি; তখন আমার মনে হলো শুধু হালকা মেজাজের প্রেমের উপন্যাস লিখবেন জনপ্রিয় হওয়ার জন্য, এটা একজন লেখকের কাজ হতে পারে না। তার আগে একজন লেখকের সঙ্গে আমি মিট করি। তিনি হচ্ছেন, সমরেশ বসু।
এনাম-উজ-জামান বিপুল : হ্যাঁ, প্রজাপতি, বিবর, গঙ্গা। শিমুল সালাহ্উদ্দিন বললেন, এগুলো ওনার ডান হাতে লেখা, আর বাম হাতের লেখাও আছে?
ইমদাদুল হক মিলন : এটা সমরেশ বসু আমাকে বলেওছিলেন। আমি জানতে চাইলাম সমরেশ দা, আপনি যে হাতে গঙ্গা লেখেন, সে হাতে আবার ‘বিকেলে ভোরের ফুল’ কীভাবে লেখেন. তিনি বললেন, শোনো, আমি গঙ্গা লিখি ডান হাত দিয়ে। ও লেখায় আমার পয়সা আসে না। আমাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। আর ‘বিকেলে ভোরের ফুল’ লিখি বাম হাত দিয়ে। ও আমাকে পয়সা দেয়। ও না লিখলে আমি তো খেতে পাব না। আমার একসময় মনে হলো ‘ও রাধা ও কৃষ্ণ’ লিখছি, ‘ভালোবাসার সুখ দুঃখ’ লিখছি। ৮৭ হাজার কপি এক মেলায় বিক্রি হয়ে গেল। কিন্তু আমার প্রথম উপন্যাস ‘যাবজ্জীবন’ ওই ধরনের লেখা না। এটা নিশ্চিত যে, হুমায়ূন আহমেদ অনেক গুণী লেখক, সাহিত্যের বহু শাখায় তিনি বিচরণ করেছেন। আমি তাকে শ্রদ্ধা করি। আমি ইচ্ছাকৃতভাবে অন্য উপন্যাসও লিখেছি। আমার জীবনে অনেক গল্প। ‘ভালোবাসার সুখ দুঃখ’ তখন বইমেলার বেস্ট সেলার। ভিড় সামাল দিতে পুলিশ ডাকতে হলো। আমি যে স্টলে দাঁড়ালাম একদিন ধাক্কাতে ধাক্কাতে পানিতে ফেলে দিল, আমি ভিজে গেলাম। এ উপন্যাস খালি অটোগ্রাফ দিই। এক মেলাতেই মনে হয় ৮৭ হাজার বিক্রি হলো। একদিন দেখি, এক নারী দাঁড়িয়ে আছেন। আমি অটোগ্রাফ দিচ্ছি। তাকে বললাম আপনার বইটা দেন। উনি বললেন, আমি তো আপনার বই নিতে আসিনি। আপনার এ বই আমি নিয়ে গেছি, পড়ে ফেলেছি। এসব কী ছাইপাশ লেখেন। আপনার ‘যাবজ্জীবন’, ‘নিরন্নের কাল’ পড়েছি। আরও কিছু গল্প পড়েছি। আপনি এ রকম একটা স্তর থেকে এসব ছাইপাশ লেখেন বাচ্চা ছেলেমেয়েদের মন ভোলানোর জন্য? এগুলো কোনো লেখা? আমি হতবাক। বললেন, একজন সম্ভাবনাময় লেখকের মৃত্যু হচ্ছে, এটা বলার জন্য আমি এখানে এসেছি। আমি আর দাঁড়াতে পারলাম না। আমি তখন বাংলা একাডেমি বইমেলা থেকে হেঁটে গে-ারিয়া গেলাম। একা একা। তখন আমার মনে হলো, আমি এমন একটা কিছু লিখব, যা দিয়ে মানুষ আমাকে সারাজীবন মনে রাখবে। আর সেটা হলো ‘নূরজাহান’।
এনাম-উজ-জামান বিপুল : আপনি একদিকে ‘ভালোবাসার সুখ দুঃখ’ লিখছেন, আবার ‘নূরজাহান’ লিখছেন। আমরা আপনার আরেকটা পরিচিতিও পাই যে, আপনি সম্পাদনাও করেছেন প্রচুর?
ইমদাদুল হক মিলন : একটা সময় দেখলাম যে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রচুর বই সম্পাদনা করেন। যেমন কিশোরদের জন্য ভূতের গল্প। তখন ভাবলাম আমিও করব। আমাদের দেশের লেখকদের নিয়ে করব। কলকাতার একজন প্রকাশক বললেন, আপনি সুনীলদার সঙ্গে একশ গল্পের একটা সংকলন করে দেন দুই বাংলার লেখকদের নিয়ে। এ রকম বই সুনীল, শীর্ষেন্দু, বুদ্ধদেব গুহের সঙ্গে সংকলন করলাম। আমি দেখাতে চাইলাম যে, শুধু ওই বাংলার নয় এ বাংলার লেখকরাও সক্রিয় আছেন।
সালাহ উদ্দিন শুভ্র : আপনার উপন্যাসে দেখা যায়, একজন অর্থকষ্টে থাকা যুবকের চরিত্র। যেটা পাঠক হিসেবে বুঝি যে, এ চরিত্র আপনি। আবার এখন আপনি পশ একটা অফিসে বসেন, অনেক বড় পত্রিকার সম্পাদক। এ দুই চরিত্রকে কি কখনো মেলাতে পারেন?
ইমদাদুল হক মিলন : আমার মনে হয়েছে, আমি পয়সার জন্য কেন লেখব? কিন্তু গত দুদিন ধরে দস্তয়েভস্কির জীবনী পড়ে দেখলাম, তিনি সারাজীবন পয়সার জন্যই লিখেছেন। তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ লেখক। সেই প্রতিভার কাছে আমরা কীভাবে পৌঁছাব? কিন্তু তারপরও আমার মনে হয় যে, আরেকটু যদি সচ্ছল জীবন পেতাম শুরুতে, পয়সার জন্য যদি না লিখতে হতো, তাহলে হয়তো আরও ভালো লিখতে পারতাম। হয়তো অল্প লিখতাম, কিন্তু অনেক ভালো লিখতাম। এ বেদনায় আমি ভুগি।
সাহাদাত পারভেজ : এর সঙ্গে যোগ করি। আপনার সম্পাদক জীবন কি লেখক জীবনকে প্রভাবিত করে?
ইমদাদুল হক মিলন : সম্পাদক হিসেবে আমার লেখালেখি তেমন প্রভাবিত হয় না। কারণ আমি প্রতিদিন ভোর ছয়টায় ঘুম থেকে ওঠি। ঘুমাতে যাই এগারটায়। ভোরে উঠে দুই ঘণ্টা লেখালেখি করি প্রতিদিন। তারপর রেডি হয়ে বারোটার মধ্যে অফিসে চলে যাই। আমি মনে করি, পরিশ্রমই সব কিছু। কখনো অলসতা করিনি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : জনপ্রিয় নাটক ‘বারো রকমের মানুষ’, ‘রূপনগর’, ‘যুবরাজ’, ‘মেয়েটি এখন কোথায় যাবে’। পৃথিবী যেদিকে যাচ্ছে, স্ক্রিন ইজ দ্য আলটিমেট প্লেস টু টেল স্টোরি আপনি কী মনে করেন? এ সময়ের টিভি, ওটিটি বা ফিল্মমেকাররা আপনার গল্প চাচ্ছে না? নাকি দিচ্ছেন না?
ইমদাদুল হক মিলন : আমি একসময় প্রচুর লিখেছি টেলিভিশনের জন্য। আধুনিকতাকে তো মেনে নিতে হবে। স্ক্রিন গুরুত্বপূর্ণ। আমার সব গল্প-উপন্যাসের টিভিস্বত্ব কিনে নিয়েছে চ্যানেল আই। তবে যে কেউ বানাতে পারবে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন : আমাদের শেষ করতে হবে মিলন ভাই, আপনার সঙ্গে আড্ডা তো ৪ দিনেও শেষ হবে না, এবার মেলায় কী কী বই বের হচ্ছে এটা যদি বলেন একটু?
ইমদাদুল হক মিলন : এবার বইমেলায় আমার দুটি বই আসছে। ওগুলো গল্পের। একটি কিশোরদের জন্য। আমি প্রতি মেলায় কিশোরদের জন্য বই আনি। আরেকটি বড়দের গল্পের বই। এটির নাম ‘অন্ধকার নামতে পারেনি’। আর কিশোরদের বইটির নাম ‘চোর এসে গল্প করেছিল’। এ বইগুলো করছে অনন্যা প্রকাশনী। আর এ বছর আমি কলকাতার আনন্দমেলা পূজাসংখ্যায় একটি কিশোর উপন্যাস লিখেছি, ওটা ইতিমধ্যে বই আকারে বের হয়েছে।
গ্রন্থনা : সুমাইয়া খানম
ছবি : আবুল কালাম আজাদ
লোকেশন : গ্রিন লাউঞ্জ
