নিজেকে সলো সিঙ্গার ভাবি না

আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৮:৩৫ এএম

জনপ্রিয় ব্যান্ডশিল্পী মাকসুদুল হক। যিনি ‘মাকসুদ’ নামে পরিচিত। রক, রেগে, জ্যাজ, মেটাল বা ফোক নানা ঘরানায় গান গেয়ে যাচ্ছেন এই গুণী শিল্পী। ১৯৮৭ সালে বাংলা গানে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবেশ করেন মাকসুদ। সারগামের ব্যানারে বাজারে আসে ফিডব্যাকের দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘উল্লাস’। অসাধারণ জনপ্রিয়তা পায় ফিডব্যাক। ১৯৯০ সালে এলো ‘মেলা’। এই অ্যালবামেই ছিল জনপ্রিয় গান ‘মেলায় যাইরে’। মাকসুদই গানটি লেখেন। ফিডব্যাক ছেড়ে গড়ে তোলেন নতুন ব্যান্ড ‘মাকসুদ ও ঢাকা’। এই শিল্পী এসেছিলেন দেশ রূপান্তরে। জম্পেশ গল্প-আড্ডায় সময় কাটে দীর্ঘক্ষণ। আড্ডাবাজ ছিলেন সহকারী সম্পাদক তাপস রায়হান, সিনিয়র সহ-সম্পাদক ইমরোজ বিন মশিউর, সিনিয়র সহ-সম্পাদক সালাহ উদ্দিন শুভ্র ও সহ-সম্পাদক নাজমুস সাকিব রহমান। ক্যামেরার বাইরে ছিলেন ডিজিটাল প্রযোজক লিটু হাসান।

শুরু করলেন ইমরোজ বিন মশিউর। তিনি আড্ডার সংক্ষিপ্ত ভূমিকা দিলেন। সবাই নিশ্চুপ। স্বাভাবিক কণ্ঠে বলছেন মাকসুদুল হকের বাড়তি পরিচয়ের কিছু নেই। দীর্ঘ ৪৫ বছরের সংগীতজীবন তার। অনেক চড়াই-উতরাই, ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে পাড়ি দিয়েছেন সময়। নানা অভিজ্ঞতার আলোকে আমাদের সমৃদ্ধ করেছেন। ব্যান্ড মিউজিকের এই জনপ্রিয় তারকার সঙ্গে আড্ডা হবে একবারেই অগোছালো। কথা বলব, যার যেমন খুশি। অন্যদিকে মাকসুদুল হক মিটিমিটি হাসছেন। মাথা নিচু করে। হঠাৎ একটু মাথা উঁচু করে কিছু বলার আগেই প্রশ্ন করলেন ইমরোজ বিন মশিউর। বললেন 

ইমরোজ বিন মশিউর : চলচ্চিত্রের গান দিয়েই শুরু করি। আপনার গাওয়া ‘তোমাকে দেখলে একবার/ মরিতে পারি শতবার’। আলাউদ্দিন আলীর সুর ও সংগীতে গানটি গেয়েছিলেন। তারুণ্যে ভরপুর একজন মানুষ, আগুনখেকো সেই সময়ে, দ্যাটস অলসো লাভ টাইম (হা হা হা), যখন বামবা কনসার্ট করলেন তখন আপনি খুব চনমনে মানুষ। সে সময় দারাশিকো পরিচালিত ‘অঞ্জলি’ ছবিতে ‘তোমাকে দেখলে একবার/ মরিতে পারি শতবার’ গানটি যেন আপনার সঙ্গে ঠিক যাচ্ছিল না?

মাকসুদুল হক : (হো হো হো)। আসলে চলচ্চিত্রে গান করব, এমন ইচ্ছা কোনো দিনই ছিল না। কিন্তু আলাউদ্দিন ভাই অনেক আগেই আমাকে বলে রেখেছিলেন, একটি গানের জন্য। তিনি বলেছিলেন মাকসুদ, তুমি একপায়ে রেডি থাকো। সিনেমাতে তোমাকে গান গাওয়াব। আমি তো অবাক। আলাউদ্দিন ভাইয়ের সুরে গান গাইতে তো কপাল লাগে (তিনি কপালে হাত ছোঁয়ালেন)। তার সঙ্গে দেখা হলেই বলতাম বস, দাঁড়িয়ে আছি কিন্তু একপায়ে। তিনি বলতেন, হবে হবে। তখন আমার জন্য সময়টা ভালো ছিল না। মা হাসপাতালে, মৃত্যুশয্যায়। ২ দিন রিহার্সেল করার পর গানের রেকর্ডিং হলো। কিন্তু আমার ভালো লাগেনি, খুশি ছিলাম না। কারণ হচ্ছে, সিনেমার গানের রেকর্ডিংয়ের সময় অনেক মানুষ থাকে। আসলে এত মানুষের ভিড়ে আমি গান  রেকর্ডিং করতে পারি না। কিন্তু রেকর্ডিং শেষে আলাউদ্দিন ভাই বললেন গানটা ভালোই গাইছো। যদি চাও, আরেকবার আইসো। নতুন ট্র্যাক করব। আমি বললাম, ঠিক আছে। এরপর আমাকে আর ডাকেননি, হা হা হা। অবশ্য নিজের কাছেই অবাক লাগত। কনসার্টে বলতাম, আমি একটা গুনাহ করে ফেলছি। সিনেমাটা দেখতে পারিনি, হলে গিয়ে। কারণ মা তখন মারা যান। আমি শুনেছি, মানুষ সিনেমা হলে যেত গানটা শোনার জন্য। গান শেষ, তারা হল থেকে বের হয়ে আসত। এটা আমার জন্য বিশাল পাওয়া। অনেকেই বলত, এই গানের জন্যই সিনেমাটা হিট করছে। সব মিলিয়েই একটা মিশ্র অনুভূতি। আসলে বিষয়টা আমি খুব এনজয় করেছি।

সালাহ উদ্দিন শুভ্র : ওই সময় সিনেমার দর্শকরা তো আপনাকে আবার চিনত না। তারা আপনার শ্রোতা ছিলেন না?

মাকসুদুল হক : না। আসলে তখন এন্ড্রু কিশোর, খালিদ হাসান মিলু, কুমার বিশ্বজিৎ, তপন চৌধুরী পর্দায় এদের কণ্ঠ শুনে মানুষ অভ্যস্ত। পাশাপাশি মনে হয়, দর্শক নতুন কণ্ঠ চাইছিলেন। এটাও হতে পারে, আমি ব্যান্ড থেকে এসেছি। হয়তো এই কারণে সবার একটা আকর্ষণ ছিল।

তাপস রায়হান : আপনার কণ্ঠ, গান গাওয়ার ভঙ্গির সঙ্গে আইয়ুব বাচ্চুর একটা মিল আছে। এটা লক্ষ্য করেছেন? কে, কার দ্বারা প্রভাবিত?

মাকসুদুল হক : আমি জানি না। আইয়ুব বাচ্চু তো আমার জুনিয়র ছিলেন। বলতে পারব না। তবে তার একটা নিজস্ব গায়কি ছিল। একটা ডিফারেন্ট ভয়েস ছিল। আমার মনে হয়, বাংলাদেশে আইয়ুব বাচ্চুর মতো ভয়েস দ্বিতীয়তটি আর সৃষ্টি হয়নি। আসবে কিনা জানি না। একটা রক ভয়েস ছিল।

নাজমুস সাকিব রহমান : আপনি অনেক সংগীত পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছেন। আলাউদ্দিন আলীর কর্মপদ্ধতি কেমন ছিল?

মাকসুদুল হক : তিনি সবসময় কাজ করতেন রাতের বেলায়। একদম সারা রাত। শুরুই করতেন রাত ৮টার পর। তখনই হতো রিহার্সেল বা রেকর্ডিং। তিনি বলতেন বাইরে এত ভিড়ভাট্টা, এত নয়েজ  আমি একটু শান্তি মতো কাজ করতে চাই। গানের বিষয়ে তিনি ছিলেন ভীষণ কড়া। নোটেশন একটু এদিক-সেদিক হলেই তিনি রেকর্ডিং থামিয়ে দিতেন। বলতেন এটা ঠিক হচ্ছে না। আবার করো। তবে রেকর্ডিংয়ের সময় তিনি বরাবর আমাকে বলতেন মাকসুদ, তুমি তোমার মতো গাও। তবে ভয় পেতাম। কারণ প্রায়ই সেখানে থাকতেন সৈয়দ আব্দুল হাদী ভাই (তিনি হাত জোড় করলেন)। আমি তাকে সালাম করে গান শুরু করতাম। তিনি বলতেন না না, যা যা। তুই ভালো গান গাইবি। 

সালাহ উদ্দিন শুভ্র : আপনার শুরুর দিকের গল্প শুনতে চাই? ইমরোজ বিন মশিউর আবার এর সঙ্গে যোগ করলেন ৪৫ বছর ধরে আপনি এই জগতে। একদিকে সংসার অন্যদিকে মিউজিক। কখনো কি ক্লান্ত লেগেছে?

মাকসুদুল হক : (হাসতে হাসতে) মিউজিক কখনো আমাকে ক্লান্ত করেনি। ক্লান্ত করে, মানুষের আচরণ এবং কিছু মানুষের উন্নাসিকতা। আমরা সবসময় সিনিয়রদের সম্মান করতাম। অনেক সময় ফলোও করতাম। কিন্তু এখন সেটা দেখি না। এই জেনারেশন কাউকে ফলো করে না। (তাপস রায়হান বললেন, শ্রদ্ধাবোধটাও কমে গেছে। মাকসুদুল হক বললেন, ঠিক এটা না। গ্রহণ করার মানসিকতাটাই হারিয়ে গেছে)। আসলে দোষটা আমাদেরই, আমরাই পিছিয়ে গেছি জেনারেশন থেকে। নিজেকে সেভাবে পৌঁছাতে পারিনি। কয়েকদিন আগে একটা কনসার্টে গান করলাম। সেখানে ‘গাজা’ নিয়ে একটা গান গাইলাম। কই, ইয়ংরা তো ভালোভাবেই নিয়েছে। আসলে ওরা শুনতে চায়। আমরা যদি শোনাতে পারি, তাহলে নব্বই দশকের সেই অবস্থা আবার ফিরে আসবে। মানুষ কিন্তু সেই সময়ের গান শুনতে চায়।

নাজমুস সাকিব রহমান : আশির দশক এবং এখন গানের প্রস্তুতিতে কোনো পরিবর্তন এসেছে?

মাকসুদুল হক : এটা খুব স্বাভাবিক না? তখন তো একটা গান গাওয়ার আগে অনেক ধরনের প্রস্তুতি নিতে হতো। সেই সময় আমি যুবক বয়সী। শারীরিক এবং মানসিক প্রস্তুতি নিতে হতো। একটু জগিং করে, শরীরে ঘাম ঝরিয়ে স্টেজে উঠতাম। এখন তো আর সেই সময় নেই। এখন অটোমেটিক সব চলে আসে। এনার্জি, ভয়েস সব চলে আসে। আগের মতো কোনো পরিশ্রম করতে হয় না। বিকজ আই অ্যাম প্রফেশনাল নাও। সো.. ভয়েস কেমন হবে, ডেলিভারি কেমন হবে সেটা নিয়ে কোনো চিন্তা করতে হয় না।

সালাহ উদ্দিন শুভ্র : ‘ফিডব্যাক’-এর শুরুটা বলবেন?

মাকসুদুল হক : আগেই পরিচয় ছিল, ‘ফিডব্যাক’-এর সঙ্গে। সেখানে অনেক বন্ধুবান্ধব ছিল। ‘ফিডব্যাক’-এর  মুরাদ, পাপ্পু আমার বন্ধু। হঠাৎ করে একদিন মুরাদ এসে হাজির। তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ও বলল, সামনে আমাদের একটা কনসার্ট। এখানে যারা গান করবে, তাতে হবে না। আরও লাগবে। তুমি যদি ৮-১০টা গান করো? তাহলে আমরা অনুষ্ঠানটা ভালোমতো করতে পারি। আমি বললাম, আচ্ছা। মনে মনে কিন্তু ভালোই লাগছিল। একটা ভালো ব্যান্ডের সঙ্গে গাইব। তো, এভাবেই। শুরুটা কিন্তু ভালোই ছিল। এর সপ্তাহখানেক পরে আমাকে বলল, প্র্যাকটিসে আসো। আমি বললাম, কীসের প্র্যাকটিস? বলল, তুমি আগে আসো। ভালো লাগবে। তো গেলাম ওদের প্র্যাকটিসে। সেভাবেই আমার ফিডব্যাকের শুরু। তখন সপ্তাহে ৩-৪ দিন কাজ করতাম।

ইমরোজ বিন মশিউর : আপনি তো ফিডব্যাকের সঙ্গে দীর্ঘদিন? কখনো বলা হয়নি, এমন গল্প শুনতে চাই?

মাকসুদুল হক : ’৭৮-৯৬, কত বছর হয়? অনেক গল্প আছে। ’৯০ দশকের ১৬ ডিসেম্বর। আমরা যখন বামবার কনসার্ট করলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে,  তখন একটু গোলযোগ হয়। একজন ছাত্রনেতাকে বললাম, কী হচ্ছে? তিনি আমাকে বললেন মাকসুদ ভাই, একটু আসেন। তার সঙ্গে হেঁটে একটা মাইক্রোবাসের সামনে দাঁড়ালাম। সে গাড়ির দরজা খুলল। দেখলাম, অস্ত্র আর অস্ত্র। তিনি বললেন এইগুলা রেডি আছে। আপনি চিন্তা কইরেন না। শুধু পারমিশন দেন মাত্র ১টা ফায়ার করব। সব গ-গোল ঠা-া হয়ে যাবে। আমি বলেছিলাম কোনো ভায়োলেন্স চাই না। তবে তোমাদের ইচ্ছা। সে একটা ফায়ারই করল। এরপর সব ঠা-া হয়ে যায়। আমরা গান করলাম।

আবার একদিনের ঘটনা। একটা হোটেলে শো। তখন স্টাইল ছিল, টাইট প্যান্ট আর ঢোলা শার্ট। গান শুরু হলো। সবাই নাচানাচি করছে। গানের একটা পার্টে, নিচ থেকে যন্ত্র নিয়ে আমাকে বাজাতে হবে। একপর্যায়ে আমি যখন উপুর হয়ে যন্ত্রটা নেব, তখন প্যান্টটা ছিঁড়ে গেল। (এই কথা শুনে মাকসুদুল হকসহ আড্ডাবাজরা হো হো করে হেসে উঠলেন।) তখন আমি আস্তে আস্তে বাবুকে বললাম বাবু, আমার পেছনে দেখো ও সেটা দেখে বলল, তাড়াতাড়ি শার্ট বের করো। ঢাকো ঢাকো। হাহাহাহাহাহহাহা। এটা অনেক মজার ছিল। এ রকম অনেক অদ্ভুত মজার মজার অভিজ্ঞতা আছে। বলে শেষ করা যাবে না।

তাপস রায়হান : সে সময় ব্যান্ড মিউজিকে যে গীতিকার, সুরকার, কম্পোজার ছিলেন বর্তমানে এর একটা ছন্দপতন হয়েছে। আপনার কী মনে হয়?

মাকসুদুল হক : ব্যান্ডসংগীতের কিন্তু ব্যাপক প্রসার হয়েছে। তবে সেই সময়ের সঙ্গে বর্তমানের একটা পার্থক্য আছে। সমস্যাটা গীতিকার-সুরকারের না। আমাদের শোনার অভ্যাসটা নষ্ট হয়ে গেছে। তখন অডিও ক্যাসেটের দোকানে দোকানে এসব গান চলত। এখন সেই পরিবেশ নেই। তখন ছিল, ক্যাসেটের যুগ। ক্যাসেটের ওপরের ছবিটাই, মানুষকে আকৃষ্ট করত। তখন অনেকেই ক্যাসেট গিফট করত। তখন ব্যান্ড ছিল কম।  হৃদ্যতা ছিল সবার মধ্যে। এখন কে, কোথায় ব্যান্ড করছে আমরা তেমন চিনি না। তাই বলে যে ওরা খারাপ তা না। এখন সবাই গান শোনে হেডফোনে। কে যে কী শুনছে তা তো জানি না।  গানটা তো মানুষকে শোনাতে হবে? আসলে গান শোনার ধারাটাই পরিবর্তন হয়ে গেছে। গীতিকার, সুরকার তো ব্যান্ড দলের মধ্যেই থাকে। তখন ভালো গীতিকারদের আমরা অনুরোধ করতাম, ভালো গান লিখে দেওয়ার জন্য। এখন সেই কালচারটা নেই।

সালাহ উদ্দিন শুভ্র : ফিডব্যাক সবসময়ই একটু আলাদা ছিল। গায়কি, গানের লিরিক সবকিছুই ছিল অন্যরকম। কিন্তু মফস্বলের চেয়ে ঢাকায় এর জনপ্রিয়তা বেশি ছিল। নাগরিক সমাজে এর গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি ছিল। কারণ কী?

মাকসুদুল হক : আসলে আমাদের সবকিছুই ছিল নাগরিককেন্দ্রিক। শুধু ‘মেলায় যাইরে’ গানটা ছিল সব ধরনের শ্রোতার জন্য। এই ধরনের গান কিন্তু হঠাৎ হয়।

তাপস রায়হান : ‘মেলায় যাইরে’ গানটার  গীতিকার কে ছিলেন?

মাকসুদুল হক : হাহাহাহাহা। এই গানের গীতিকার, সুরকার, কণ্ঠশিল্পী সবকিছুই আমি।

ইমরোজ বিন মশিউর : এ ধরনের গান কি আবার হবে?

মাকসুদুল হক : না, আর পারব না। হবে না। তবে নতুন কিছু গান লেখার চেষ্টা করছি। দেখা যাক, কী হয়?

(এমন সময় অফিস সহকারী এলেন, স্যান্ডউইচ নিয়ে। মাকসুদুল হক হেসে বললেন, এখন কি ব্রেক? লিটু হাসান হেসে বললেন, একটু। মাকসুদুল হক অফিস সহকারীর উদ্দেশে বললেন আমাকে আরেকটু কফি দেন। আগেরটা শেষ। তিনি খাচ্ছেন আর কথা বলছেন। এমন সময় বললেন দুপুরের খাবারের কথা মনে নেই। তাপস রায়হান তার স্যান্ডউইচ মাকসুদুল হককে দিলেন। বললেন, আমার ক্ষুধা নেই। আপনি খান। তিনি ধন্যবাদ জানালেন। এক মনে খাচ্ছেন, মাথা নিচু করে। নাজমুস সাকিব রহমান এমন সময় টিস্যুর প্যাকেট নিয়ে এলেন। টিস্যু দিয়ে ঠোঁট মুছলেন তিনি। সালাহ উদ্দিন শুভ্র বললেন)

সালাহ উদ্দিন শুভ্র : পরবর্তী সময়ে বাউল গানের দিকে বেশ খানিকটা ঝুঁকে পড়েছিলেন। বাউল গানের সঙ্গে আপনার ভালোবাসা কি আগে থেকেই ছিল?

মাকসুদুল হক : আমি কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়াতে প্রায়ই যাই। যে কারণে অনেক বাউলের সঙ্গে পরিচয়। মাঝে মধ্যে আমার কাছে ওরা আসত। এভাবেই ...

ইমরোজ বিন মশিউর : ‘মাকসুদ ও ঢাকা’ এটা তৈরির কারণ কী?

মাকসুদুল হক : আমি আসলে ‘মাকসুদ’ নামে পরিচিত হতে চাই না। আমার পরিচয় ব্যান্ডের মাধ্যমে। কোনোভাবেই শেখ ইশতিয়াক, তপন চৌধুরী বা কুমার বিশ্বজিতের মতো সলো সিঙ্গার হিসেবে নিজেকে চিন্তা করি না। যা হয়েছে, সব ব্যান্ড নিয়ে।

সালাহ উদ্দিন শুভ্র : ফিডব্যাকের সঙ্গে কী হয়েছিল? এটা কি বলা যায়?

মাকসুদুল হক : আসলে ওদের কোনো দোষ নেই। দোষটা আমারই। এডজাস্ট করতে পারিনি। অন্য কিছু না। এই তো...

ইমরোজ বিন মশিউর : আপনার ‘নিষিদ্ধ’ তো ছিল ভয়ংকর? আমাদের ব্যান্ড ইতিহাসে এ রকম আর হবে কিনা, জানি না? 

মাকসুদুল হক : তা জানি না। আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ। আমি চেষ্টা করেছি, আমার মতো। যত ক্ষোভ সব ঝেড়েছি। নিরপেক্ষতার পক্ষ নিয়ে আমি কথা বলেছি।

সালাহ উদ্দিন শুভ্র : আপনি তো গানের মধ্যেই ‘রাজনীতি’ করার চেষ্টা করেছেন?

মাকসুদুল হক : অনেকটা। আমি গানের মানুষ। যা বলার গানের মাধ্যমেই বলব।

তাপস রায়হান : আপনার ছোটবেলার কথা শোনা হলো না?

মাকসুদুল হক : আমার জন্ম ১৯৫৭ সালের, ১৬ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জে। বাবা-মা এসেছিলেন ভারতের আসাম থেকে। সম্পর্কে ছিলেন, আপন খালাতো ভাইবোন। আমরা ২ ভাইবোন। পড়াশোনা শুরু নারায়ণগঞ্জেই। এরপর শাহীন, আদমজী হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি।

তাপস রায়হান :  সবশেষ প্রশ্ন। গানের কথা না সুর কোনটা জরুরি?

মাকসুদুল হক : আসলে দুটোই জরুরি। কথাটা যদি হয় মাঝি, তাহলে সুরটা হচ্ছে নৌকা। তবে সুরটা কিন্তু ভীষণ জরুরি। আপনি যত ভালোই লেখেন, সুর ভালো না হলে সেই গান টানবে না। চূড়ান্ত বিচারে দুটো বিষয়ই পরিপূরক। মোদ্দা কথা হচ্ছে, কথা-সুর-গায়কি ভালো হতে হয়। তাহলেই একটি গান মানুষের মনে গেঁথে থাকে।

সময় গড়ায়। আড্ডা ছেড়ে ওঠেন সবাই। সালাহ উদ্দিন শুভ্র শিল্পীর শরীর থেকে খুলে দেন মাইক্রোফোন। কথা বলতে বলতে সবাই পা বাড়ান স্টুডিওর বাইরে। তখন অনেক রাত।

গ্রন্থনা : অনিন্দিতা আচার্য

ছবি : আবুল কালাম আজাদ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত