মেটাভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ (এমটিএফই) গ্রুপে বিনিয়োগ করে দেশের অসংখ্য বিনিয়োগকারী সর্বস্বান্ত হয়েছেন। এ বিষয়ক তদন্তের কিনারা না হতেই সামনে এসেছে অনপেসিভ নামের আরেকটি মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কোম্পানি। নানা দেশে বিস্তৃত কোম্পানিটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ১৪ লাখের বেশি বিনিয়োগকারী। তাদের কাছ থেকে বিনিয়োগের নামে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা নিয়েছে কোম্পানিটি। তবে অনপেসিভে বিনিয়োগকারীদের কেউ মুনাফা অর্জন করতে পারেনি।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, এমএলএম পদ্ধতিতে দ্রুত আয়ের কৌশলের কথা বলে ছড়িয়ে পড়েছে অনপেসিভ। তাদের ফাঁদে পা দিয়েছে দেশের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। বাংলাদেশ থেকে যুক্ত হয়েছে কয়েক হাজার ব্যক্তি। বিনিয়োগকারীদের মোট সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ ২০ হাজার। জনপ্রতি ৯৭ ডলার বিনিয়োগ হিসেবে নেওয়া হয়েছে তাদের কাছ থেকে। বিনিয়োগকৃত মোট ডলারের পরিমাণ প্রায় ১৩ কোটি ৭৭ লাখ ৪০ হাজার। বাংলাদেশি টাকায় ১ হাজার ৫১৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকার বেশি।
অনপেসিভের বিষয়টি বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) নজরে আসামাত্র সতর্কতা জারি করা হয়েছে। তারা বলছে, সম্প্রতি অনপেসিভ নামের একটি এমএলএম প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে কার্যক্রম চালাচ্ছে। বিষয়টি বিএফআইইউয়ের নজরে এসেছে। অনপেসিভে বিনিয়োগ করে বাংলাদেশের প্রচুর লোক প্রতারিত হয়েছেন। এ কার্যক্রম মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ অনুযায়ী অপরাধ। অনপেসিভে বিনিয়োগ, লেনদেন, লেনদেনে সহায়তা ও প্রচার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ইতিমধ্যে অনপেসিভ নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে। সংস্থাটির একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তারা বলেছেন, বিএফআইইউয়ের নজরে এসেছে অনপেসিভের অস্বাভাবিক লেনদেন। লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত সিআইডিতে পাঠিয়েছে তারা। তাদের ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট অর্থ পাচার আইনে এসব তথ্যের অনুসন্ধান শুরু করেছে। তবে এ কাজে তাদের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। ভুক্তভোগীদের কেউ আইনি সহায়তা চেয়ে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি।
ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আব্দুল আলিম। স্বল্প আয়ের চাকরিজীবী হওয়ায় প্রভাবিত হয়ে এ প্রতিষ্ঠানে টাকা দেন তিনি। দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে আব্দুল আলিম বলেন, ‘তিন বছর আগে ৯৭ ডলার সমপরিমাণ টাকা বিনিয়োগ করেছি। তারা একটা সময়ে হাজার হাজার ডলার লভ্যাংশ দেবে বলেছিল। অনপেসিভের পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্থানে সভা-সেমিনার করে তাদের কৌশল উপস্থাপন করত। তবে এখনো ১ টাকাও পাইনি, উল্টো বিনিয়োগের টাকা ফেরত পাব কি না বলতে পারছি না। টাকা ফেরত চাইলে কিছুদিন ধরে তারা আরেক বিনিয়োগের প্রস্তাব করছে। বলছে, আবার ১৭ হাজার ডলার সমপরিমাণ টাকা বিনিয়োগ করতে হবে। আমার পরিচিত অনেকেই এ প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছে। কেউ লভ্যাংশ পায়নি।’
ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে প্রায় চার বছর ধরে সক্রিয়। ২০১৮ সাল থেকে তারা নিজেদের সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে। তারা কোনো সফটওয়্যার চালু করতে না পারলেও বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে যাচ্ছে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, অনপেসিভ দুবাইভিত্তিক একটি প্রযুক্তি কোম্পানি যারা সফটওয়্যার তৈরি করে। দুবাইয়ের বুর্জ খলিফাতে সদর দপ্তর এবং যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, সিঙ্গাপুর, বাংলাদেশ ও মিসরে অফিস চালায়। এটির মূল উদ্যোক্তা আশরাফ মুফারেহ। প্রতারণামূলক কার্যক্রমের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন তার ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে।
গত বছরের আগস্টে করা মামলার বিষয়ে ইউএস সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন বলছে, অনপেসিভ প্রতারণামূলকভাবে বিনিয়োগকারীদের অনিবন্ধিত সিকিউরিটিজ অফার করে এবং একটি অবৈধ পিরামিড স্কিম পরিচালনা করে। ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত অনপেসিভে এমএলএম পদ্ধতিতে ৯৭ মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করে এর ফাউন্ডার পদবি পাওয়া যায়। ৯৭ মার্কিন ডলার সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীর অনপেসিভ ওয়ালেটে রক্ষিত থাকে বলে জানানো হয়। অনপেসিভ কোনো পণ্য বাজারে ছাড়লে এটির সাবস্ক্রিপশন ফি থেকে প্রাপ্ত আয়ের একটি অংশ ফাউন্ডাররা পাবেন বলে জানানো হয়েছে। তাদের তথ্য মতে, অন্যান্য এমএলএম ব্যবসার মতো এখানে রেফারেল কমিশন পদ্ধতির প্রচলন রয়েছে।
অনপেসিভ নিয়ে সতর্ক করেছে বাংলাদেশের বেসরকারি একাধিক ব্যাংক। ডাচ্-বাংলা ব্যাংক লিখেছে, ‘এর আগে বাংলাদেশে বিভিন্ন পঞ্জি স্কিম বা মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) প্রতিষ্ঠান প্রতারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছে, এর নজিরও রয়েছে। সম্প্রতি অনপেসিভ নামের অনুরূপ একটি প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি নজরে এসেছে। এতে ইতিমধ্যে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক বিনিয়োগকারী বিনিয়োগ করে প্রতারিত হয়েছেন। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ অনুযায়ী এটি অপরাধ। অনপেসিভ বা এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের পঞ্জি স্কিমে বিনিয়োগ, লেনদেন, লেনদেনে সহায়তা ও প্রচার থেকে বিরত থাকার জন্য সবাইকে অনুরোধ করা হচ্ছে।’
