আল জাজিরার প্রতিবেদন

বাংলাদেশের নির্বাচনের উত্তাল ইতিহাস

  • ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর থেকে দেশে হাতেগোনা কয়েকটি নির্বাচনই 'অবাধ ও সুষ্ঠু' বলে বিবেচিত হয়েছে বলছে আল জাজিরা

আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০২৪, ০১:১৯ পিএম

আগামীকাল (৭ জানুয়ারি) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। রাত পার হলেই একটি নতুন সরকার নির্বাচনে ভোট গ্রহণ শুরু করবে বাংলাদেশ।

কিন্তু এই নির্বাচন এবং ভোট গ্রহণ ইতিমধ্যেই বিতর্কের সম্মুখীন হচ্ছে। সময় ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে দেশজুড়ে বিভিন্ন স্থানে শুরু হয়েছে সহিংসতা।

বাংলাদেশের নির্বাচন ও এর ইতিহাস নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছে কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরা। সেই প্রতিবেদন তুলে দেওয়া হল এখানে।

মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভের মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর ১৯৭১ সাল থেকে বাংলাদেশে ১১টি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। যার মধ্যে মাত্র চারটি নির্বাচন ‘অবাধ ও সুষ্ঠু’ বলে বিবেচিত হয়েছে বলছে আল জাজিরা। বাকি সব নির্বাচনই সহিংসতা, বিক্ষোভ এবং ভোট কারচুপির অভিযোগে নিমজ্জিত।

চলতি বছর প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ ন্যাশনাল পার্টি (বিএনপি) নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক অস্বীকারের পর নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি।

আল জাজিরা বলছে অতীতেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বেশিরভাগই বিরোধী দল জয়লাভ করেছে যার কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপর আস্থা বিরোধীদের।

ইতিমধ্যেই ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়ে গেছে যে, এবারের নির্বাচনেও টানা চতুর্থ এবং পঞ্চম মেয়াদে জয়লাভ করতে পারে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে এই নির্বাচনেও কারচুপি করার আশঙ্কা আবার দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছে আল জাজিরা।

বাংলাদেশের বিতর্কিত নির্বাচনের ইতিহাস তুলে ধরেছে কাতারভিত্তিক গণমাধ্যমটি। যা তুলে দেওয়া হল এখানে।

১৯৭৩- স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচন এবং আওয়ামী লীগের জয়লাভ

১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ মুক্ত হওয়ার পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ দেশে প্রথমবারের মতো নির্বাচনের আয়োজন করে।

সেই নির্বাচনে সংসদে ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসনে জয়লাভ। সেই নির্বাচনের পর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলসহ বেশি কিছু দল দেশের রাজনীতি থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হয় যারা একটি করে সংসদীয় আসন জিতেছিল।

আল জাজিরা বলছে দেশের প্রথম নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে থাকলেও বিরোধী দলের নেতাদের অপহরণসহ কিছু কিছু কারণে এই নির্বাচনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে আল জাজিরা।

১৯৭৯ - ১৯৮০- একদলীয়, সামরিক শাসন

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর পরবর্তী দেড় দশকের জন্য ক্ষমতা হাতে নেয় বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী। ১৯৭৮ থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে সাবেক সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে জিয়াউর রহমানের সদ্য প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। কিন্তু সেই ভোটেও কারচুপির অভিযোগ তোলে তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ।

১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের হত্যার পর তার সহকারী আবদুস সাত্তারের অধীনে ১৫ নভেম্বর সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই ভোটেও ৬৫ শতাংশ ভোট পেয়ে পুনরায় বিজয় লাভ করে বিএনপি।

তবে ১৯৮২ সালের ৭ মে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশের ক্ষমতা গ্রহণ করেন সাবেক সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এবং ১৯৮৬ সালের ১৫ অক্টোবর সংসদীয় নির্বাচনে বিরোধীদের বয়কটের মাধ্যমে জয়লাভ করে তার দল জাতীয় পার্টি। সেই নির্বাচনে ব্যাপকভাবে জালিয়াতি হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে বলছে আল জাজিরা।

১৯৮৮ সালে, এরশাদকে হঠাতে তীব্র প্রতিবাদের মধ্যে আরেকটি ভোট অনুষ্ঠিত হয়। তখন শেখ হাসিনার (মুজিবুর রহমানের কন্যা) নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ এবং খালেদা জিয়ার (জিয়াউর রহমানের বিধবা স্ত্রী) নেতৃত্বে বিএনপি একত্রিত হয়ে বিক্ষোভের নেতৃত্ব দেয়। যার ফলে ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান এরশাদকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে।

১৯৯১- অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার

সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১ সালের নির্বাচনে সব প্রধান দল অংশ নেয়। এই নির্বাচনকে নিরপেক্ষ হিসাবে দেখা হয়েছিল এবং নির্বাচনে বিজয়লাভ করেছিল বিএনপি। তখন বিএনপি ১৪০টি আসনে জয়লাভ করেছিল এবং আওয়ামী লীগ ৮৮টি আসন পেয়েছিল।

১৯৯৬- বিএনপির ১২দিনের ক্ষমতা এবং শেখ হাসিনার জয়

আল জাজিরার মতে আরেকটি বিতর্কিত নির্বাচনের বছর ছিল সেটি। ১৯৯৪ সালে সংসদীয় উপ-নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগ ও ক্ষমতাসীন বিএনপির মধ্যে উত্তেজনা চরমে ওঠে। বিরোধীরা দাবি করে যে ভোটে কারচুপি হয়েছে এবং জিয়ার পদত্যাগ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে তার হস্তান্তরের জন্য চাপ দিতে শুরু করে।

যার ফলে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচন বর্জন করে বিরোধী দলগুলো এবং মাত্র ২১ শতাংশ ভোটার কেন্দ্রে উপস্থিত হয়েছিল। তারপরও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনে জয়লাভ করে বিএনপি।

কিন্তু বিরোধী সংসদ সদস্যদের ধর্মঘটের কারণে মাত্র ১২দিন স্থায়ী হয় বিএনপির সরকার। ওই বছরের ১২ জুনেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচন হয়, যা নিরপেক্ষ হিসাবে বিবেচিত হয়েছিল। আওয়ামী লীগের সাথে প্রথম বার জয়ী হন বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা। দলটি তখন ১৪৬ টি সংসদীয় আসন লাভ করে।

২০০১ সালের নির্বাচন- পুনরায় ক্ষমতায় বিএনপি

দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মত পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ করে আওয়ামী লীগ এবং যথাসময়ে আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নাটকীয়তা ছাড়াই ২০০১ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল সপ্তম সংসদ নির্বাচন।

৫৪টি দলের সদস্য এবং ৪৮৪ জন স্বতন্ত্রসহ প্রায় ১.৯৩৫ জন প্রার্থী ৩০০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, যার মধ্যে আরও ৩০টি আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত করা হয়।

২০০১ সালের ৭৫ শতাংশ ভোটারদের উপস্থিতি এবং জাতীয় ভোটের প্রায় ৪০ শতাংশ নিয়ে বিএনপি ১৯৩টি আসনে জয়লাভ করে। এরপর বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া সরকার গঠন করেন।

২০০৬-২০০৮ রাজনৈতিক সংকট

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন সে বিষয়ে বিএনপি এবং তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ একমত হতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০০৬ সালের নির্বাচন পিছিয়ে যায়।  

অক্টোবরের শেষে, দেশটির তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ নিজেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ঘোষণা করে ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে নির্বাচনের ঘোষণা দেন।

সেই বছর প্রার্থীদের তালিকায় জাল নাম অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে একটি তিক্ত দ্বন্দ্ব দেশে দাঙ্গা ও সহিংসতার দিকে পরিচালিত করে। হাজার হাজার বিক্ষোভকারী দেশের পরিবহন ব্যবস্থা অবরোধ করে এবং বাংলাদেশে ২০০৮ সাল পর্যন্ত স্থায়ী একটি রাজনৈতিক সংকটে নেমে আসে।

ইয়াজউদ্দিন আহমেদ জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার কারণে সামরিক বাহিনী পদক্ষেপ নেয় এবং আওয়ামী লীগ প্রতিবাদ জানিয়ে নির্বাচন থেকে সরে আসে।

২০০৮ নির্বাচন– সর্বকালের সর্বোচ্চ ভোটার

অবশেষে ২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে ৮০ শতাংশ ভোট গ্রহণ হয়েছিল যা দেশের সর্বকালের সর্বোচ্চ।

সেই বছরই শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ অন্যান্য বিরোধী দলগুলোর সাথে একটি মহাজোট গঠন করে এবং ৪৮ শতাংশ ভোট পেয়ে আওয়ামী জোট ২৩০টি আসন নিয়ে ব্যাপক জয় লাভ করে।

সামরিক শাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে।

২০১৪ সালের নির্বাচন

২০০৬ - ২০০৮ সালের রাজনৈতিক সংকটের পর, আওয়ামী লীগ ২০১১ সালে নির্বাচন তত্ত্বাবধানের জন্য একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজনীয়তা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেন। তখন প্রধান বিরোধী দল বিএনপি সংসদ বর্জন করলে তত্ত্বাবধায়ক বিধান অপসারণের সংশোধনী নিয়ে সংসদে ভোটে ২৯১ ভোট পাস হয়।

এরপরই বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়ন চালানো হয় বলছে আল জাজিরা। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের আগে বিএনপি নেতা জিয়াকে গৃহবন্দী করা হয় এবং বিরোধী দলের অন্যান্য সদস্যদের প্রতি সহিংসতার ব্যাপক অভিযোগ পাওয়া যায়।

সে সময় বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলি ভোট বর্জন করে এবং হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ করে।

২০১৮ সালের নির্বাচন

২০১৮ সালে বাংলাদেশে প্রথমবার ইলেকট্রনিক ভোটিং চালু হয়। কিন্তু বিএনপি এবং অন্যান্য বিরোধী দলগুলি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে ২০১৮ এর ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে কারচুপির জন্য অভিযুক্ত করে।

সে বছর আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টির সাথে একীভূত হয়ে মহাজোট গঠনের পর, আরেকটি জয়লাভ করে।

সে সময় বিরোধী দল বিএনপির সদস্য ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, নির্বাচনের দিন পর্যন্ত মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করার মত খবর পাওয়া গিয়েছিল।

২০২৪ - বিএনপির আবারও বর্জন

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি শেখ হাসিনার ক্ষমতাসীন দল উপেক্ষা করায় বিএনপি আবারও রোববারের নির্বাচন বয়কট করছে। দলটি ব্যাপক ধর্মঘট এবং বিক্ষোভ করলেও কোন লাভ হয়নি।

আল জাজিরা বলছে যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্ভবত তার পঞ্চম মেয়াদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা জিততে পারেন এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ মেয়াদী প্রশাসনের তকমা পেতে যাচ্ছেন। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত