আজকের নির্বাচনের দিকে সবার মনোযোগ থাকবে। কারণ, গত দুই নির্বাচন নিয়ে দুটো বড় সমালোচনা ছিল। একটা হলো ব্যালট বক্সের স্টকিং করা আগের রাতে, অন্যটি হলো অনেকে ভোট দিতে গিয়ে দেখেছেন তাদের ভোট দেওয়া হয়ে গিয়েছে। সব জায়গায় এমন হয়েছে তেমন অভিযোগ না পেলেও, বিভিন্ন স্থানে এমন হয়েছে বলে বড় একটা সমালোচনা তৈরি হয়ে আছে। এই দুই চ্যালেঞ্জকে যদি জিরোতে নিয়ে আসা সম্ভব হয়, তাহলে আমার মনে হয় বড় ধরনের গ্রহণযোগ্যতা পাবে এই নির্বাচন। তবে আমার মনে হয় একটা সমস্যার সমাধানে ইতিমধ্যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সেটা হলো ব্যালট বাক্স আর আগের মতো আগের রাতে বা কয়েকদিন আগে যাচ্ছে না। যেদিন নির্বাচন, সেদিন সকালেই যাচ্ছে। তথ্য অনুযায়ী, ৯৩ শতাংশ ক্ষেত্রে এমনটাই হচ্ছে। রিমোট বা প্রান্তিক কিছু এলাকা হওয়াতে সাত শতাংশ ক্ষেত্রে এটা সম্ভব হয়নি সেটা তো হতেই পারে। কিন্তু ব্যালট বাক্স সকালে পৌঁছানোটা একটা বড় পরিবর্তন। ফলে যে সমালোচনা ছিল আগে যাওয়া বাক্সে স্টাফিং বা ভোট দিয়ে দেওয়ার ঘটনা সেটা এবার থাকার কথা না। এটা ছাড়াও, বর্তমানে মিডিয়া ও আন্তর্জাতিক মহলের মনোযোগ, তার ওপর রয়েছে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি সব মিলিয়ে আগে থেকে ভোট দিয়ে ব্যালট বাক্স ভরে ফেলা এবার সম্ভব হবে না। এখন দ্বিতীয় যে সমালোচনা অনেকে ভোট দিতে গিয়ে দেখেছেন তাদের ভোট অন্য কেউ দিয়ে দিয়েছে আগেই; এটার সমাধান করা। এটার সমাধানের ক্ষেত্রে আরও দুটো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা লাগবে। প্রথমত, যেহেতু বিএনপির মতো বড় একটি দল এবং তাদের সমমনা কয়েকটি দল নির্বাচনে আসছে না, ফলে ওপর থেকে নির্দেশ না এলেও তাদের মাঠপর্যায়ের যারা কর্মী তারা চাইবেন এই নির্বাচনকে বিতর্কিত করতে। এই জায়গাটায় মনোযোগ বাড়ানো দরকার। আরেকটা হলো, আমাদের দেশের নির্বাচনের যে ঐতিহ্য বা ইতিহাস আমরা দেখে আসছি, সেখানে যে হেরে যায় সে নির্বাচনটাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করে থাকে। এদিকেও খেয়াল রাখা দরকার। যেহেতু শোনা যাচ্ছে যে, এবার বেশ কিছু মন্ত্রীও নির্বাচনে হেরে যেতে পারেন বা তেমন সম্ভাবনা আছে। যদি সেটা হয়, তাহলে ওপর থেকে নির্দেশ না এলেও হেরে যাওয়া হেভিওয়েট প্রার্থীর যে সমর্থকরা আছেন তারা যে আচরণটা করবেন বা তাদের প্রতিক্রিয়ার দিকে নজর রাখা দরকার। কারণ, তারাও ভালো করে জানেন যে বা হয়তো তাদের মাথার মধ্যে এটাই যে আমার নেতা বা নেত্রী যদি না জেতেন তাহলে তো আমি যে সুযোগ-সুবিধা এতদিন পেয়ে এসেছি বা আমার যে ক্ষমতা ছিল সেটা তো পাব না বা থাকবে না। এ কারণে সমর্থকরা মরিয়া হয়ে উঠতে পারেন। নির্বাচনটা বিতর্কিত হয়ে পড়ল কি না বা বাংলাদেশের ইমেজের কী হলো তিনি আর ওসব নাও দেখতে পারেন।
উপরোক্ত বিষয়গুলোর দিকে যদি সজাগ দৃষ্টি থাকে এবং নিরাপত্তা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের যদি জোরদার নজরদারি থাকে, তাহলে আমার মনে হয় আগের দুই নির্বাচনে যে সমালোচনাটা ছিল সেটা বড় আকারে এবার কাটিয়ে ওঠা যাবে, ফলে এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাও বাড়বে। আন্তর্জাতিক মহলও এই জিনিসটাই দেখতে চাচ্ছে যে দেশের জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিতে পারছে কি না এবং যার ভোট সে দিচ্ছে কি না। তারা পার্সেন্টেজ নিয়ে মানে কী পরিমাণ ভোট পড়ল, সেটা তাদের বিচার বা বিবেচনাধীন না। বিশেষ করে ওয়েস্ট মিনস্টার সিস্টেমে পাঁচ শতাংশ ভোট পড়লেও সেটা স্বীকৃত, এর কোনো মানদন্ড নেই যে এত শতাংশ ভোট পড়তে হবে। সেদিক থেকে যদি আমরা দেখি, উল্লিখিত চ্যালেঞ্জগুলোর যদি মোকাবিলা করা সম্ভব হয়, তাহলে আমি মনে করি যে এই নির্বাচন বড় রকমের গ্রহণযোগ্যতাই পাবে। আমার ধারণা নির্বাচন হয়ে গেলে খুব দ্রুতই, হয়তো ৮ তারিখ সকাল থেকেই প্রধানমন্ত্রী বা দলকে অভিনন্দন জানানো শুরু হয়ে যেতে দেখব। কারণ অনেক দেশই অপেক্ষা করছে যে বাংলাদেশের নির্বাচনটা হয়ে গেলেই বড় আকারে তারা অর্থনৈতিক পার্টনারশিপ তৈরি করবে বলে। নির্বাচন হয়ে গেলেই তারা দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাবে। সেজন্য আমি মনে করি আন্তর্জাতিক মহলও ওই নির্বাচনের পদ্ধতি বা অন্য কিছুকে গুরুত্ব না দিয়ে দেখবে যে, নির্বাচনে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততা আছে কি না। আমাদেরও মনে হয় সেখানেই নজর দেওয়া দরকার। যেহেতু বললাম যে নির্বাচনটা বিতর্কিত করার জন্য অনেকেই চেষ্টা করবে। আরও একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে, আমরা আছি ফেইক নিউজ বা ভুয়া খবরের সময়ে। অনেকে এটাও ব্যবহার করবে, তাই এদিকেও আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।
লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাবি