দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবির পর থেকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের এবং মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুর বিরুদ্ধে ক্ষোভ থামছে না নেতা-কর্মীদের। নির্বাচনে ভরাডুবি, দলীয় ও নির্বাচনি ফান্ড কুক্ষিগত করে রাখা, শেরিফা কাদেরের আসনের বিনিময়ে সিনিয়র নেতাদের বাদ দেওয়া, বারবার ফোন না ধরা, নির্বাচনে অসহযোগিতার অভিযোগ এনে নির্বাচনে অংশ নেওয়া নেতারা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ তুলেছেন শীর্ষ দুই নেতার বিরুদ্ধে।
রোববার (১৪ জানুয়ারি) রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে জাতীয় পার্টির পরাজিত প্রার্থীদের এক মতবিনিময় সভায় তারা এ দাবি করেন।
সভার মূল আয়োজক ছিলেন জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান সৈয়দ আবুল হোসেন বাবলা, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য লিয়াকত হোসেন খোকা, শফিকুল ইসলাম সেন্টু, সাইফুদ্দিন মিলন, সাবেক এমপি ইয়াহয়া চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম পাঠানসহ বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা। এতে সারা দেশ থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া ৮০-৯০ জন প্রার্থী ও প্রায় ৫ শতাধিক নেতাকর্মী অংশ নেন।
সভায় দলের সিনিয়র নেতাদের বাদ দিয়ে ঢাকা-১৮ আসনে জিএম কাদেরের স্ত্রী শেরিফা কাদেরের মনোনয়ন নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। কেবল স্ত্রীকে সীট দিতে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অভিযোগ করেন। মনোনয়ন বিক্রি করে যে টাকা তোলা হয়েছিল তাও আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়।
বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রার্থীরা তাদের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। তারা বলেন, সংসার, দোকান পাট বিক্রি করে নির্বাচন করেছি, নিঃস্ব হয়ে গেছি। বলতে কান্না আসছে, কি বলবো, নৌকা, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের হামলার মুখে নির্বাচনি মাঠে ছিলাম। কথা দিয়েও আমাদের একটা টাকা দিলেন না চেয়ারম্যান মহাসচিব এমনকি ফোনও ধরেননি।
এর আগে গত শুক্রবার প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে চেয়ারম্যান ও মহাসচিবের অনুমতি ছাড়া ঢাকায় জাপার কোনো নেতাকর্মীকে সভা সমাবেশে অংশ নিতে নিষেধ করা হয়। কিন্ত নিষেধ উপেক্ষা করেই এতে কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলের নেতাকর্মী অংশ নেন।
সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে জি এম কাদেরের বিরুদ্ধে স্ত্রীর জন্য ৯টি আসন কোরবানি দেওয়ার অভিযোগ তোলেন সিলেট-২ আসনের সংসদ সদস্য ইয়াহ্ইয়া চৌধুরী। তিনি বলেন, চেয়ারম্যান কেবল তার স্ত্রী শেরিফা কাদেরের সীট আদায় করতে গিয়ে ফিরোজ, বাবলা, খোকা, পীর ফজলু, আতিক, ভাসানিসহ নয়টি সিট কোরবানি দিয়েছেন।
তিনি প্রশ্ন করেন, আপনার স্ত্রী শুধু আপনাকে রান্না করে ভাত খাওয়ান, দলে তার কি অবদান বলেন। আমাদের টাকা আপনারা ভাগ বাটোয়ারা করেছেন। আপনাদের জবাব দিতে হবে।
জি এম কাদেরের বিরুদ্ধে কথা না রাখার অভিযোগ তুলেন নোয়াখালী-৩ আসনের প্রার্থী ফজলে এলাহী সোহাগ। তিনি বলেন, চেয়ারম্যান আপনি এককভাবে নির্বাচন করার ওয়াদা করেও তা রাখেননি। আপনি চেয়ারম্যান হওয়ার আগে নীতিকথা বলতেন, চেয়ারম্যান হওয়ার পরিবর্তন হয়ে গেছেন।
সিরাজগঞ্জের প্রার্থী মুখতার হোসেন বলেন, রক্ত মাংস দোকান পাট বিক্রি করে নির্বাচন করেছি। স্বতন্ত্র ও নৌকার লোকদের হামলার মুখে জীবন যায়, কিন্তু দলের কোনো সহযোগিতা পাইলাম না। একটু দেখা পর্যন্ত দিলেন না। তারা আমাদের বরাদ্দকৃত টাকা নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছেন। তারা ফোন ধরেনি কারণ তারা টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য লিয়াকত হোসেন খোকা বলেন, এখানে যে অভিযোগ উঠে এসেছে বা আসছে দলের দুই শীর্ষ নেতাকে তার জবাব দিতে হবে।
কো-চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এই অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন। তিনি বলেন, পল্লীবন্ধু হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের সঙ্গে থেকে এই জাপা প্রতিষ্ঠা করেছি। ৯১ এর পর ৪বার জেল খেটেছি, নানাভাবে জুলুম হয়রানির স্বীকার হয়েছি। জাপায় পল্লীবন্ধু এরশাদের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তার নির্দেশনা ও দেখানো পথেই দলকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এবারের নির্বাচনে অংশ নিয়ে আমরা বঞ্চিত হয়েছি, আর তারা গুটিকয়েক লাভবান হয়েছেন।
নেতাকর্মীরা নির্বাচনের মাঠে থাকতে গিয়ে মার খেয়েছে কিন্তু দলের সহযোগিতা পায়নি। শীর্ষ নেতারা ফোন ধরেননি, পয়সাকড়ি পাননি।
