ব্যানার টানিয়ে চিকিৎসা বন্ধ এখন আবেদনের প্রস্তুতি

আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০২৪, ০৮:০৭ এএম

রাজধানীর বাড্ডার সাঁতারকুলের ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। গত রবিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক হাসপাতাল বন্ধের নির্দেশের পর গতকাল সোমবার থেকে এখানে কোনো রোগী ভর্তি করা হচ্ছে না। কর্র্তৃপক্ষ হাসপাতালের সামনে একটি ব্যানার টানিয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে।

এ ব্যাপারে ইউনাইটেড হাসপাতালের জনসংযোগ কর্মকর্তা আরিফুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাসপাতালে কোনো রোগী ভর্তি ছিল না। ফলে বন্ধ করার সময় রোগীদের অন্যত্র স্থানান্তরের প্রয়োজন হয়নি। হাসপাতালে ১০০ শয্যার প্রস্তুতি আছে। কিন্তু চালু আছে কয়েকটি বেড। এমনিতেই রোগী কম। আজ (গতকাল) থেকে কোনো রোগী ভর্তি করা হবে না। তবে মেডিকেল কলেজ খোলা আছে ও সেখানে রুটিনমাফিক ক্লাস পরীক্ষা চলবে।’

এই কর্মকর্তা বলেন, ‘বন্ধ হয়েছে সাঁতারকুলের ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতাল চালু আছে। এ ভুল বোঝাবুঝি যেন না হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘শিগগির সাঁতারকুল ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আবেদন করা হবে।’

গতকাল হাসপাতালে গেলে গেটে কর্তব্যরত প্রহরীরা কোনো গণমাধ্যমকর্মীদের সেখানে ঢুকতে দেয়নি। এ সময় মাল্টিমিডিয়ার দুই সাংবাদিক বন্ধের বিষয়ে লাইভ সংবাদ প্রচার করতে গেলে প্রহরীরা তাদের ওপর হামলা চালায়। তাদের সঙ্গে থাকা ক্যামেরা, মোবাইলসহ ব্যবহৃত সরঞ্জাম কেড়ে নিয়ে ভাঙচুর করার অভিযোগ করেছেন ওই সাংবাদিকরা। বেলা ৩টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।

হামলা ও হেনস্তার শিকার দুই সাংবাদিক হলেন বাংলাদেশ টাইমসের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার ইমরান হোসেন এবং দৈনিক আমার সংবাদ পত্রিকার রিপোর্টার মিরাজ উদ্দিন। এ ঘটনায় দুই সাংবাদিক প্রথমে বাড্ডা থানায় অভিযোগ করেন ও পরে একটি হত্যাচেষ্টার মামলা হয়।

তবে দুই সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনা অস্বীকার করেছেন ইউনাইটেড হাসপাতালের জনসংযোগ কর্মকর্তা আরিফুল হক। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে মারধরের কোনো ঘটনা ঘটেনি। তারা (সাংবাদিকরা) হাসপাতালে অনুমতি ছাড়াই ঢুকেছিল, এমনকি সাংবাদিকতারও কোনো পরিচয় দেননি। যে কারণে আমাদের সিকিউরিটি গার্ড যারা রয়েছেন, তারা সাময়িক সময়ের জন্য তাদের আটকে রেখেছিলেন। খবর পেয়ে আমি দ্রুত যাই এবং তাদের ছাড়ানোর ব্যবস্থা করি।’

এই হাসপাতালে সুন্নতে খতনা করাতে এসে মারা যায় পাঁচ বছরের শিশু আয়ান। গত ৩১ ডিসেম্বর অ্যানেস্থেশিয়া দিয়ে আয়ানের অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সুন্নতে খতনা হয়। কিন্তু টানা দুই ঘণ্টা পরও আয়ানের জ্ঞান না ফিরলে তাকে গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে টানা সাত দিন অচেতন অবস্থায় শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে থাকার পর ৭ জানুয়ারি রাত সাড়ে ১১টার দিকে আয়ানকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

এ ঘটনায় আয়ানের পরিবার ওই হাসপাতালের দুই চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ আনে ও থানায় মামলা করেন। অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তদন্ত চলাকালে গত ১০ জানুয়ারি হাসপাতাল পরিদর্শনে গেলে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ হাসপাতাল পরিচালনায় কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেনি। হাসপাতালের নিবন্ধনের জন্য অধিদপ্তরে কোনো আবেদন করেনি। অর্থাৎ অবৈধভাবে গত এক বছর ধরে হাসপাতালে চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল কর্র্তৃপক্ষ।

এমন অবস্থায় গত রবিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এই হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেয়। সে নির্দেশ অনুযায়ী গতকাল থেকে এ হাসপাতালে রোগী ভর্তি বন্ধ হয়ে যায়।

আয়ানের মৃত্যুতে ৫ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ প্রশ্নে রুল: রাজধানীর বাড্ডায় ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে খতনার পর পাঁচ বছরের শিশু আয়ানের মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবারকে পাঁচ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ কেন দেওয়া হবে না, জানতে চেয়ে রুল দিয়েছে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে গত ১৫ বছরে এখন পর্যন্ত ওই হাসপাতালের অবহেলায় কত রোগী মারা গেছে তা জানাতে এবং আয়ানের মৃত্যুর ঘটনার যথাযথ তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

আয়ানের মর্মান্তিক মৃত্যুতে ক্ষতিপূরণের নির্দেশনা চেয়ে করা রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি মো. আতাবুল্লাহর হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ আদেশ দেয়। চার সপ্তাহের মধ্যে ইউনাইটেড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষসহ স্বাস্থ্য সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) সভাপতি ও রেজিস্ট্রারকে রুলের জবাব দিতে হবে।

গত ৯ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এ বি এম শাহজাহান আকন্দ মাসুম এ আবেদনটি করেন। আয়ানের বাবা শামীম আহমেদকে পক্ষভূক্ত করা হয়। আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন শাহজাহান আকন্দ মাসুম। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তুষার কান্তি রায়। আদেশের বরাতে অ্যাডভোকেট শাহজাহান আকন্দ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সারা দেশে অনুমোদিত, অনুমোদনহীন কত সংখ্যক হাসপাতাল আছে তার তালিকা চেয়েছে হাইকোর্ট এবং এক মাসের মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে এ তালিকা দিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া ইউনাইটেডে গত ১৫ বছরে চিকিৎসা অবহেলায় কতজন রোগীর মৃত্যু হয়েছে সে বিষয়ে একটি প্রতিবেদন দেবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। আইনজীবী আরও বলেন, ইউনাইটেড হাসপাতালের নিবন্ধন (লাইসেন্স) কেন স্থায়ীভাবে বাতিল করা হবে না, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের সনদ কেন স্থগিত করা হবে না, রুলে সেটিও জানতে চেয়েছে হাইকোর্ট। 

আয়ানের মৃত্যুতে দেশ জুড়ে তোলপাড়ের পর গত রবিবার ওই হাসপাতাল বন্ধের নির্দেশ দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ইতিমধ্যে শিশু আয়ানের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের দায়ী করে মামলা করেছেন আয়ানের বাবা শামীম আহমেদ। গত ৩১ ডিসেম্বর সুন্নতে খতনা করাতে আয়ানকে বাড্ডার ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান তার বাবা-মা। তবে, খতনা শেষ হলেও আয়ানের সংজ্ঞা না ফেরায় তাকে গুলশান-২-এর ইউনাইটেড হাসপাতালে পাঠানো হয়। অবস্থার অবনতি হওয়ায় সেখানে আয়ানকে রাখা হয় শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (পিআইসিইউ) লাইফ সাপোর্টে। সাত দিন জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকার পর গত রবিবার রাত ১১টার পর আয়ানকে মৃত ঘোষণা করেন দায়িত্বরত চিকিৎসকরা। সন্তান আয়ানের মৃত্যুর ঘটনায় বাবা শামীম আহমেদ ওই হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অবহেলা ও আয়ানের মৃত্যুর বিষয়টি নিয়ে টালবাহানার অভিযোগ করেন। অভিভাবকের অনুমতি ছাড়াই চিকিৎসকরা শিশু আয়ানকে ফুল অ্যানেস্থেসিয়া (জেনারেল) দিয়ে সুন্নতে খতনা করানো হয় বলে অভিযোগ করেন শামীম আহমেদ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত