বলিষ্ট নেতৃত্বর জন্য বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন বাপ্পাদিত্য বসু। সেখানেও রেখেছেন নানা ছাপ। রাজাকারদের ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক ছিলেন এই নেতা। কিন্তু এক সময় জানা যায় বাপ্পাদিত্য বসুকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
এরপর গতকাল বুধবার জানা গেল, তিনি অর্থঋণ ও প্রতারণার দায়ে আদালত সাজাপ্রাপ্ত আসামি। সেই ঘটনায় পালিয়ে থেকেও বাঁচতে পারেননি, অবশেষে গ্রেপ্তার হয়েছেন। লোভের কারণেই এই ছাত্রনেতার এমন পতন বলে মনে করছেন ঘনিষ্টজন ও সংশ্লিষ্টরা।
রাজনৈতিক দলের পরিচয় ব্যবহার করে ২০১৮ বা ২০১৯ সালের দিকে ট্রাভেল ও ট্যুর অপারেটরের নামে অনেককে বিদেশে ও ট্যুর প্যাকেজে পাঠানোর নামে টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী দেশ রূপান্তরকে জানান, আনুমানিক ২০১৮ বা ২০১৯ সালে ট্রাভেল ট্যুরের মাধ্যমে ভুটানে যাওয়ার কথা ছিল। এক পরিচিতজনের মাধ্যমে তার বাপ্পাদিত্যর সঙ্গে পরিচয় হয় এবং ওই ট্যুরে যাওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন। পরে সেই ট্যুরে ২৮ হাজার টাকার বিনিময়ে ভুটান যাওয়া এবং দার্জিলিং হয়ে ফেরার কথা ছিল। তিনি অগ্রিম হিসেবে ১৪ হাজার টাকা দেন। এরপর কয়েকদিনেও কোনও ধরনের জবাব না এলে বাপ্পাদিত্যর সঙ্গে যোগাযোগ করলে ট্যুরটি একটু দেরি হবে বলে জানান। কিন্তু পরে আর সেই ট্যুরটি হয়নি।
ওই ভুক্তভোগী আরো বলেন, ট্যুর না হওয়ার কারণে আমি তার কাছে কয়েকবার টাকা চেয়েছি। কিন্তু আজ দিচ্ছি, কাল দিচ্ছি করে তাকে ঘুরিয়েছেন। পরে তিনি আর টাকাটি পাননি। ওই ঘটনার পর এজেন্সির মাধ্যমে তিনি আর ট্যুর করেন না।
শুধু ওই ভুক্তভোগীই না, বাপ্পাদিত্য সম্পর্কে তার সাবেক সহকর্মী ও ঘনিষ্ট কয়েকজনের সঙ্গে আলোচনা করে জানা গেছে, তিনি অনেকের সঙ্গেই অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণা করেছেন। বিভিন্ন সময়ে করা এ ধরনের প্রতারণায় তেমন কেউ অভিযোগ না করলেও তিনটি মামলা হয় নড়াইল, নারায়ণগঞ্জ ও নোয়াখালীর কোর্টে। আর সেখানেই তিনি ফেঁসে যান। আর তার এ ধরনের কাজের জন্য তাকে অনেক আগেই দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
তার ঘনিষ্ট কয়েকজন অভিযোগ করে বলেন, ওয়ার্কার্স পার্টিসহ ১৪ দল সরকার গঠন করলে ছাত্রমৈত্রীর সাবেক সভাপতি হিসেবে অনেকের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক হয়। আর সেই সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে বাপ্পাদিত্য অনেকের কাছ থেকে ট্রাভেল ও ট্যুরের মাধ্যমে বিদেশে পাঠানোর কথা বলে অনেক ক্ষেত্রেই ভুয়া টিকিট বিক্রি করে টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এ ছাড়া চাকরি ও বিভিন্ন ধরনের কাজ পাইয়ে বা করিয়ে দেওয়ার কথা বলেও টাকা নিয়েছেন। কাজ না করার কারণে টাকা চাইলে দীর্ঘ দিন ঘুরিয়েছেন। কাউকে কাউকে কিছু টাকা ফেরত দিলেও পুরোটা ফেরত দেননি বলেও অভিযোগ রয়েছে। আর এসব অনৈতিক কাজের কারণেই তাকে বহিষ্কার করা হয়।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর বর্তমান সভাপতি অতুলন দাস আলো দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০১৪ সালে বাপ্পাদিত্য তার সময় শেষ করে ছাত্র মৈত্রী থেকে বিদায় নেন। পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের শেষের দিকে রাজনৈতিকভাবে যে দলের সঙ্গে যুক্ত সেই বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির প্রাথমিক সদস্যপদ বাতিল করা হয়। ২০১৮ সালে কংগ্রেস (চূড়ান্তভবে সদস্যপদ বাতিল সিদ্ধান্ত হয়) থেকে তার অংশগ্রহণ চূড়ান্তভাবে বাদ দেওয়া হয়।
তিনি আরো বলেন, ব্যক্তিগতভাবে একজন মানুষ যখন সংগঠন থেকে বিদায় নেন, তখন তার ব্যক্তিগত জীবনের কোনও দায় সংগঠনের না। তাই তিনি যা করেছেন তার দায়ভার তার নিজের, এর সঙ্গে দলের বা তাদের কোনও সম্পর্ক নেই।
এদিকে গত মঙ্গলবার নিউমার্কেট এলাকা থেকে অর্থঋণ ও প্রতারণার অভিযোগে সাজাপ্রাপ্ত হওয়ায় এই ছাত্রমৈত্রীর সাবেক সভাপতি বাপ্পাদিত্য বসুকে গ্রেপ্তার করে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। পরে তাকে যশোর কোতোয়ালী মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়।
ওই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রাজ্জাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাপ্পাদিত্যকে তাদের কাছে সোপর্দ করলে বুধবার তাকে আদালতে প্রেরণের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। তার বিরুদ্ধে পৃথক ঘটনায় নড়াইল, নারায়ণগঞ্জ ও নোয়াখালীর কোর্টে দুটি চেক ডিজঅনার ও একটি প্রতারণা মামলায় ওয়ারেন্ট ছিল। সেই ওয়ারেন্ট বলেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি ধারনা করছেন, তার প্রতারণার মামলায় সাজা হয়েছে।
এই কর্মকর্তা আরো বলেন, যেহেতু এটা তার স্থায়ী ঠিকানা, তাই তার ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে এখানে পাঠানো হয়েছিল। তবে এখন তার সংশ্লিষ্ট আদালতে মালায় পরবর্তী ব্যবস্থা নেবেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
ঢাকা থেকে বাপ্পাদিত্যকে গ্রেপ্তারের পর র্যাব-১০ এর উপপরিচালক আমিনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাপ্পাদিত্যর বিরুদ্ধে তিনটি অর্থঋণ ও প্রতারণার মামলায় রয়েছে এবং দণ্ডপ্রাপ্ত ছিলেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে, বাপ্পাদিত্য মামলা রুজুর পর হতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আত্মগোপন করেছিলেন বলে জানা যায়।
