মঠবাড়িয়ায় কামার শিল্প বিলুপ্তির পথে

আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০২৪, ০২:২৩ এএম

আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিলুপ্তের পথে কামার শিল্প। পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারের কামাড়পাড়াগুলোতে আগের সেই জৌলুস আর নেই। আগের মতো লোহা পেটানোর টুং টাং শব্দও এখন তেমন একটা শোনা যায় না। এমকি বছরের ধানকাটা মৌসুম ও কোরবানির ঈদের সময়ও কামারদের দোকানে তেমন ভিড় দেখা যায় না। আধুনিক মেশিনে তৈরি বাহারি রকমের লোহার দাঁ, ছুরি, কাঁচি এখন বিভিন্ন দোকানে পাওয়া যাচ্ছে। তাই কামাররা এখন অনেকটা অলস সময় পার করেন। কাজ না পেয়ে অনেকে পেশাও পরিবর্তন করছেন। বংশ পরম্পরায় চলে আসা এক সময়ের ঐতিহ্য এখন হারিয়ে যাচ্ছে। হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার এ পেশাকে ধরে রেখে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তবে তারাও তাদের সন্তানকে এ পেশায় আনতে নারাজ। তারা মনে করেন এ পেশা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মঠবাড়িয়া পৌর শহরের ঐতিহ্যবাহী কামারপাড়ায় বর্তমানে মাত্র আটজন এ পেশায় জড়িত রয়েছেন। গৃহস্থালির কাজের বটি, খুন্তি, পাছুন, কৃষকের কাস্তে, নিড়ানি, কোদাল, লাঙলের ফলা, শ্রমিকের কুঠার, শাবল, দাঁ, বড় চাকু ইত্যাদি নানা যন্ত্রপাতি তৈরি করেন তারা। তবে কাজ আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে।

কামারপাড়ার সুশীল কর্মকার জানান, এখন অনেক খারাপ সময় যাচ্ছে। বছরের বেশিরভাগ সময় বসেই থাকতে হয়। তিনি বলেন, ‘এখন আমার সংসার চলছে দিন আনি দিন খাই অবস্থায়। এক সময় লাখ টাকার কাজও করেছি। আবার ৪০ হাজার টাকার কাজ করলে শ্রমিকদের বেতন, কয়লার খরচ দিয়ে ২০-২৫ হাজার টাকা থাকত। কিন্তু এখন আর আগের অবস্থা নেই। কয়লার দাম অনেক বেশি। এখন মানুষ অনলাইনে সব কিছু অর্ডার দিয়ে কিনে ফেলেন, আমাদের কাছে আগের মতো ক্রেতা আসেন না। তাই বড় কাজও পাই না। ছোটখাটো কাজ করি। আবার এখন অনেক আধুনিক মেশিন আসছে, সব যন্ত্রপাতি এখন মেশিন দিয়ে কাটে। আগে এগুলো আমরা হাতে তৈরি করতাম। কামারের কাজ এখন নেই বললেই চলে। বছরের বেশিরভাগ সময় আমরা বসে থাকি। টুকটাক করে জীবন চলে।’

রবিন কর্মকার আক্ষেপ করে বলেন, ‘বছরের পর বছর এ শিল্প নিয়ে কাজ করলেও কোনো ব্যাংকঋণ সুবিধা পাই না। চড়া সুদে এনজিও থেকে ঋণ নিতে হয়। আর সে ঋণ পরিশোধ করতে আমাদের হিমশিম খেতে হয়।’

পরের প্রজন্ম এ পেশায় আসবে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তিন পুরুষ ধরে আমরা এই কাজ করতেছি। আমাদের দোকানের বয়স ৭০ বছর, কিন্তু আজ পর্যন্ত আমাদের পুঁজি বলতে কিছুই নেই। দিন এনে দিন খেয়েই কেটে যাচ্ছে জীবন। আমার ছেলে মাস্টার্স পাস করেছে। আমার পরিবারের কোনো সদস্যকে এই পেশায় নিয়ে আসার ইচ্ছা নেই।’

রবিন মনে করেন, কালের পরিবর্তনে একটি সময় হয়তো বিলুপ্ত হয়ে যাবে এই পেশা। কারণ আধুনিকতার ছোঁয়ায় দিন দিন এই শিল্পের প্রয়োজন কমে যাচ্ছে মানুষের কাছে। মঠবাড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল কাইয়ূম বলেন, ‘কামার শিল্প দেশের অর্থনীতির একটা অংশ। তাদের সুবিধার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত