হিন্দুধর্ম ভারতসহ ছড়িয়ে গিয়েছিল গোটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। আজকের মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড তো আছেই, আফগানিস্তানেও ছিল হিন্দুধর্মের প্রবল উপস্থিতি। এই সমস্ত এলাকায় হিন্দু ধর্মের উত্থান ও পতনের সঙ্গে সামরিক কারণ, মুসলিমদের অভিযানকে অনেক সময় সামনে আনা হয়। তবে ইতিহাস অনুযায়ী, এসব এলাকায় হিন্দু ধর্মের উত্থান হয়েছিল বাণিজ্য করতে গিয়ে, ঠিক সেভাবে ইসলাম ধর্মেরও উত্থান হয়েছিল আরব বণিকদের মাধ্যমে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এইসময়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু ভারত নয়, একটা সময় হিন্দু ধর্মের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিতে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইসলাম প্রসারের পূর্বে ত্রয়োদশ থেকে পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত এ অঞ্চলে তিনটি শক্তিশালী রাজ্য ছিল, যেগুলো হলো শ্রীবিজয়া (মালয়েশিয়া), মাজপাহিত (ইন্দোনেশীয় দ্বীপপুঞ্জ) ও সিয়াম বা শ্যাম (থাইল্যান্ড)। জনগণ তখন হিন্দু, বৌদ্ধ ও সর্বপ্রাণবাদের সংমিশ্রণে সৃষ্ট একটি মিশ্র ধর্ম অনুসরণ করতো। ১ হাজার ৭০০ বছর আগে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক পথ ধরে মালেশিয়ায় হিন্দুধর্ম ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে মালেশিয়ার জনসংখ্যার মাত্র ৯ শতাংশ হিন্দু। বাকি জনসংখ্যার অধিকাংশ মুসলিম।
ভারতীয় ব্যবসায়ী, পণ্ডিত, পুরোহিতদের মাধ্যমে ইন্দোনেশিয়ায় হিন্দু ধর্মের প্রসার ঘটেছিল। জানা গিয়েছে, ৭ এবং ১৬ শতকে ইন্দোনেশিয়ায় বেশিরভাগ অঞ্চল হিন্দু রাজারা শাসন করেছিলেন।
ইসলামের তৃতীয় খলীফা ওসমানের রাজত্বের প্রথম দিকে আরব মুসলিম বণিকরা সমুদ্রপথে চীনের দিকে যাত্রাকালে ইন্দোনেশিয়ার উপকূলীয় বন্দরে যাত্রাবিরতির মাধ্যমে সর্বপ্রথম এ অঞ্চলের সাথে ইসলামের যোগসূত্র স্থাপন করে। হিন্দুধর্ম এখনও ইন্দোনেশিয়ার ছয়টি প্রধান ধর্মের মধ্যে একটি। বর্তমানে দেশটিতে মোট ২৭ কোটি মানুষ বসবাস করে। এর মধ্যে ৮৬.৭ শতাংশ মুসলিম। ১.৭৪ শতাংশ হিন্দু। এর মধ্যে বালিতেই ৯০ শতাংশ হিন্দুর বসবাস।
কম্বোডিয়ার মতো দেশটিতেও একসময় সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন হিন্দুরা। শিবের উপাসনা করেতেন তাঁরা। ১০০ খ্রিস্টপূর্বে থেকে ৫০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ফানান সাম্রাজ্যের সময় কম্বোডিয়ায় হিন্দু ধর্মের বিকাশ ঘটেছিল। ১৫ শতক পর্যন্ত কম্বোডিয়ায় হিন্দু ধর্মের প্রাধান্য ছিল। এরপর দেশে বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার ঘটে। বর্তমানে দেশটির জনসংখ্যার ৯৭ শতাংশ বৌদ্ধ।
আফগানিস্তানও ষষ্ঠ শতাব্দী পর্যন্ত হিন্দু ও বৌদ্ধ অধ্যুষিত ছিল। ১১ শতকে বেশিরভাগ হিন্দু মন্দির ধ্বংস করে মসজিদে রূপান্তরিত হয়েছিল। কল্লর, অষ্টপাল, ভীম, জয়পালের মতো হিন্দু রাজারা সেখানে রাজত্ব করেছিলেন। বর্তমানে আফগানিস্তানে হিন্দুর সংখ্যা ১ হাজারে নেমে এসেছে। ৯৯ শতাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মাবলম্বী। এর মধ্যে ৯০ শতাংশ সুন্নি সম্প্রদায়ের।
থাইল্যান্ড কখনো হিন্দু অধ্যুষিত দেশ ছিল না। কিন্তু হিন্দুর্ধমের প্রভাব পড়েছিল। সংখ্যালঘু হলেও, বর্তমানে ৮৪ হাজারের বেশি হিন্দু বসবাস করে দেশটিতে। নাগরিকদের অধিকাংশ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। তামিল ও গুজরাটিরা রত্ন ও বস্ত্রশিল্পের কাজ করার জন্য ১৮০০ দশকের শেষের দিকে থাইল্যান্ডে আসে।
এরপর ১৮৯০ এর দশকে পাঞ্জাব থেকে শিখরা এসে ঘাঁটি গেড়েছিল দেশটিতে। ভিয়েতনামেও ছিল হিন্দু জনসংখ্যা। পরে তা সঙ্কুচিত হয়েছে। এখনও ৭০ হাজার হিন্দুর বসবাস দেশটিতে। ফিলিপাইনেও রয়েছে প্রচুর হিন্দু মন্দির। এক সময় মালদ্বীপ ছিল হিন্দু চোল রাজাদের অধীনে। পরে সেখানে আরব বণিকদের মাধ্যমে ইসলামের বিস্তৃতি ঘটে।
