ঢাকায় ঘুম ভাঙছে না আর কা কা কায়

  • সকালে শোনা যাচ্ছে না কাকের কোরাস
  • মানুষের আধিক্যে ব্যাহত হচ্ছে কাকের বাস্তুসংস্থান
  • ডিম ফোটানোর মত বাসাটুকুও নেই কাকের
  • পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো চিড়িয়াখানায় খাঁচাবন্দি কাক দেখবে
আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২৪, ১০:১৫ পিএম
এক সময় গ্রামের মানুষের ঘুম ভাঙত মোরগের ডাকে। শহরের সকাল হতো কাকের কোরাসে। ভোরের আলো ফোটার আগেই কাকের ‘আড্ডা’ শুরু হয়ে যেতো পাড়া-মহল্লার আঁস্তাকুড়ে। দেখা যেতো, এক দল খাবার খাবার নিয়ে হল্লা করছে তো আরেক দল সড়কের পাশের বিদ্যুতের লাইন কিংবা টেলিফোনের তারে সার বেঁধে বসে তারস্বরে কা কা করছে। কখনও কখনও খাবারের সন্ধানে চুপিসারে ঢুকে পড়ছে মানুষের ঘরেও। কাকের সঙ্গে মানুষের নিত্যকার সম্পর্ক অনেক আগে থেকে আছে বলেই সাহিত্য বা আধুনিক সাহিত্যে কালো এই পাখিটির মত এত ব্যাপক পদচারণা নেই অন্য কোনো পাখির।
 
বাংলা ভাষার বেশ কয়েকটি বাগধারা ও প্রবাদ প্রবচনও আছে কাক নিয়ে। কিন্তু দিন বদলের পালায় সেইসব দৃশ্য এখন বিরল। কয়েক বছর আগেও রাজধানী ঢাকার যেসব এলাকায় শিশুরা কাকের ভয়ে খাবার নিয়ে বাইরে যাওয়ার সাহস করতো না সেসব এলাকায় এখন খাবার দিয়েও কাকের দেখা মেলা ভার।
 
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শহরের অবকাঠামো উন্নয়ন, মানুষের আধিক্যের কারণে ভীষণভাবে ব্যাহত হচ্ছে কাকের বাস্তুসংস্থান। ফলে দিন দিন শহরে কমছে কাকের সংখ্যা।
 
চোখের সামনে কাক হারিয়ে যেতে দেখেছেন পুরান ঢাকার বাসিন্ধা ও পরিবেশবাদী আন্দোলনের সংগঠক রাসেল আবেদীন তাজ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্বাধীনের আগেই আমাদের পূর্ব পূরুষরা ঢাকায় বসবাস শুরু করে। দাদার আমলের বাসা হওয়াতে ছোট বেলায় (নব্বই দশকে) আমাদের বাড়ির পাশে  ছিলো একটি বিশাল আমগাছ যাতে অন্তত ১০-১৫টি  কাকের বাসা ছিল। সকালে কাকে কা-কা শব্দেই ঘুম ভাঙতো। আর আমের মৌসুমে ওদের যন্ত্রণায় আম পাড়তে গাছে ওঠা চ্যালেঞ্জিং হয়ে যেত কারণ ওরা ওদের বাসা ও বাচ্চার জন্য মানুষকে বিপদজনক ভেবে ঠুকরে দিতে আসতো। কিন্তু দাদার মৃত্যুর পর আমাদের বাড়িটি ভাগ হয়ে যায়, ভবন নির্মাণের জন্য কেটে ফেলা হয় আম গাছটি। ঠিক এভাবেই ঢাকার শত বাড়ির শত শত গাছ কাটা হয়েছে মানুষের বসতির জন্য।
 
তিনি বলেন, কাক যেহেতু গাছ ছাড়া বাসা করতে পারে না তাই এই সবুজের সাথে সাথে কাকেরাও বিদায় নিয়েছে আমাদের এলাকা থেকে। অল্প সংখ্যক যা কাক আছে তাও হয়তো আর দেখতে পারবো না কিছু বছর পর। ঢাকাবাসী আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো একদিন চিড়িয়াখানায় খাঁচাবন্দি কাক দেখে কাকের সাথে পরিচিত হবে।
 
জীববৈচিত্র বিষয়ক অনলাইন পোর্টাল লিস্টভার্স ডটকমের তথ্যমতে, কাকের উদ্ভব ঘটেছে মধ্য এশিয়ায়। সেখান থেকে এটি উত্তর আমেরিকা, আফ্রিকা, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। পৃথিবীতে ৪০টিরও বেশি প্রজাতির কাক দেখা যায়। তবে বাংলাদেশে সাধারণত বেশি সংখ্যক পাতিকাক ও অল্প সংখ্যক দাঁড়কাক দেখা যায়। তবে সময়ের সাথে সেই কাকও এখন হারিয়ে যেতে বসেছে।
 
ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) এর বণ্যপ্রাণী গবেষক সীমান্ত দীপু বলেন, সারা দেশের প্রেক্ষাপটে কাক কিছুটা কমেছে। সবচেয়ে বেশি কমেছে ঢাকা শহরে। বছরওয়ারি পরিসংখ্যান আমাদের হাতে নেই। তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় কাকের সংখ্যা আগের সমান নেই। এর বড় একটি কারণ হচ্ছে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র-বাংলাদেশ (আইসিসিডিআরবি) কিছু গবেষণাও করেছে। তারাও কাকে এই ভাইরাসের অস্তিত্ব পেয়েছে।
 
তিনি বলেন, কাক কমে যাওয়ার আরও একটা কারণ হচ্ছে খাদ্যভাস। নগরায়নের ফলে কাকের খাবারে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। আমাদের দেশে যে পরিমান পোল্ট্রি খামার বেড়েছে তা আগে ছিল না। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে এসব পোল্ট্রি মুরগি মারা যায়। অনেকেই এসব যত্রতত্র ফেলে দেয়। এবং সেগুলো খাবার অন্যান্য প্রাণীর মত কাকও খেয়ে থাকে। এসব রোগাক্রান্ত মুরগি কাক খাওয়ার ফলে জীবানু ধারা আক্রান্ত হয়। এসব কারণেও দলে দলে কাক মারা যাওয়ার রেকর্ড আছে। যদি এটা বিজ্ঞানভিত্তিক প্রমাণিত হয়নি। তবে আমরা কিছু জায়গায় প্রমাণ পেয়েছি।
 
এই গবেষক বলেন, শহর পরিচ্ছন্ন রাখতে যারা কাজ করেন। তাদের চাইতেও কাক এক সময় শহর বেশি পরিচ্ছন্ন রাখতো। কাক কমে যাওয়ার ফলে এসব উচ্ছিষ্ট খাবার কুকুরে খাবারে পরিণত হয়েছে। ফলে কুকুরের বংশ বিস্তার বাড়ছে। মানুষ কুকুর দ্বারা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। এ জন্য বছরে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। কাক যদি টিকে থাকার সুযোগ পেতো তাহলে এই অতিরিক্ত ব্যয় হয়ত সরকারকে করতে হত না।
 
পরিবেশ গবেষক পাভেল পার্থ বলেন, শহর থেকে কাক হারিয়ে যাচ্ছে এটা খালি চোখে তাকালেই চোখে পরে। একই অবস্থা  গ্রামেও। হাওর এলাকাগুলোতেও প্রচুর কাক দেখা যেত। কিন্তু এখন হাওরে খুব একটা কাক দেখা যায় না। শহরে কিছু কাক দেখা যায়, এটা হচ্ছে বড় শহরগুলোতে যে ডাম্পিং জোন আছে ওইখানে কাক এবং বাক শালিক দেখা যাচ্ছে এটা অন্য কারণে। এটার বড় কারণ হচ্ছে ওপেন স্পেস কমে যাওয়া। কমার অন্যতম কারণ তার অবাসস্থল নেই।
 
শহরে এত কাক থাকার যায়গা কোথায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখনকার শহর কাকের জন্য অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ কাকেদের অন্যতম বসার জায়গা হচ্ছে কারেন্টের তার, বিদ্যুতের লাইন, ডিসের লাইন এগুলো। এসবতো আসলে কাকেদের বসার জায়গা না। এগুলো নির্দেশ করছে শহরেও আসলে কাকেদের বসার মত জায়গা নেই। বিশ্রাম নেওয়ার মত গাছ নেই। আবাসস্থলের অভাব আছে। মানে ডিম ফোটানোর মত যে বাসা দরকার সে বাসাটুকু তৈরি করার মত কোন জায়গা নেই।
 
তিনি বলেন, স্বভাবতই কাক পরিবেশে দূষণ ছড়ায় এমন সব খাবারই কাক খেয়ে থাকে। কিন্তু সেখানেও সংকট। এককভাবে কাকের খাবার কমছে তা নয়। কাক যে খাবার খেয়ে বেঁচে থাকে সে খাবার কমে যাচ্ছে। শহর এলাকা যে খাবারটা খাচ্ছে কাক হয়ত সেটা খেতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু এটা নিয়ে খুব গবেষণা নেই। কাক কমে যাওয়ার বড় একটি কারণ তার খাদ্যভাস পরিবর্তন।
 
শুধু তাই নয় কাকের খাদ্যভাসে পরিবর্তন ফলে এর প্রজননেও প্রভাব পরেছে। কারণ শহরের এখন যেসব বর্জ্যে তৈরি হয় তাতে এখন প্লাস্টিক বা ধাতব পদার্থের উপস্থিতি আগের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। সেগুলো কাকের দেহে বিষক্রিয়া ঘটাবে। এ ছাড়া কীটনাশক বা ইনসেকটিসাইড বেশি ছিটানো হয় জমে থাকা বর্জ্যের ওপরই। সেগুলোও কাকের শরীরে বিষক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
 
প্রকৃতি থেকে কাক হারিয়ে গেলে কতটা ক্ষতি হবে? এমন প্রশ্নের জবাবে পাভেল পার্থ বলেন, কাকের সঙ্গে মানুষের সর্ম্পক অন্য অনেক প্রাণীর চেয়ে বেশি। প্রথমত কাক হারিয়ে গেলে পরিবেশ খাদ্য শৃঙ্খলে একটা বড় সমস্যা দেখা দিবে। দ্বিতীয়ত কাক যেহেতু বর্জ্য পরিস্কার করে সেখানেও একট বড় প্রভাব পরবে। তৃতীয়ত মানুষের মধ্যে নতুন নতুন রোগের সংক্রমন ঘটতে পারে। শুধু কাক রক্ষাই না, আমাদের কাকের সঙ্গে পরিবেশের অন্যান্য প্রাণী রক্ষায় নগর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে সবুজায়নের গুরুত্ব দিতে হবে।
×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত