গতি বনাম কৌশল: বিশ্বকাপে ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ বিতর্ক

আপডেট : ২২ জুন ২০২৬, ০২:০৪ পিএম

টানটান উত্তেজনা, বুলেটের গতিতে কাউন্টার অ্যাটাক আর গ্যালারির উন্মাদনা; ঠিক যখন ম্যাচের পারদ তুঙ্গে, তখনই রেফারির লম্বা বাঁশি! থমকে গেল দুই দলের খেলা। কোনো ফাউল বা ইনজুরি নয়, তীব্র গরমের হাত থেকে ফুটবলারদের বাঁচাতে ফিফার বাধ্যতামূলক ‘হাইড্রেশন ব্রেক’। উত্তর আমেরিকার গ্রীষ্মকালীন কড়া রোদে খেলোয়াড়দের সুরক্ষায় নেওয়া ফিফার এই তিন মিনিটের বিরতিই এখন ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় রণকৌশলগত আলোচনার বিষয়। মাঠের এই নতুন দাওয়াই যেন ছোট দলগুলোর জন্য ড্রেসিংরুমের ছক নতুন করে সাজানোর মোক্ষম অস্ত্র, আর বড় দলগুলোর ছন্দময় ফুটবলের সামনে এক অনাকাঙ্ক্ষিত স্পিড ব্রেকার!

আজ সোমবার ডালাস স্টেডিয়ামে অস্ট্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার আগে আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়ী কোচ লিওনেল স্কালোনিও এই নিয়ম নিয়ে নিজের দ্বিধাদ্বন্দ্ব লুকিয়ে রাখেননি। ড্যালাসের ম্যাচটি ইনডোর বা ছাদঢাকা স্টেডিয়ামে হওয়া সত্ত্বেও বহাল থাকছে এই পানি পানের বিরতি। আর তা নিয়েই সংবাদ সম্মেলনে স্কালোনি বলেন, “ম্যাচের প্রথম ২২-২৩ মিনিটে আমি মাথায় যে রণপরিকল্পনা নিয়ে ঘুরি, এই বিরতি এক নিমেষে তা বদলে দিতে পারে। আমাদের অ্যানালিস্টরা গেম রিড করেন এবং আমরা দ্রুত সমাধান খুঁজি। ঠিক যেভাবে প্রথমার্ধ শেষে নরমাল হাফটাইমে করা হয়।”

 বিষয়টি স্কালোনির কাছে কিছুটা অদ্ভুত আর অস্বাভাবিকও লেগেছে। “এর সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়াটা বেশ অদ্ভুত। যদি এই নিয়ম নিয়মিত চলতে থাকে, তবে হয়তো একদিন স্বাভাবিক মনে হবে। কিন্তু আমাদের কাছে এটি এখনো স্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়।” 

তবে এই নিয়মের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন উরুগুয়ের কিংবদন্তি কোচ মার্সেলো বিয়েলসা। ফুটবলের চিরাচরিত রূপ এবং ম্যাচের গতি নষ্ট করার অভিযোগে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে বিয়েলসা সরাসরি বলেন, “এই বিরতিগুলো খেলায় নতুন কিছুই যোগ করেনি, বরং অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে। আমি শুধু এটাই বলব এই সিদ্ধান্তের আগে ফুটবলের একটা নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ছিল, আর এখন এর রূপ একদম বদলে গেছে। মানুষ এই খেলাটার প্রেমে পড়েছিল তার চিরাচরিত রূপ আর বৈশিষ্ট্যের কারণেই।” তার মতে, এই স্টপেজগুলো ম্যাচের ছন্দ পুরোপুরি কেড়ে নিয়ে ৯০ মিনিটের খেলাটিকে কেটেকুটে কার্যত চার ভাগে ভাগ করে ফেলেছে।

নেদারল্যান্ডস অধিনায়ক ভার্জিল ফন ডাইকও মনে করেন, আবহাওয়া বিবেচনা না করে সব ম্যাচে ঢালাওভাবে এই বিরতি দেওয়া অযৌক্তিক। তবে উল্টো পিঠে জার্মানির ইউলিয়ান নাগেলসম্যানের মতো তরুণ কোচেরাও আছেন, যাঁরা এই বিরতিকে প্রথমার্ধের মাঝপথেই ভুল সংশোধনের এক 'ট্যাকটিক্যাল হাফটাইম' হিসেবে লুফে নিচ্ছেন।

ক্রীড়া বিজ্ঞানীদের যুক্তি অবশ্য অকাট্য। গ্রীষ্মের দুপুরে অতিরিক্ত ঘামের ফলে ফুটবলারদের শরীরে ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা তৈরি হয়, যা সরাসরি প্রভাব ফেলে তাঁদের মনোযোগ ও স্নায়ুতন্ত্রের ওপর। তাই বড় কোনো শারীরিক বিপর্যয় এড়াতে এই ৩ মিনিট অত্যন্ত জরুরি।

ফুটবলের চিরাচরিত গতি ও ঐতিহ্য রক্ষা, নাকি আধুনিক বাস্তবতায় ফুটবলারদের জীবনরক্ষা; এই দুইয়ের টানাপোড়েনে ফিফার এই তিন মিনিটের বিরতি এখন কেবল পানি পানের উৎসব নয়, বরং ডাগআউটের কোচেদের জন্য ফুটবলারদের মগজ ধোলাইয়ের এক নতুন দাবার বোর্ডে পরিণত হয়েছে।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত