ফেনীতে শ্রমিক ইউনিয়নের নাম ভাঙিয়ে হাজার হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালককে কৌশলে জিম্মি করে প্রতিদিন প্রায় লক্ষাধিক টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। শহরের প্রবেশমুখে ও শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে থাকা সিএনজি স্ট্যান্ড থেকে এসব চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। আর এর পেছনে শ্রমিক ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা নেতারা ও তাদের লোকজন এই চাঁদাবাজির নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। বুধবার (২৪ জানুয়ারি) মহিপাল ট্রাফিক অফিসের সামনে চাঁদা বন্ধের দাবিতে সিএনজি শ্রমিকরা প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলা থেকে প্রতিদিন দাগনভূ্ঞাঁ, সোনাগাজী, ছাগলনাইয়া, পরশুরাম ও ফুলগাজীসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক সড়কে প্রায় ১০ হাজারের অধিক সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল করে। তবে এসব সড়কে চলাচল করতে চালকদের প্রতিদিন দিতে হচ্ছে চাঁদা। অন্যথায় তাদের সিরিয়াল না দেয়াসহ কোনো সড়কেই চলাচল করতে দেওয়া হচ্ছে না। উপায়ন্তর না দেখে চালকরাও বাধ্য হয়েই চাঁদা দিয়ে থাকে।
সরেজমিন ফেনীর মহিপালে দাগনভূঞা থেকে আগত সিএনজি স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, ৭-৮ জন লোক দুইভাগে বিভক্ত হয়ে সিএনজিগুলো থেকে চাঁদা উঠাচ্ছেন। এক ভাগের লোকজন নিজেদের পৌরসভার টোল আদায় করছেন বলে জানান, অপরপক্ষ শ্রমিক ইউনিয়নের পক্ষ থেকে সিএনজির শৃঙ্খলা রক্ষার্থে ১০-২০ টাকা আদায় করছেন বলে জানান। তবে সবাই সিএনজি চালকদের টোকেন দিচ্ছেন।
ফেনী জেলা অটোটেম্পু- অটোরিকশা- সিএনজি ও মেক্সি পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন, মহিপাল- ফেনী নামে এ চাঁদা উঠানো হচ্ছে। এই সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ মকু মিয়া জানান, শ্রমিক সংগঠনের কল্যাণার্থে ও গাড়ির শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য এবং শ্রমিকদের পরিবারের সহযোগিতার জন্য এ চাঁদা ব্যবহার করা হয়। তবে তিনি যে সংগঠনের কথা উল্লেখ করেন সেই সংগঠনের কাগজপত্র দেখে জানা যায়, গত ২০২০ সালেই সেই সংগঠনের মেয়াদ শেষ এবং এই সংগঠনের সদস্যদের কাছ থেকে দৈনিক ১০ টাকা হারে চাঁদা নেওয়ার কথা থাকলেও মূলত তাদের কোনো সদস্যই করা হয়নি এবং এই সংগঠনের মাধ্যমে উপকৃত হয়েছে হাতে গোনা দুই একজন ছাড়া আর কেউ নয়। নাম প্রকাশ না করে কয়েকজন শ্রমিক বলেন, শ্রমিকদের উপকার না হলেও নেতাদের ঠিকই উপকার হচ্ছে তারা অনেকে বাড়ি-গাড়িও করেছেন এই টাকায়।
ফেনী পৌর শহরের বিভিন্ন স্থানে রাস্তার পাশে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে সিএনজির একাধিক অবৈধ স্ট্যান্ড। সড়কের দুইপাশে, আনাচে-কানাচে অবৈধ স্ট্যান্ডের ছড়াছড়িতে সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট। বেড়েছে জনগণের ভোগান্তি। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগী ও রোগীর স্বজনরা।
পৌর শহরের বিভিন্ন সড়কে চলাচলের রাস্তা দখল করে নিজেদের খেয়াল-খুশি মতো যত্রতত্র বসিয়েছেন সিএনজি অটোরিকশার স্ট্যান্ড। প্রতিটি স্ট্যান্ডে পার্কিং করা যানবাহনগুলো থেকে নেয়া হচ্ছে দৈনিক ভিত্তিতে চাঁদা। পাশাপাশি শহরের প্রবেশ মুখে চাঁদাবাজি করা হয় প্রকাশ্যে। এই চাঁদাবাজির একটি অংশ পৌরসভার ইজারাদার দাবি করা একটি চক্রের পকেটে গেলেও বাকি অংশ যাচ্ছে সরকারি দলের কতিপয় নেতাকর্মী ও চাঁদা আদায়ে জড়িতদের পকেটে।
ফেনী শহরের প্রবেশমুখ মহিপাল, হাসপাতাল গেইট, সেন্ট্রাল স্কুল গেট, মিজান রোড়সহ বিভিন্ন স্থানে এ অবৈধ স্ট্যান্ড বসানো হয়েছে। ওইসব স্ট্যান্ড থেকে প্রতিদিন সিএনজি থেকে ২০-৪০ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। কোনো চালক চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে তার সিরিয়াল বাতিল, কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে করা হয় মরধর। বেপরোয়া এই চাঁদাবাজির কারণে কোটি কোটি টাকা খরচ করে শহরের প্রধান প্রশস্ত করেও তা কোনো কাজে আসছে না। ফলে প্রতিনিয়ত যানজট যেন নিত্য নৈমত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি আর্থিক হয়রানির শিকার হচ্ছে সাধারণ চালকরা। আর অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে যাত্রীদের।
এইসব স্থানে পার্কিং করা সিএনজি চালকরা জানান, প্রতিবার যাত্রী নিয়ে যাওয়ার সময় পৌরসভার নির্দেশে তার নিয়োজিত লোকজন পৌরসভার টোলের নামে চাঁদা নিয়ে যায়। চাঁদা দিতে না চাইলে সিরিয়াল বাতিল করে পরবর্তী স্ট্যান্ডে সিএনজি নিয়ে ঢুকতে নিষেধ করা হয়। এসব কারণে চালকরা চাঁদা দিতে বাধ্য হন বলে জানা যায়।
কাসেম নামে এক চালকের অভিযোগ, পৌরসভার লোক দাবি করা হৃদয় নামের এক যুবকের নেতৃত্বে শহরের অতি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে একটি চাঁদাবাজ সিন্ডিটেক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
শাহজালাল নামে এক যাত্রী জানান, চাঁদাবাজির কারণে সম্প্রতি সিএনজির ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কয়েক মাস আগেও শহর থেকে সোনাগাজী যেতে ৪০ টাকা ভাড়া লাগত। বর্তমানে এ রুটে ৫০ টাকা ভাড়া দিতে হয়। এভাবে চাঁদার প্রভাব পড়েছে সাধারণ যাত্রীদের ওপর।
বিষয়টি নিয়ে জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির একাধিক সভায় আলোচনা হলেও চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ সচেতন মহলের। নিজেকে লাইনম্যান দাবি করে বিভিন্ন চাঁদা তুলছেন রুবেল, সালাউদ্দিন ,মোর্শেদ, বেলাল ও দিদার নামের কয়েকজন যুবক। তাদের নেতৃত্বে এইসব এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে ভ্রাম্যমাণ সিএনজি স্ট্যান্ড।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক সিএনজি মালিক এবং চালকরা জানান, সিএনজি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হানিফের ছেলের নেতৃত্বে তার নিয়োজিত লাইনম্যানদের হাতে দৈনিক ২০ থেকে ৪০ টাকা তুলে দিতে হয়। এছাড়া যাবতীয় কাগজপত্র থাকলেও ট্রাফিক পুলিশের কথা বলে প্রতিমাসে হাতিয়ে নেন ৬০০ টাকার স্টিকার।
তাদের অভিযোগ, সিএনজি মালিক সমিতির হানিফ প্রভাবশালী নেতা ও ট্রাফিক পুলিশকে মাসোহারা দিয়ে গুরত্বপূর্ণ সড়ক দখল করে ভ্রাম্যমাণ সিএনজি স্টেশন নিয়ন্ত্রণ করছে। হানিফের সাথে মাসিক চুক্তি করলেই তাদের দস্তখত সম্বলিত কিছু কার্ড ও স্টিকার দেন। আর ওই কার্ড দেখালে ও স্টিকার সিএনজির সামনের গ্লাসে লাগালেই রেজিস্ট্রেশনবিহীন সিএনজিগুলো ট্রাফিক পুলিশ অথবা অন্য যে কারো ঝামেলা ছাড়াই যেখানে-সেখানে গাড়ি চালানো যায়। তবে চুক্তিবিহীন সিএনজির রেজিস্ট্রেশন অথবা ফিটনেস ঠিক থাকলেও পদে পদে সমস্যায় পড়তে হয়। তবে যতই সমস্যায় পড়ুক হানিফ ও তার নিয়োগকৃত লোকজনকে ফোন দিলেই নিমিষেই সব কিছুর সমাধান হয়ে যায় বলে দাবি চালকদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন চাঁদা আদায়কারী জানান, পৌরসভার ১০ টাকার রশিদে ৭টি স্পটের পাশাপাশি প্রধান সড়ক থেকে প্রতি সিএনজি অটোরিকশা থেকে আদায় করা হয় ৪০ থেকে ৫০ টাকা। এর মধ্যে পৌরসভার ইজারাদার পায় ১০ টাকা, সমিতি নেয় ২০-৩০ টাকা, মাসিক হিসেবে ট্রাফিক পুলিশের নামেও নেন একটি অংশ। বাকি টাকা চাঁদা আদায়ে জড়িতরা নেয়। চাঁদা আদায়ে ও স্টিকার বিক্রিসহ স্ট্যান্ড নিয়ন্ত্রণে শতাধিক লোক কাজ করছে। তবে সমিতি থেকে প্রতি মাসে এক নেতাকেও মাসোহারা দিতে হয় বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত হানিফের সঙ্গে মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
ফেনী পৌরসভার মেয়র নজরুল ইসলাম স্বপন মিয়াজী বলেন, পৌরসভা যে টোল নিচেছ তা বৈধ, শহরের প্রবেশমুখে প্রতিদিন একবার পৌর টোল ইজারাদার নিয়ে থাকে। সড়কের উপর সিএনজি থামিয়ে এ টোল আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি গত ৪০ বছর এভাবে চলছে বলে জানান।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ফেনীর ট্রাফিক ইন্সফেক্টর আনোয়ারুল করিম বলেন, ফেনী পৌর শহর এলাকা নিরাপদ ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সুন্দর গড়ার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। ট্রাফিকের পাশাপাশি যানযট নিয়ন্ত্রণে শহরের প্রবেশ মুখে কিছু লোক কাজ করে। তাদের ভাতা শ্রমিক ইউনিয়ন ও পৌরসভা দিয়ে থাকে। তবে ট্রাফিকের নাম ব্যবহার করে কেউ চাঁদাবাজি করে তার বিরুদ্ধে আইান ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ট্রাফিক পুলিশ প্রতিদিনই রেজিস্ট্রেশনবিহীন সিএনজি আটক অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
