গত বছর দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৬ হাজার ৯১১টি। এতে নিহত হয়েছে ৬ হাজার ৫২৪ এবং আহত ১১ হাজার ৪০৭ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিহত হয়েছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়, যার সংখ্যা ২ হাজার ৪৮৭। এটা সড়ক দুর্ঘটনায় মোট নিহতের ৩৮ দশমিক ১২ শতাংশ। এই সময়ে রাজধানীতে ২৯৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৪৩ জন নিহত হয়েছে। যাদের মধ্যে শুধু পথচারীই ৪১ দশমিক ১৪ শতাংশ। গতকাল শনিবার রাজধানীর ধানম-িতে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘২০২৩ সালের সড়ক দুর্ঘটনার বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ ও পর্যালোচনা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
৯টি জাতীয় দৈনিক, ৭টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও নিজেদের তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর ১০৭টি নৌ-দুর্ঘটনায় ১৪৮ জন নিহত, ৭২ জন আহত এবং ৪৬ জন নিখোঁজ হয়। আর ২৮৭টি রেলপথ দুর্ঘটনায় ৩১৮ জন নিহত এবং ২৯৬ জন আহত হয়।
দুর্ঘটনায় যানবাহনভিত্তিক নিহতের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোটরসাইকেলচালক ও আরোহী নিহত হয়েছে ২ হাজার ৪৮৭ (৩৮ দশমিক ১২ শতাংশ), বাসযাত্রী ২৭৪ (৪ দশমিক ১৯ শতাংশ), ট্রাক-পিকআপ-কাভার্ড ভ্যান-ট্রাক্টর-ট্রলি-লরির আরোহী ৩৮৪ (৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ), প্রাইভেট কার-মাইক্রোবাস-অ্যাম্বুলেন্স-জিপের যাত্রী ২২৯ (৩ দশমিক ৫১ শতাংশ), থ্রি-হুইলারের যাত্রী (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান-মিশুক-টেম্পো-লেগুনা) ১ হাজার ২০৯ (১৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ), স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী (নসিমন-করিমন-ভটভটি-আলমসাধু-পাখিভ্যান-চান্দের গাড়ি-মাহিন্দ্র-টমটম) ২৯৬ (৪ দশমিক ৫৩ শতাংশ) এবং বাইসাইকেল-প্যাডেল রিকশা-রিকশাভ্যান আরোহী ১৯৩ জন (২ দশমিক ৯৫ শতাংশ) নিহত হয়েছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ বলছে, দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ২ হাজার ৩৭৩টি (৩৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ) জাতীয় মহাসড়কে, ২ হাজার ৮৮৭টি (৪১ দশমিক ৭৭ শতাংশ) আঞ্চলিক সড়কে, ৯৯৪টি (১৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ) গ্রামীণ সড়কে, ৫৮৩টি (৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ) শহরের সড়কে এবং অন্যান্য স্থানে ৭৪টি (১ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ) দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।
সড়ক দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের মধ্যে ট্রাক-পিকআপ-কাভার্ড ভ্যান-ড্রাম্প ট্রাক, ট্রাক্টর-ট্রলি-লরি তেলবাহী ট্যাংকার, বিদ্যুতের খুঁটিবাহী ট্রাক, সিটি করপোরেশনের ময়লাবাহী ট্রাক ২৭ দশমিক ৫৬, যাত্রীবাহী বাস ১৩ দশমিক ২২, মাইক্রোবাস-প্রাইভেট কার-অ্যাম্বুলেন্স, পাজেরো জিপ ৪ দশমিক ৮০, মোটরসাইকেল ২৩ দশমিক শূন্য ৪, থ্রি-হুইলার (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান-মিশুক-টেম্পো-লেগুনা ইত্যাদি) ১৭ দশমিক ২৫, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন (নসিমন-করিমন-ভটভটি-আলমসাধু-পাখিভ্যান-মাহিন্দ্র-টমটম-চান্দের গাড়ি) ৬ দশমিক ৩৬, বাইসাইকেল-প্যাডেল রিকশা-রিকশাভ্যান ৪ দশমিক ৬৭ এবং অজ্ঞাত যানবাহন ৩ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ।
সময় বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুর্ঘটনাগুলো ঘটেছে ভোরে ৩২১টি (৪ দশমিক ৬৪), সকালে ১ হাজার ৯৪৬টি (২৮ দশমিক ১৫), দুপুরে ১ হাজার ৫৭১টি (২২ দশমিক ৭৩), বিকেলে ১ হাজার ১১৩টি (১৬ দশমিক ১০), সন্ধ্যায় ৬১৮টি (৮ দশমিক ৯৪) এবং রাতে ১ হাজার ৩৪২টি (১৯ দশমিক ৪১ শতাংশ)।
দুর্ঘটনার বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকা বিভাগে দুর্ঘটনা ২৮ দশমিক ৪৬, প্রাণহানি ২৫ দশমিক ৯৬, রাজশাহী বিভাগে দুর্ঘটনা ১৩ দশমিক ৯০, প্রাণহানি ১৪ দশমিক ৩৬, চট্টগ্রাম বিভাগে দুর্ঘটনা ১৭ দশমিক ৮৮, প্রাণহানি ১৭ দশমিক ৯৩, খুলনা বিভাগে দুর্ঘটনা ১১ দশমিক ৫১, প্রাণহানি ১১ দশমিক ৯০, বরিশাল বিভাগে দুর্ঘটনা ৬ দশমিক ৩০, প্রাণহানি ৬ দশমিক ২৯, সিলেট বিভাগে দুর্ঘটনা ৫ দশমিক শূন্য ২, প্রাণহানি ৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ, রংপুর বিভাগে দুর্ঘটনা ৯ দশমিক ২৭, প্রাণহানি ৯ দশমিক ৪৮ এবং ময়মনসিংহ বিভাগে দুর্ঘটনা ৭ দশমিক ৬২, প্রাণহানি ৮ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ ঘটেছে।
ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে। এ বিভাগে ১ হাজার ৯৬৭টি দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৬৯৪ জন নিহত হয়েছে। সিলেট বিভাগে সবচেয়ে কম ৩৪৭টি দুর্ঘটনায় ৩৮৮ জন নিহত হয়েছেন।
রাজধানীতে ২৯৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৪৩ জন নিহত এবং ৩৩৬ জন আহত হয়েছে। এর মধ্যে পুরুষ ৮৩ দশমিক ১৬, নারী ১০ দশমিক ২০ এবং শিশু ৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ। নিহতদের মধ্যে পথচারী ৪১ দশমিক ১৪, মোটরসাইকেলচালক ও আরোহী ৩৬ দশমিক ৩৬ এবং বাস, রিকশা, সিএনজি ইত্যাদি যানবাহনের চালক ও আরোহী ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
রোড সেফটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, দুর্ঘটনাগুলো রাতে এবং সকালে বেশি ঘটেছে। বাইপাস রোড না থাকার কারণে রাত ১০টা থেকে ভোর পর্যন্ত রাজধানীতে মালবাহী ভারী যানবাহন বেপরোয়া গতিতে চলাচল করে। ফলে রাস্তা পারাপারে পথচারীরা বেশি নিহত হচ্ছে। এ ছাড়া দীর্ঘ সময় যানজটের কারণে যানবাহন চালকদের আচরণে অসহিষ্ণুতা ও ধৈর্যহানি ঘটছে, যা সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে কাজ করছে।
রাজধানীর দুর্ঘটনার সময় পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ভোরে ১০ দশমিক ৫২, সকালে ১৬ দশমিক ২৬, দুপুরে ১৩ দশমিক ৮৭, বিকেলে ১২ দশমিক ৪৪, সন্ধ্যায় ৬ দশমিক ৬৯ এবং রাতে ৪০ দশমিক ১৯ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
রাজধানীতে যানবাহনের তুলনায় অপ্রতুল সড়ক, একই সড়কে যান্ত্রিক-অযান্ত্রিক, স্বল্প ও দ্রুতগতির যানবাহনের চলাচল, ফুটপাত হকারের দখলে থাকা, ফুটওভার ব্রিজ যথাস্থানে নির্মাণ না হওয়া ও ব্যবহার উপযোগী না থাকা এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের মধ্যে অসচেতনতার কারণে অতিমাত্রায় দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটছে।
রেলক্রসিং দুর্ঘটনা : গত বছর ৮১টি রেলক্রসিং দুর্ঘটনায় ১০৭ জন নিহত এবং ৬৩ জন আহত হয়েছে। এ ছাড়া রেল ট্র্যাকে ট্রেনে কাটা পড়ে ২০৬টি দুর্ঘটনায় ২১১ জন নিহত হয়েছে (মোট ২৮৭টি রেলপথ দুর্ঘটনায় ৩১৮ জন নিহত ও ২৯৬ জন আহত হয়েছে)। সারা দেশের ৮২ শতাংশ রেলক্রসিং অরক্ষিত ও ঝুঁকিপূর্ণ।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার বিশ্লেষণ : ২০২৩ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে ২ হাজার ৫৩২টি, নিহত হয়েছে ২ হাজার ৪৮৭ এবং আহত হয়েছে ১ হাজার ৯৪৩ জন। নিহতদের মধ্যে ১ হাজার ৯০৯ জনের বয়স (৭৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ) ১৪ থেকে ৪৫ বছর। অন্য যানবাহনের সঙ্গে মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটেছে (৫৭২টি) ২২ দশমিক ৫৯, মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে (৯০৪টি) ৩৫ দশমিক ৭০, মোটরসাইকেলে ভারী যানবাহনের চাপা ও ধাক্কা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে (১ হাজার ২৫টি) ৪০ দশমিক ৪৮ এবং অন্যান্য কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে (৩১টি) ১ দশমিক ২২ শতাংশ। ৩৬ দশমিক ২১ শতাংশ (৯১৭টি) দুর্ঘটনার জন্য মোটরসাইকেলচালক এককভাবে দায়ী।
