মানবাধিকারের ধারণা ছাড়া আধুনিকতা অসম্পূর্ণ। আর এই ধারণাগুলো বিকশিত হয়েছে মানবাধিকার সম্পর্কিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই চুক্তিগুলো হয়েছে পৃথিবীতে নানা ধরনের ঐতিহাসিক বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে। তবে আজ পৃথিবীতে ক্ষমতার রাজনীতির পাল্লায় পরে পৃথিবী মানবাধিকারের ধারণা ও মূলনীতির ক্ষেত্রে বিস্মৃতিপ্রবণ প্রায়। অথচ পৃথিবীতে সর্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণার ৭৫ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে যার মূল বিষয় ছিল মানুষের অধিকারের সর্বজনীনতা। মানবাধিকারের সর্বজনীনতার ধারণা দিনে দিনে অবলোপ পাচ্ছে পাশাপাশি নতুন করে জায়গা করে নিচ্ছে এর কৌশলগত প্রয়োগ, যা আধুনিক পৃথিবীর বৈশিষ্ট্যটাকে ধীরে ধীরে ক্ষয়িক্ষু করে দিচ্ছে। মার্কিন সংবিধানের ১৪ নম্বর সংশোধনী অনুযায়ী আইনের কাছে সবাই সমান কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ক্ষমতা বলয় টিকিয়ে রাখতে সমতার এই নীতি আপেক্ষিক হয়ে উঠছে।
সম্প্রতি মানবাধিকারের সর্বজনীন ধারণা, না এর কৌশলগত প্রয়োগ এ নিয়ে বিতর্ক আবার সামনে উঠে এসেছে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে। গাজায় হামাস নির্মূলের নামে ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যার অভিযোগ করছে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহল। খোদ ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও এই সম্পর্কিত বিতর্ক বেশ আলোচনার জন্ম দিচ্ছে। এবার এ ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে মার্কিন সিনেটে। অনেকেই একে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে দেখছেন। ইসরায়েলে সামরিক সাহায্য প্রদানের আগে মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনার শর্ত জুড়ে দেওয়া সম্পর্কিত এক প্রস্তাব মার্কিন সিনেটে খারিজ হয়ে যায় গত সপ্তাহে, পক্ষে ১১ আর বিপক্ষে ৭২টি ভোটে। এই হেরে যাওয়ার পেছনে সরলীকৃত অর্থ হতে পারে দুটি। একটি হচ্ছে ইসরায়েলের ক্ষেত্রে মানবাধিকার প্রশ্নটি প্রযোজ্য না অথবা মানবাধিকারের বিষয়টি পরে দেখা যাবে যুদ্ধটা আগে শেষ করে নিই।
মার্কিন সিনেটে প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন প্রবীণ মার্কিন রাজনীতিবিদ, নাগরিক অধিকার আন্দোলনের অন্যতম কর্মী, বার্নি স্যান্ডার্স। সিনেটে উত্থাপিত প্রস্তাবনায় তিনি ইসরায়েলকে সামরিক সাহায্য প্রদানের আগে ইসরায়েল গাজায় মানবাধিকার ও এ সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক চুক্তিসমূহ লঙ্ঘন করছে কি না পর্যালোচনা করার শর্ত উল্লেখ করেন। বার্নি স্যান্ডার্স তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ বলেন, ‘এই সপ্তাহে, আমি সিনেটে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের সম্ভাব্য মানবাধিকার লঙ্ঘন তদন্ত করার একটি নজিরবিহীন ভোট আয়োজনে বাধ্য করেছি। যদিও আমরা এগারো ভোট পেয়েছি, কিন্তু হাল ছাড়ছি না। আমাদের অবশ্যই মানবতার সংকটকে বিবেচনায় নিতে হবে।’ বার্নি স্যান্ডার্স হচ্ছেন মার্কিন কংগ্রেশনাল ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করা স্বতন্ত্র সদস্য। যদিও তিনি ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কিছু সময়। ডেমোক্রেটিক দলের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রাইমারিতে হিলারি ক্লিনটনের কাছে হেরে যান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেছেন, যদিও বার্নি স্যান্ডার্সের এই প্রস্তাবনা খুব সহজেই ও বড় ব্যবধানে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে তারপর এর মাধ্যমে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ইসরায়েল সম্পর্কে অস্বস্তি বাড়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা যায়।
প্রস্তাবনাটি পাস হলে, ইসরায়েলের প্রতি শর্তহীন মার্কিন সাহায্য স্থগিত হয়ে যেতে পারত। গাজায় ইসরায়েলের মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবাদের অংশ ছিল এই উদ্যোগ। ফিলিস্তিনি সূত্র মতে, ইসরায়েলের নির্বিচারে হামলায় এ পর্যন্ত ২৬ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে যার বড় অংশ বেসামরিক জনগোষ্ঠী, নারী ও শিশু। ইসরায়েলের নির্বিচার বোমাবর্ষণ ও হামলার কারণে ২.৪ মিলিয়ন গাজাবাসী ফিলিস্তিনি আজ বাস্তুচ্যুত। মার্কিন প্রশাসন ও মূলধারার রাজনীতিবিদরা জানেন এই প্রস্তাবনা পাস হলে ইসরায়েল মানবাধিকারের মানদণ্ড কখনো অতিক্রম করতে পারবে না। ইসরায়েলের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে বার্নি স্যান্ডার্সও তার সমমনা রাজনীতিবিদদের এটা একটা প্রতীকী উদ্যোগ হলেও এটি মার্কিন নীতি ও রাজনীতির স্বরূপ সন্ধানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উদ্রেক করেছে। সিনেটে ভোটের আগে প্রস্তাবের পক্ষে স্যান্ডার্স তার বক্তব্যে বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে, মার্কিন সাহায্য, মানবাধিকার এবং আমাদের নিজস্ব আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হচ্ছে।’ তিনি বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর যুদ্ধের প্রভাব বন্ধে কোনো ভূমিকা পালন করতে না পারাকে মার্কিন সিনেটের ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছর ৩.৮ বিলিয়ন ডলার ইসরায়েলকে নিরাপত্তা সহযোগিতা দিয়ে থাকে, মার্কিন প্রশাসন অতিরিক্ত ১৪ বিলিয়ন ডলার সাহায্য প্রস্তাব করেছে, যার মধ্যে বিমান বাহিনীসহ শক্তিশালী টানেল বিধ্বংসী বোমাও অন্তর্ভুক্ত। ইসরায়েলের নির্বিচার এই বোমার আঘাতেই গাজায় মারা গেছে হাজার হাজার নারী ও শিশু। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কি এই দায় এড়ানোর সুযোগ আছে? সিনেটের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে আইনগতভাবে বাধ্যবাধকতা না থাকলেও নৈতিক দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। আর এর প্রভাবেই ফিলিস্তিনি ও সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের একটা প্রজন্ম বেড়ে উঠছে ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই অনাচার দেখে দেখে এবং এজন্য তারা সারা জীবনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কতটা ন্যায্যতার কাণ্ডারি হিসেবে দেখতে পারবে তা বলা মুশকিল।
১৯৬১ সালের মার্কিন বৈদেশিক সাহায্য আইন অনুযায়ী এই তহবিল দেখভালের দায়িত্ব মার্কিন কংগ্রেসের। সিনেটে উত্থাপিত এই প্রস্তাবে কংগ্রেস যাতে এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সম্পর্কিত চুক্তিগুলো বিবেচনার নেয় তা বলা হয়েছে। শুধু মার্কিন কংগ্রেস ও সিনেট না বর্তমান মার্কিন প্রশাসনও ইসরায়েলের গাজা অভিযানের ঘোরতর সমর্থক, এমনকি প্রথম প্রথম তারা গাজার সংঘটিত ইসরায়েলের ধ্বংসযজ্ঞ ও বেসামরিক জনগণের হত্যাযজ্ঞকে স্বীকারই করতে চায়নি। এই অবস্থায় এই প্রস্তাব ন্যূনতম একটা দৃষ্টান্ত তৈরি করল বটে। বলা বাহুল্য মানবাধিকারের প্রতি মার্কিন রাজনীতির এই অবস্থান শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে না, সারা পৃথিবীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৈতিক প্রভাব কিছুটা হলেও খর্ব হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছর বিশ্বের দেশগুলো মানবাধিকার পরিস্থিতি ও লঙ্ঘন নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যাতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানবাধিকার সম্পর্কিত পরিস্থিতি উঠে আসে, তার গ্রহণযোগ্যতা ও নৈতিক মানদণ্ড প্রশ্নের মুখোমুখি হবে। তবে দেখার বিষয় হবে, ২০২৪ সালে মার্কিন মানবাধিকার প্রতিবেদনে ইসরায়েলের মানবাধিকার প্রতিবেদনের কোন কোন বিষয়গুলো উঠে আসে? আদৌও উঠে আসে কি না?
ভোটের আগে বিলটি সম্পর্কিত এক প্রতিক্রিয়ায় স্যান্ডার্স বলেছেন, ‘৭ অক্টোবরের হামাসের সন্ত্রাসী আক্রমণের ঘটনা থেকে রক্ষা পেতে ইসরায়েলের সম্পূর্ণ অধিকার আছে, কোনো দ্বিধা নেই। কিন্তু সমগ্র ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার তার কোনো অধিকার নেই, তেমনি তাদের কোনো অধিকার নেই মার্কিন সামরিক সাহায্য ব্যবহার করার। আমার মতে এটাই এখন ঘটছে।’
এই পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন প্রগতিশীল রাজনীতিবিদরা যেমন রাশিদা তালেব, ইলহান ওমর, বারবারা লি এবং আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানাচ্ছেন। মার্কিন রাষ্ট্রপতির কাছে এক চিঠিতে, এই আইন প্রণেতারা ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে হাজারো শিশুর নিহত হওয়ার কথা বলেছেন। উল্টোদিকে ইসরায়েলি হামলার সমর্থনে মার্কিন নীতিনির্ধারকরা বলেছেন, হামাস গাজার স্কুল ও হাসপাতালকে সামরিকীকরণ করেছে, সেখান থেকেই তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। আর এটাই হচ্ছে ইসরায়েলি ভাষ্য, এই ভাষ্যের দোহাই দিয়েই তারা হাজার হাজার বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে হত্যা করার বৈধতা আদায় করতে চাচ্ছে। ইসরায়েলি এই অভিযোগ যদি সত্যও হয়, তবুও স্কুল ও হাসপাতালে বোমা মেরে নিরাপদ মানুষকে হত্যা করার কোনো অধিকার ইসরায়েলের নেই। যদিও এখন পর্যন্ত স্কুল ও হাসপাতালে হামাসের কমান্ড সেন্টার স্থাপনের সপক্ষে কোনো শক্তিশালী প্রমাণ ইসরায়েল হাজির করতে পারেনি। এমনকি এই অভিযোগে ইসরায়েলিরা গাজার প্রধান হাসপাতাল আল-শিফায় অভিযান পরিচালনা করে।
মূলত ইসরায়েলিরা ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূখণ্ডে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের বিরোধী এবং এখন তারা চাচ্ছে গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরাসরি উচ্ছেদ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলেছে। কিন্তু তার পরম মিত্র বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু কোনো ভাবেই ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের আন্তর্জাতিক অধিকারের স্বীকৃত দিতে সম্মত নয়। সেটাই তার মূল রাজনীতি। আর সেই নেতানিয়াহুর এজেন্ডা বাস্তবায়নে ইসরায়েলে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহযোগিতা দিয়ে মার্কিন প্রশাসন কী উদ্দেশ্য অর্জন করতে চায়?
তারপরও সিনেটের ভোটে হারার পর বার্নি স্যান্ডার্সকে সমর্থনকারী সংগঠনগুলো একে বিজয় হিসেবেই দেখছে। ‘কয়েক দশক ধরে চলে আসা সিনেটের স্থবিরতা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর জন্য শতভাগ সময়ে, শতভাগ সিনেট সদস্য, শতভাগ সমর্থন দিয়ে আসছে’ এমনটাই অভিব্যক্তি ব্যক্ত করেছেন স্যান্ডার্সকে সমর্থনকারী একটি সংগঠন ‘ননভিজিবল’-এর এক পরিচালক এন্ড্রু ওনেল। এখন প্রশ্ন হচ্ছে স্যান্ডার্সের এই উদ্যোগের পরাজয়ের ফলে কার পরাজয় হলো বার্নি স্যান্ডার্স, ফিলিস্তিন, নাকি মানবাধিকারের? আর বিজয় হলো কার মার্কিন রাজনীতি, ইসরায়েল, নাকি যুদ্ধের? এই উদ্যোগের মাধ্যমে সেই প্রশ্নই হয়তো আরও জোরদার হলো।
লেখক : উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট
