চিকিৎসা জোটে না প্রবাসে

আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২:৪৭ পিএম

গাজীপুর কালীগঞ্জ উপজেলার মোক্তারপুর গ্রামের দেলোয়ার হোসেন সুস্থ শরীরে দুবাই গিয়েছিলেন ভাগ্য বদলের আশায়। সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। হঠাৎ অসুস্থতা বোধ করলে দুবাইয়ের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যান। সেখানে পরীক্ষা করাতে গিয়ে জানতে পারে হিউম্যান ইমিউনো ডেফিশিয়েন্সি ভাইরাস (এইচআইভিতে) আক্রান্ত তিনি। বিষয়টি জানার পর ভেবেছিলেন তার প্রতিষ্ঠান তাকে চিকিৎসায় সহায়তা করবে।

অসুস্থতার বিষয়টি কিছুদিন গোপন রেখে নিজের খরচে চিকিৎসা চালিয়ে যান। একপর্যায়ে অবস্থার অবনতি হতে থাকলে নিজের কর্মস্থলের প্রধানের শরণাপন্ন হন। বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গে তাকে দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করে কর্তৃপক্ষ। চিকিৎসা দায়ভার না নিয়ে উল্টো তাকে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

দেশে ফিরে আসার পর বিদেশে উপার্জিত টাকা দিয়ে চিকিৎসা শুরু করেন দেলোয়ার। দেশের প্রথম সারির হাসপাতালে চিকিৎসা নিলেও তার অবস্থার উন্নতি হয়নি। তিন মাস এভাবে চিকিৎসা নেওয়ার পর জমানো টাকাও শেষ হয়ে যায়। নিঃস্ব হয়ে একসময় চিকিৎসা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। পরে বিনা চিকিৎসায় তার মৃত্যু হয়। অথচ প্রবাসী হয়ে তিনি দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে ভূমিকা রেখেছিলেন।

এভাবে প্রতিবছর দেশের অনেক রেমিট্যান্স যোদ্ধা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে দেশে ফিরছেন। কেউবা ফিরছেন লাশ হয়ে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্যমতে, গত বছর ৪৫৭ জন শ্রমিক দুর্ঘটনা ও অসুস্থতা নিয়ে দেশে ফিরেছেন। তার আগের বছর ২০২২ সালে ২৩১, ২০২১ সালে ২৪৭, ২০২০ সালে ২৩১ এবং ২০১৯ সালে ৩১০ জন শ্রমিক দেশে ফিরে আসেন। আর ২০১০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দুর্ঘটনা ও মরণব্যাধি নিয়ে দেশে ফিরে আসেন ৩১১ শ্রমিক। আর গত ১৩ বছরে অসুস্থতা নিয়ে দেশে ফিরেছেন ১ হাজার ৯৩৯ জন শ্রমিক।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের সহকারী পরিচালক দেবব্রত ঘোষ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতি মাসে ২০ জনের মতো শ্রমিক অসুস্থতা নিয়ে দেশে ফিরে আসেন। তাদের মধ্যে অনেকে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার শিকার হন। এ ছাড়া স্ট্রোক, ক্যানসার, এইচআইভি আক্রান্ত হয়ে ও মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে অনেকে দেশে ফিরে আসেন।’ তিনি বলেন, ‘এরকম সমস্যা প্রতি মাসে আমরা পেয়ে থাকি। ভুক্তভোগী শ্রমিকদের তাৎক্ষণিক প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হয়। গত মাসে এরকম ৬৬ জন অসহায় কর্মী মধ্যে আমরা অর্থ বিতরণ করেছি।’

দেবব্রত ঘোষ জানান, প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০টি মরদেহ আসে। মৃতদের সঙ্গে আসা নথিপত্র অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি প্রবাসী মারা যান মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত (ব্রেন স্ট্রোক) কারণে। এদের একটা বড় অংশই মধ্যবয়সী কিংবা তরুণ। এ ছাড়া হৃদরোগসহ বিভিন্ন ধরনের অসুস্থতা, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, সড়ক দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা কিংবা প্রতিপক্ষের হাতেও খুন হন বাংলাদেশিরা।

তবে তরুণ কিংবা মধ্যবয়সে কেন এত বিপুলসংখ্যক প্রবাসী স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হন সে বিষয়ে রাষ্ট্রীয় কোনো অনুসন্ধান নেই। প্রবাসী বাংলাদেশি, মৃতদের স্বজন ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য মূলত মরু আবহাওয়ার দেশ। প্রচন্ড গরমে প্রতিকূল পরিবেশে অদক্ষ এ বাংলাদেশিরা ঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন কাজে যুক্ত থাকেন। একদিকে প্রতিকূল পরিবেশ, আরেকদিকে অমানুষিক পরিশ্রম, ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গাদাগাদি করে থাকা, দীর্ঘদিন স্বজনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা এবং সব মিলিয়ে মানসিক চাপের কারণেই সাধারণত স্ট্রোক বা হৃদরাগের মতো ঘটনা ঘটে।

৩০ বছর বয়সে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান ঢাকার ডেমরা এলাকার ইসমাইল আলী। শ্রমিক হিসেবে একটি কারখানায় কাজ করেন ২০ বছর। গত ৩১ জানুয়ারি দেশে ফিরেছেন ইসমাইল। তবে হুইলচেয়ারে বসে। ২০ বছর প্রবাস জীবন কাটানোর পর এখন তার চোখেমুখে শুধুই হতাশা। এক বছর আগে কাজ করার সময় হঠাৎ বুকে ব্যথা শুরু হয় ইসমাইলের। অন্য শ্রমিকরা হাসপাতালে নিয়ে গেলে সে যাত্রায় রক্ষা পান। এরপর জমানো টাকায় চিকিৎসা শুরু করেন। কিন্তু আবারও তাকে হাসপাতালে যেতে হয়। তখন ডাক্তার জানান, তার ব্রেন স্ট্রোক হয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থায় তার শরীরের একপাশ প্যারালাইজড হয়ে যায়। কিছুদিন পর সুস্থ হয়ে স্থানীয় বাড়িতে ফেরেন। সেখানে পাঁচ মাস ঘরবন্দি অবস্থায় কাটে তার জীবন। অসুস্থতার কারণে চাকরিও হারান। ধীরে ধীরে এ রেমিট্যান্স যোদ্ধাকে ছেড়ে যায় সবাই। এরপর নিঃস্ব হয়ে চিকিৎসা ছাড়াই বাড়িওয়ালার সহযোগিতায় দেশে ফিরে আসেন।

বাড়িতে আত্মীয়স্বজন না থাকায় ঠাঁই হয়েছে আশকোনার ব্র্যাক লার্নিং সেন্টারে। তিনি জীবনের শেষ সময়ে ভালো একটি বৃদ্ধাশ্রমে থাকার আকুতি জানিয়েছেন। তার মতো অনেক শ্রমিক স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, হৃদরোগসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে এবং কেউ কেউ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে প্রতিনিয়ত দেশে ফিরছেন।

অসুস্থ ও লাশ হয়ে যারা দেশে ফিরে আসেন তাদের নিয়ে কাজ করেন রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু)। প্রতিষ্ঠানটির এক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রবাসীকর্মীদের কর্মক্ষেত্র ও থাকার জায়গার অস্বাস্থ্যকর অবস্থা, পরিবেশ, উচ্চতাপ ও আর্দ্রতা, দূষণ, অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করার কারণে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে থাকেন। এর পাশাপাশি নারীরা যৌন নির্যাতনের শঙ্কার মধ্যে থাকেন। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে চিকিৎসা ব্যয় বেশি, ফলে স্বল্প আয়ের কর্মীরা খরচ মেটাতে পারেন না।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ৪ হাজার ৫৫২, ২০২২ সালে ৩ হাজার ৯০৪, ২০২১ সালে ৩ হাজার ৮১৮, ২০২০ সালে ৩ হাজার ১৯ ও ২০১৯ সালে ৪ হাজার ৩৪ জনÑ অর্থাৎ ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১৯ হাজার ৩২৭ জন প্রবাসীর মরদেহ দেশে এসেছে।

প্রবাসীদের মরদেহের সঙ্গে যে নথিপত্র আসে সে অনুযায়ী মৃত্যুর কারণ লিখে রাখা হয় বিমানবন্দরের প্রবাসীকল্যাণ ডেস্কে। কীভাবে এত প্রবাসী মারা যাচ্ছে সেটা বোঝার জন্য যে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে আসা ৩০৭ জন প্রবাসীর মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ করেন তারা এতে দেখা যায়, ১৭৬ জনই (৫৬ শতাংশ) মারা গেছেন স্ট্রোকে যারা তরুণ কিংবা মধ্যবয়সী। এরপর ৬২ জনের (২০ শতাংশ) মৃত্যুর কারণ হৃদরোগে আক্রান্ত বা স্বাভাবিক মৃত্যু। কর্মক্ষেত্রে বা বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৫৭ জন (১৮ শতাংশ)। সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ১২ জন (৪ শতাংশ)। আত্মহত্যা করেছেন ৩ জন। বাকি ২ জন খুন হয়েছেন। শুধু এক মাস নয়, গত ১৪ বছরের বিভিন্ন সময়ের মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কারণগুলো একইরকম।

অভিবাসনবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রামরুর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সি আর আবরার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রেমিট্যান্সের বড় অংশই প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান। কিন্তু তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে কর্মস্থলে স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, স্বাস্থ্যবীমাসহ কোনো বিষয়ই ন্যূনতম সেবা নিশ্চিত করা যায়নি। এসব বিষয়ে এখনো স্বচ্ছতা আনা সম্ভব হয়নি। এক কাজের কথা বলে আরেক কাজ করানো, চুক্তি অনুযায়ী বেতনভাতা পরিশোধ না করা, অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ শ্রমিকদের অনেক দিনের।’

তিনি বলেন, প্রবাসীদেরও স্বাস্থ্যবীমার ব্যবস্থা করা জরুরি। যাতে অসুস্থতা নিয়ে দেশে ফিরলেও তারা স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করতে পারেন। প্রবাসীকল্যাণ ডেস্ক থেকে কিছু সহযোগিতা করা হয়, তা অপ্রতুল। সরকারকে এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত