১১৩ হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে অনুমোদনহীন ৮১

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১:০৩ এএম

ফেনী জেলার অলিগলিতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। শুধু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে অনুমোদনের আবেদন করেই অনেক প্রতিষ্ঠান জটিল অস্ত্রোপচার করছে। এসব হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে একদিকে যেমন রোগীরা প্রতারিত হচ্ছেন, তেমনি ভুল চিকিৎসায় ঘটছে রোগীর মৃত্যুর ঘটনা।

অভিযোগ রয়েছে, কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে এসব অনুমোদনহীন হাসপাতাল চলছে বছরের পর বছর ধরে। তবে স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, অনুমোদনহীন হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধের ব্যাপারে তারা সজাগ।

গত মঙ্গলবার (৬ ফেব্রুয়ারি) নিবন্ধন ও লাইসেন্স না থাকায় ফেনীর দুইটি হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে, শহরের মুক্তবাজার বায়েজীদ সাইকিয়াট্রিস হাসপাতাল এবং ছাগলনাইয়া চক্ষু হাসপাতাল। গত শুক্রবার (৯ ফেব্রুয়ারি) ফেনীর সিভিল সার্জন ডা. শিহাব উদ্দিন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে নিবন্ধন ও লাইসেন্স না থাকায় ১০ কর্মদিবসের মধ্যে হাসপাতালগুলোর কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়।

ফেনীর ১১৩টি হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে ৮১টির স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেই ও ৬০টির নেই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র। মেয়াদোত্তীর্ণ ২৫টি প্রতিষ্ঠান ছাড়পত্রের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রতিষ্ঠান চালু করতে বিষয়টি বাধ্যতামূলক হলেও তোয়াক্কা করছেন না কেউ। নিয়মনীতির তোয়াক্কা ও অনুমোদন ছাড়াই একের পর এক গড়ে উঠছে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার।

অন্যদিকে মেয়াদোত্তীর্ণ এ সব হাসপাতাল ও ক্লিনিকের অনুমোদন (লাইসেন্স) না থাকলেও এসব প্রতিষ্ঠানে মানা হচ্ছে না কোনো আইন। আবার চিকিৎসার নামে কোনো কোনো হাসপাতাল, ক্লিনিকে রোগী ও স্বজনদের জিম্মি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

ফেনী সিভিল সার্জন অফিস সূত্র জানায়, ফেনীতে ৫১টি হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ১১টি হাসপাতালের অনুমোদন (লাইসেন্স) রয়েছে ও ৬২টি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে ১৯টির লাইসেন্স আপডেট রয়েছে। ২৫টি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স নবায়নের অপেক্ষামান রয়েছে। আবেদন পড়ে আছে আরও ২৭টি হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের। স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রী সামন্ত লাল সেন অবৈধভাবে পরিচালিত হাসপাতাল ও ক্লিনিক চলতে দেওয়া হবে না বলে ঘোষণা দেওয়ার পর তড়িঘড়ি করে হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো অনলাইলে আবেদন করে। যারা গত ৫-৬ বছর লাইসেন্স নবায়ন করেন নাই তারাও আবেদন করেছে নবায়নের জন্য। লাইসেন্স নবায়নের শর্তাবলী পরিপূর্ণ না থাকায় প্রায় ৪০টি হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টার লাইসেন্স নবায়নের জন্য আবেদন করেনি। প্রায় ৫০টি হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টার অনলাইনে আবেদন করলেও লাইসেন্স নবায়নের শর্তাবলী কাগজপত্রে ত্রুটি থাকায় অর্ধেকের নবায়ন হবে না বলে জানিয়েছে সিভিল সার্জন অফিস।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে সম্প্রতি এমন কিছু ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিদর্শনের জন্য সিভিল সার্জনের কার্যালয়ে চিঠি এসেছে। কিন্তু সময় ও জনবল সংকটে শতভাগ পরিদর্শন শেষ করা যায়নি।

সিভিল সার্জন অফিস তথ্য মতে, ২০১৭-১৮ সালে নবায়ন শেষ হয়েছে ৮টি, ২০১৮-১৯ সালে নবায়ন শেষ হয়েছে ৮টি, ২০১৯-২০ সালে নবায়ন শেষ হয়েছে ১১টি ২০২০-২১ সালে নবায়ন শেষ হয়েছে ১৫টি, ২০২১-২২ সালে নবায়ন শেষ হয়েছে ১২টি, ২০২২-২৩ সালে নবায়ন শেষ হয়েছে ১৮টি হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টার।

২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ সালে নবায়ন শেষ হওয়া ফেনীর নামকরা হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর মধ্যে রয়েছে ফেনী ডায়াবেটিক হাসপাতাল, ফেনী হার্ট ফাউন্ডেশন এন্ড রিসার্চ সেন্টার, ফেনী প্রাইভেট হাসপাতাল, ডক্টরস ল্যাব এন্ড শাহিন ক্লিনিক, আল আহাদ চক্ষু হাসপাতাল, বায়েজিদ হেলথ কেয়ার, শতাব্দী ডায়গনস্টিক সেন্টার, জনতা ক্লিনিক, সোনালী ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও মেডিনোভা ডায়াগনস্টিক সেন্টার সহ উপজেলা শহরের কয়েকটি হাসপাতাল—ডায়াগনস্টিক সেন্টার। দীর্ঘ ৫—৬ বছর লাইসেন্স নবায়ন না করেই ব্যবসা চালিয়ে যাচেছন এসব প্রতিষ্ঠান।

সরেজমিন কয়েকটি হাসপাতাল-ক্লিনিকে গিযে দেখা যায়, হাসপাতাল-ক্লিনিক করার জন্য যেসব যন্ত্রপাতি ও জনবল থাকতে হয়, তার বিন্দুমাত্র নেই এসব হাসপাতাল-ক্লিনিকে। ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা এসব হাসপাতাল-ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসক-নার্স-টেকনোলজিস্ট তো দূরের কথা, ভুয়া ডিগ্রির লোকজন দিয়ে অবাধে চলছে। অনেক বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকের পরিবেশ অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন। অপারেশনের প্রয়োজন নেই, তারপরও অপারেশন করা হয়। টাকা নেওয়া হয় দ্বিগুণ।

ফেনীর টাংক রোড়স্থ বায়েজিদ হেলথ কেয়ার এর মালিক ডা. তাবারক উল্লা বায়েজিদ বলেন, আমরা প্রতি বছরই ডিজি অফিসে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করি। সিভিল সার্জন অফিস থেকে পরিদর্শন করা হলেও আর লাইসেন্স হাতে আসে না।

ফেনী জেলা সিভিল সার্জন ডা. শিহাব উদ্দিন বলেন, হাসপাতাল ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো অনলাইনে আবেদন করলে কাগজপত্র ঠিক থাকলে ডিজি অফিস থেকে আমাদের ভিজিট করতে বলা হয়। আমরা এক মাসের মধ্যে ভিজিট করে তার রিপোর্ট জমা দেই। কারও যদি কোনো লাইসেন্স নবায়নের শর্তাবলী পরিপূর্ণ না থাকে সেক্ষেত্রে সেগুলা কমপ্লিট হওয়া করার জন্য আমরা বলে থাকি। হাসপাতাল—-নিক মালিক আবেদন করলেই হবে না, নবায়নের শর্তাবলী ঠিক থাকলে, কাগজপত্র ত্রুটি না থাকলে ছাড়পত্র পাওয়া যাবে। যেসব হাসপাতাল ক্লিনিকের ছাড়পত্র নবায়ন নেই সেগুলোকে আমরা নোটিশ করেছি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত