চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার পূর্ব কলাউজানের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সামাদ। চাষাবাদ করেই জীবিকা নির্বাহ। একটি টিনের ঘরে পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। স্বপ্ন ছিল একটি বাড়ি করার। সরকার থেকেও একটি বাড়ি উপহারও পেয়েছিলেন। কিন্তু একজন মুক্তিযোদ্ধার স্থানগত জটিলতার কারণে জীবিত অবস্থায় আর বাড়িটি দেখে যেতে পারেননি। ইউএনও কার্যালয়ে একাধিকবার যোগাযোগ করার পরেও এখনও বিষয়টি সুরাহা হয়নি। মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সামাদ গত দেড় বছর পূর্বে মারা যান।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায় তিন মুক্তিযোদ্ধা যথাক্রমে আব্দুস সামাদ, হৃদয় মোহন নাথ, বজল আহমদ এবং একজন বীরাঙ্গনা রত্না চক্রবর্তীর জন্য চারটি বীর নিবাস তৈরির সরকারি বরাদ্দ অনুমোদন হয়। কিন্তু বীরাঙ্গনা রত্না চক্রবর্তীর বীর নিবাস নির্মাণের জন্য স্থান জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন যাবৎ তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। এসব মুক্তিযোদ্ধা অথবা তাদের পরিবার প্রতিনিয়ত স্থানীয় ইউএনও কার্যালয়ে ধরনা দিলেও গত দুই বছরে এ প্রকল্পে কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
লোহাগাড়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মোহাম্মদ মাহাবুব আলম শাওন ভূইয়া বলেন, অসচ্ছল বীর মুক্তিযোদ্ধা আবাসন নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ চারটি বীর নিবাস নির্মাণের জন্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলেও বীরাঙ্গনা রত্না চক্রবর্তীর নামে বরাদ্দকৃত বীর নিবাসটির স্থান জটিলতার কারণে এ সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। বীরাঙ্গনা রত্না চক্রবর্তী একসময় লোহাগাড়া উপজেলা গেজেটভুক্ত হলেও সম্প্রতি প্রকাশিত মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বিত তালিকায় তার নাম চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হয়। যেহেতু রত্না চক্রবর্তী সাতকানিয়ার গেজেটভূক্ত সেই কারণে তার বীর নিবাসটি করতে হবে সাতকানিয়া উপজেলায়। এ ব্যাপারে ২০২৩ সালে এপ্রিল মাসে বীরাঙ্গনা রত্না চক্রবর্তীর বীর নিবাসের বরাদ্দ সাতকানিয়া উপজেলায় স্থানান্তরের জন্য চিঠি প্রেরণ করা হয়েছে। তবে এখনও মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে সিদ্ধান্ত না আসায় চারজনের বরাদ্দকৃত বীর নিবাসের টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যাচ্ছে না।
মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সামাদের স্ত্রী রাশেদা বেগম বলেন, সরকার থেকে একটি ঘর পেয়ে আমার স্বামী খুব খুশি হয়েছিল। লোহাগাড়া উপজেলা ইউএনও অফিসে অনেকবার যাওয়া-আসা করেছে। আশা ছিল পাকা বাড়িতে অন্তত একটি রাত কাটাবেন। সে আশা আর পূরণ হলো না। গত দেড় বছর পূর্বে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা গেলেন। এখন আমরা যোগাযোগ করেও কিছুই করতে পারছি না।
বীরাঙ্গনা রত্না চক্রবর্তী বলেন, আমার শ্বশুরবাড়ি সাতকানিয়া উপজেলায়। সেখানে আমার জায়গা রয়েছে। কিন্তু ঘর নেই। আমাকে ভুলক্রমে লোহাগাড়া উপজেলায় বাড়ি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত কমপক্ষে ৮-১০বার ইউএনও কার্যালয়ে গিয়েছি। একবার সাতকানিয়া, আবার লোহাগাড়া উপজেলায় যাই। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। জানি না মৃত্যুর আগে বাড়িটি দেখে যেতে পারব কি-না?
মুক্তিযোদ্ধা হৃদয় মোহন নাথের স্ত্রী শান্তি বালা নাথ জানান, অনেকবার উপজেলা প্রশাসনের দুয়ারে ঘুরেছি। কিন্তু ঘর পাইনি।
লোহাগাড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আখতার আহমদ সিকদার বলেন, যে ঘরগুলো চারজন মুক্তিযোদ্ধা পরিবারকে দেওয়া হয়েছে তারা অত্যন্ত দরিদ্র। বাড়িগুলো তাদের খুব প্রয়োজন। অথচ বরাদ্দ দেওয়ার সময় একজন বীরাঙ্গনার স্থানগত জটিলতার কারণে কেউই বাড়িগুলো পাচ্ছে না। কেউ কেউ মরেও গেছেন। বিষয়টি দ্রুত সুরাহার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের নিকট জোর দাবি জানাচ্ছি।
লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইনামুল হাসান দেশ রূপান্তরকে জানান, বিষয়টি দুঃখজনক। ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি বীরাঙ্গনা রত্না চক্রবর্তীর বীর নিবাসটি সাতকানিয়া উপজেলায় স্থানান্তরের জন্য। আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে বাড়িগুলো যেন উনারা দ্রুত সময়ে পান।
