‘১৫-১৬ ঘণ্টা না খেয়ে পড়েছি, তবু হাল ছাড়িনি’

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৮:০০ পিএম

‘স্বপ্ন সেটা নয় যেটা মানুষ ঘুমিয়ে দেখে, স্বপ্ন সেটাই যেটা পূরণের প্রত্যাশা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না।’ ভারতের বিশিষ্ট বিজ্ঞানী এবং দেশটির সাবেক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালামের বিখ্যাত উক্তি এটি। সরকারি চাকরি প্রত্যাশীদের কাছে উক্তিটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে বিসিএস প্রত্যাশীদের কাছে। বিজ্ঞানী আবদুল কালামের উক্তিটির মতই অভাবকে সঙ্গী করে স্বপ্নের পিছনে ছুটেছেন অভিজিৎ বিশ্বাস।

চরম দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করেও যিনি বিসিএস নামক কঠিন যুদ্ধে উত্তীর্ণ হয়েছেন। অভিজিৎ কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। ৪৩তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফলে সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। অভিজিৎ বিশ্বাস নড়াইল সদর উপজেলার টেপারি গ্রামের অমল বিশ্বাসের ছেলে।

অভিজিৎ বিশ্বাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ছোট বেলায় গ্রামের ব্রাক স্কুল থেকে মাধ্যমিক শেষ করি। বাড়ির জায়গাটুকু ছাড়া আমাদের অতিরিক্ত কোন জমি ছিল না। আমি যখন হাইস্কুলে পড়ি তখন বাবা অসুস্থ হয়। আমাদের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বলে শুধু তিনিই ছিলেন। তার অসুস্থতার সময় সংসার চালাতে মা অন্যের কৃষি জমিতে কাজ করতো। তখন থেকেই অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হয় আমার। 

প্রাথমিকের গণ্ডি শেষ হলে বাবা আমাকে তুলারামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করান। সেখানে যাওয়ার পর আমার পড়ালেখায় পরিবর্তন আসে। এ স্কুলের শিক্ষার্থীরা পড়ালেখায় ও পোশাকে আমার থেকে অনেক এগিয়ে ছিলো। এজন্য ক্লাসে সবার পিছনে বসতাম। তখন ক্ষুদার্থ পেটে স্কুল থেকে বাড়িতে ফিরে দেখতাম চাল নেই। অন্যের বাড়ি থেকে চাল ধার করে মা রান্না করতো। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলে দুপুর ও রাতের খাবার একসঙ্গে খেতাম। তখন থেকে স্বপ্ন দেখতাম ভালো কিছু করার। ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময় পরীক্ষার ‘ফি’ দিতে না পারায় প্রথমদিকে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারিনি। পরে স্যারদের সহযোগিতায় পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ভালো ফলাফল করি। তখন থেকে স্যাররাই আমাকে সহযোগিতা করতেন। এভাবে এসএসসি পাশ করি।

তারপর ভাঙ্গুড়া আদর্শ মহাবিদ্যালয় থেকে ২০১০ সালে এইচএসসি পাশ করি। তখন অন্যের বই পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছি। নিজের চেষ্টায় কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে ভর্তির সুযোগ পাই। ভর্তির পর দেখেছি অভাবে কাকে বলে। বাড়ি থেকে বাবা-মা কষ্ট করে কিছু টাকা পাঠাতেন। তা দিয়ে কোনরকম জীবন চলতো। দিনের পর দিন না খেয়ে থেকেছি। তবুও হাল ছাড়ি নাই। এভাবে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করে ঢাকায় যাই।

ঢাকায় আসার পর জীবন য্দ্ধুকে উপলদ্ধি করতে পেরেছি। ২০১৭ সালে আমি সরকারি চাকরি জন্য প্রস্তুতি শুরু করি। টিউশনি করে কোনমতে জীবন চালাতাম। টিউশনি থেকে যে টাকা আসতো তা বাড়ি ভাড়া ও অন্যান্য বিল দিতেই শেষ হয়ে যেত। এক সময় আর্থিক সংকট আরও প্রকট হয়। এজন্য ১৫/১৬ ঘণ্টা না খেয়েই পড়ালেখা করতাম। বিভিন্ন পরীক্ষায় আবেদন করার পর আর টাকা থাকতো না। তাই বাড়তি খরচ বলে আমার কিছু ছিল না। পরীক্ষার দিন কেন্দ্রে যাওয়ার মতো টাকা থাকতো না।

তিনি আরও বলেন, আমার মনে আছে বিসিএস পরীক্ষার সময় সকালে কিছু খেয়ে যাবো এমন টাকাও কাছে ছিল না।  এজন্য রাতে ভাতে পানি দিয়ে রাখতাম, সকালে তা খেয়ে পরীক্ষা দিতে যেতাম। এভাবে আমি বিসিএস লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিয়েছি। 

আমি ১৫টি ভাইভায় ফেল করেছি। ১৬তম ভাইভায় গিয়ে আমি প্রথম সাফল্য পেয়েছি। গত ২০ আগষ্ট রেলের ট্রেন পরিচালক পদে আমার প্রথম চাকরি হয়। তখন একটু হালে পানি পাই। এর পরেই প্রাথমিকে সহকারী শিক্ষক পদে চাকরি হয়। তারপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি। পর্যায়ক্রমে খাদ্য অধিদপ্তরে উপখাদ্য পরিদর্শক হিসেবে চাকরির সুযোগ পাই। এরপর আমার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বিসিএস ক্যাডার হওয়ার ইচ্ছে পূরণ হয়। ৪৩তম বিসিএসে আমি শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি। বাবা-মায়ের অদম্য ইচ্ছেশক্তি আমাকে এতদূর নিয়ে এসেছে।

তরুণদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, জীবনে হতাশা বলে কিছু নেই। হতাশা থাকলেও তা কাটিয়ে ওঠার জন্য চেষ্টা করতে হবে। নিজের জন্য না হলেও বাবা-মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে লড়ে যেতে হবে। তাহলে জীবনে অন্য চিন্তা আসবে না। আর বিসিএস জার্নিতে ধৈর্য রাখতে হবে।আমিও প্রথম লিখিত পরীক্ষায় ফেল করি। তারপর দুর্বল জায়গাগুলো খুঁজে বের করে প্রস্তুতি নিয়েছি। বিশেষ করে সময়ানুবর্তিতা থাকতে হবে। তাহলে সফলতা অর্জন সম্ভব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত