ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্য আসামের রাজনীতিতে ক্রমে ক্রমে শক্তি হারাচ্ছে কংগ্রেস। রাজ্যটিতে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ^শর্মা একজন সাবেক কংগ্রেসি রাজনীতিক। রাজ্যটির ভোটারদের একটি বড় অংশ মুসলিম জনগোষ্ঠী যাদের ‘বাংলাদেশি’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার রাজনীতি বিজেপির হাত ধরে এখনো আরও শানিত। মুসলিমদের নেতা হিসেবে বদরুদ্দিন আজমল সেখানে ক্রমে ক্রমে জায়গা শক্ত করছেন। কংগ্রেসের সঙ্গে তার বিরোধ এখন তুঙ্গে।
সর্বশেষ আসাম রাজ্যে কংগ্রেসের দুই বিধায়ক বিজেপির নেতৃত্বাধীন সরকারকে সমর্থনের কথা ঘোষণা করেছে। এই কথা জানিয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ^শর্মা নিজে। কংগ্রেসের ওই দুই বিধায়ক হলেন কমলাক্ষী দে পুরকায়স্থ ও বসন্ত দাস। গত বুধবার তারা দুজন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। কমলাক্ষী করিমগঞ্জ উত্তর এবং বসন্ত দাস মঙ্গলদই এলাকার বিধায়ক।
এদিকে ওই বিধায়কের সঙ্গে কংগ্রেসের দূরত্ব বৃদ্ধিরও বেশ আগে আগে থেকে শোনা যাচ্ছিল, কংগ্রেসের পাঁচজন মুসলিম বিধায়ক আসামভিত্তিক আঞ্চলিক দল অসম গণপরিষদে (এজিপি) যোগদান করতে পারেন। তবে এই পাঁচ মুসলিম বিধায়কের পরিচয় এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। তবে সামাগুড়ি অঞ্চলের বিধায়ক রাকিবুল হুসেইন যে কংগ্রেস ত্যাগ করতে পারেন, তা নিয়ে বেশ জোরালো গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। ওই পাঁচ বিধায়ক তারই অনুসারী। রাকিবুল লোকসভায় দলের প্রার্থী হতে ইচ্ছুক। আজ মঙ্গলবার আসামে লোকসভা আসনগুলোতে কংগ্রেসের সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে। এর পরই ওইসব বিধায়কের দল ত্যাগের ঘটনা পরিষ্কার হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত একসঙ্গে এত নেতা ও বিধায়ক যোগ দিতে পারে এজিপিতে যাদের সমর্থন নিয়ে রাজ্যে সরকার পরিচালনা করছে বিজেপি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলতে গত শনিবার রাজধানী দিল্লিতে গেছেন রাজ্য কংগ্রেসের সভাপতি ভুপেন বোরা।
আসাম কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ এক নেতা নিশ্চিত করেন, রাজ্যে দলের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলতে গেছেন ভুপেন বোরা।
আসামের রাজনীতিতে অহমীয় এবং বাঙালি বিভাজনের ইতিহাস প্রকট। এখানে মুসলিম বাঙালিদের মধ্যে কংগ্রেসের জনসমর্থন আগে থেকেই শক্ত ছিল। একইভাবে এজিপিও ধর্মনিরপেক্ষ ভাবধারার। বরাক উপত্যকা এবং লোয়ার আসামে এজিপির সমর্থন রয়েছে। ওইসব এলাকায় তাদের সমর্থন বিজেপির দিকে গেলে কংগ্রেস নেতারা নির্বাচনে পরাজিত হতে পারেন। সেই সমীকরণ থেকে অনেক কংগ্রেস নেতা দলবদলে এজিপিতে যোগ দিচ্ছেন বলে মনে করা হচ্ছে। তবে রাজ্যে গত দশকের শুরু থেকে অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এআইইউডিএফ) নেতা বদরুদ্দিন আজমল বেশ শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন ব্রহ্মপুত্র নদের চরাঞ্চলসহ মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায়। এখন বিজেপিবিরোধী ভোট ভাগাভাগি হচ্ছে এআইইউডিএফ এবং কংগ্রেসের মধ্যে।
এ অবস্থায় এজিপির প্রতি সমর্থনের যুক্তি দাঁড় করাচ্ছেন অনেক কংগ্রেস নেতা। সেরকমই একজন গোয়ালপাড়া ওয়েস্ট বিধানসভায় কংগ্রেস থেকে নির্বাচিত বিধায়ক আবদুর রশিদ ম-ল। তিনি বলছেন, ‘যেসব কংগ্রেসি বিজেপি ও এআইইউডিএফ সমর্থন করতে পারেন না, তাদের উচিত এজিপি শক্তিশালী করা।’
আসামের রাজনীতিতে বদরুদ্দিন আজমলের সঙ্গে কংগ্রেসের নেতাদের বিরোধ বিজেপির জন্য জায়গা তৈরি করে দিচ্ছে। আজমল ধুবড়ির লোকসভা এমপি এবং তার দলের ১৫ জন বিধায়ক রয়েছে। ২০০৫ সালে রাজনীতিতে আসার পর থেকে তিনি মুসলিমদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলতে সমর্থন হন। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দুই দল একসঙ্গেই লড়াই করেছিল বিজেপির বিরুদ্ধে। কিন্তু নির্বাচনের পর তাদের বন্ধুত্ব ভেঙে যায়। বিশ্লেষকরা বলছেন, তাদের বিভাজনে লাভবান হচ্ছে বিজেপি ও তার সঙ্গীরা এবং কংগ্রেসও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
