হঠাৎ চাপে নেতানিয়াহু

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০২৬, ১২:০৭ এএম

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বাহিনীর কথিত সামরিক অভিযানের চার সপ্তাহের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে পারমাণবিক স্থাপনা, সামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। ইরানও মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যুক্তরাষ্ট্রে সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনা এবং ইসরায়েলে ব্যাপক পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এ সংঘাতের সব বড় মূল্য দিচ্ছে বৈশ্বিক জ্বালানি খাত। দেশে দেশে বাড়ছে জ্বালানি সংকট। ঝুঁকির মুখে পড়েছে অনেক দেশের অর্থনীতি। উভয়পক্ষের যুদ্ধের রসদেও টান পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে গত দুদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতির আলোচনা শোনা যাচ্ছে। অবশ্য সেটি নিয়েও পাল্টাপাল্টি বক্তব্যেরও শেষ নেই। এর মধ্যেই ইসরায়েলের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি হামলাও থেমে নেই। বিশ্লেষকদের ভাষ্য, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কোনো সমঝোতা চান না বলেই হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলে। আর এ বিষয়টি সম্ভবত ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর অবস্থানের মধ্যে এক ধরনের দ্বন্দ্ব তৈরি করেছে।

বিবিসি এক বিশ্লেষণে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কেন তেহরানের সঙ্গে নতুন করে সংলাপ শুরু করতে চাইছেন, তা নিয়ে এখনো ব্যাপক জল্পনা রয়েছে। অতীতে হোয়াইট হাউজ আলোচনাকে সামরিক উত্তেজনা বাড়ানোর আড়াল হিসেবেও ব্যবহার করেছে।

তবে ইসরায়েলের একটি অংশ মনে করছে, আলোচনার এ উদ্যোগ নিয়ে আসলে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে যুক্তরাষ্ট্র, যা ইসরায়েলের লক্ষ্য থেকে ভিন্ন হতে পারে। ইসরায়েলের সাবেক সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা এবং তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যালেস্টাইন স্টাডিজ সেন্টারের প্রধান মাইকেল মিলস্টিন বলেন, ‘বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কোনো সমঝোতা চান না। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর অবস্থানের মধ্যে এক ধরনের দ্বন্দ্ব রয়েছে।’

বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘নেতানিয়াহু যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চান। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, এ যুদ্ধ ইসরায়েলের সব অস্তিত্বগত হুমকি দূর করবে এবং সম্ভবত ইরানে শাসন পরিবর্তনের পথও তৈরি করবে। কিন্তু তার প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যে এখন একটি ফাঁক তৈরি হয়েছে।’

মিলস্টেইনের মতে, ট্রাম্প যদি সত্যিই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খোঁজেন, তাহলে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে পারেন। তিনি বলেন, “এটি এক ধরনের ‘ক্যাচ-২২’। আলোচনা শুরু হলে তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবেন না, আবার যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে এককভাবে যুদ্ধ চালানোর কথাও বলতে পারবেন না। শেষ পর্যন্ত তাকে তা মেনে নিতে হবে।”

ইসরায়েলের ক্ষমতাসীন লিকুদ দলের সংসদ সদস্য ড্যান ইলুজ বলেন, ‘ইসরায়েলিরা যুদ্ধের অবসান চায়। তবে আমরা বুঝি, সঠিক উপায়ে শেষ করতে হলে আমাদের (ইরানের) শাসনগোষ্ঠীকে পরাজিত করতে হবে যেন এটি বারবার ফিরে এসে হুমকি তৈরি না করে।’ তিনি বলেন, “আমরা আগে ‘কনটেইনমেন্ট’ নীতি প্রয়োগ করেছি, যেমন হামাসের ক্ষেত্রে এবং ৭ অক্টোবর আমরা দেখেছি তা আমাদের জন্য কতটা ভয়াবহ হয়েছে। তাই ইরানের ক্ষেত্রেও একই ভুল করতে চাই না।”

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে কোনো সমঝোতা হলেও, হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েল সামরিক অভিযান চালিয়ে যাবে এমন ধারণা ব্যাপকভাবে প্রচলিত। তবে তেল আবিবভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের ইরান বিশ্লেষক ড্যানি সিত্রিনোভিচ মনে করেন, চুক্তি করতে হলে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুকে হয় (ইরানের) শাসন পরিবর্তন করতে হবে, নয়তো নিজেদের শর্ত থেকে সরে আসতে হবে। তিনি বলেন, ‘এই শাসকগোষ্ঠী আত্মসমর্পণ করবে না যুদ্ধের আগে যা দেয়নি, তা এখন দেবে না।’ তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ পথ হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, যা বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত তেল পরিবহন রুট। বর্তমানে এটি অবরুদ্ধ থাকায় আলোচনায় নিজেদের শক্ত অবস্থানে মনে করছে তেহরান।

গত সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার আলটিমেটাম থেকে সরে আসার পর ট্রাম্পের অবস্থান আরও দুর্বল হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তেহরান যুক্তরাষ্ট্রসংশ্লিষ্ট জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টা হামলার হুমকি দেওয়ার পর তিনি এ হুমকি প্রত্যাহার করেন। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন করে আলোচনার ইঙ্গিত দিয়ে ট্রাম্পের খুব বেশি ঝুঁকি নেই এটি জ্বালানি বাজারকে স্থিতিশীল করা, ইরানের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বে বিভাজন তৈরি করা বা নতুন সামরিক অভিযানের জন্য সময় নেওয়ার কৌশলও হতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত