মাহবুবুর রহমানের পড়াশোনা হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, নটরডেম কলেজ ও শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ, বগুড়ায়। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে করেছেন এম.বি.এ। বর্ণাঢ্য পেশাগত জীবন কাটিয়েছেন দেশী ও বিদেশি ওষুধ শিল্পের বিপণন বিভাগের শীর্ষ পদে। লেখালেখির সাথে তার বসবাস বহুকালের। ইউরোপের ইতিহাস, শিল্প ও সংস্কৃতির ওপর তার রয়েছে বিশদ পড়াশোনা ও ভ্রমণ অভিজ্ঞতা। পৃথিবীতে ঘুরে বেড়িয়েছেন বিস্তর; কখনো পেশাগত কাজে, কখনো শুধু ভ্রমণের নেশায়। লেতা সেমোয়া তার প্রথম গ্রন্থসহ তার ভাবনা জানার চেষ্টা করেছেন দেশ রূপান্তরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি আমজাদ হোসেন হৃদয়।
এবারের বইমেলায় প্রকাশিত বই সম্পর্কে জানতে চাই
মাহবুবুর রহমান: এবারের বইমেলায় আমার একমাত্র বই 'লেতা সেমোয়া' প্রকাশিত হয়েছে। যার বাংলা অর্থ 'আমিই রাষ্ট্র'। এটি রাজা চতুর্দশ লুই এর একটি উক্তি। ভ্রমণ বিষয়ক এই বইটি প্রকাশ করেছে পাঠক সমাবেশ। এই বইতে আমি ফ্রান্সের ইতিহাস, রাজাদের ইতিহাস, তারা কি খায়, কি ধরনের পোষাক পরে, তাদের সংস্কৃতিসহ সব খুটিনাটি বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। একইসঙ্গে ইউরোপ ভ্রমণের একটি ধারণা পাওয়া যাবে বইটিতে।
আপনার বইটি পাঠককে কেন পড়তে বলবেন?
মাহবুবুর রহমান: ফরাসি ভাষার প্রথম পাঠ হিসেবে নিতে পারেন বইটাকে। আপনার ভ্রমণ গাইড মনে করতে পারেন। এমনকি ইউরোপের শিল্পকলা সম্পর্কে জানার মাধ্যম। ইউরোপের ইতিহাস পাঠ। শিল্পকলার ইতিহাস পাঠ। রেনেসাঁ, বারোক, নিওক্লাসিকাল, রোমান্টিক, ইমপ্রেশনিজম, পোস্ট-ইমপ্রেশনিজম এসব শিল্পরীতির পরিচয়। নেপোলিয়ন বা লেওনার্দো দা ভিঞ্চির জীবনী হিসেবে নিতে পারেন বইটিকে। আল্পস অতিক্রম কি দেবত্বের জৌলুস নাকি নেপোলিয়নের মানবিক সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি? মোনালিসা কি শেষ পর্যন্ত মাতৃরুপ ভিঞ্চি? সবকিছুকে ছাপিয়ে যাবে বিশ্লেষণ। কিছুক্ষণের মধ্যে নিজেই জড়িয়ে যাবেন তাতে। বইটা শেষ হলে আপনি পেয়ে যাবেন আপনার বিশ্ববীক্ষা। আপনার শিল্পদর্শন। বিশেষ করে কেউ ফ্রান্স ভ্রমণ করতে চাইলে এটি তার জন্য খুবই সহায়ক হবে। এছাড়া যেকোনো শ্রেণির ছাত্ররা এটি পড়ে অজানা ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারব।
বই পাঠকের হাতে পোঁছাতে কোনো কৌশল অবলম্বন করছেন?
মাহবুবুর রহমান: ঢাকার যত বড় বড় পুস্তক বিক্রেতা রয়েছেন সবার কাছে বইটি দিয়েছি। বইমেলাতে পাঠক সমাবেশে আছে বইটি। তাদের ঢাকার সব আউটলেটে বইটি পাওয়া যাবে। এছাড়া বাতিঘরসহ অনেক প্রসিদ্ধ লাইব্রেরিতে বইটি দিয়েছি।
আমাদের বই প্রকাশ, বই নিয়ে আলোচনার প্রবণতা অনেকটা ফেব্রুয়ারি-কেন্দ্রিক, এ বিষয়ে কি বলবেন?
মাহবুবুর রহমান: বাংলাদেশে একজন প্রকাশক একটি বইয়ের ৫ হাজার কপি বিক্রি হলে খুব খুশি হয়ে যায়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে একটা ভালো বই ৫০ হাজার বিক্রি হয়ে যায়। এই পার্থক্যটা হচ্ছে আমরা শুধুমাত্র ফেব্রুয়ারি মাস কেন্দ্রিক সেজন্য। বছরজুড়ে হওয়া উচিত এই আলোচনা। প্রকাশক এবং লেখককে উদ্যোগ নেওয়া লাগবে। বিদেশিরা বইয়ের বিপণন মার্কেটিংটাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। বাংলাদেশে বইয়ের প্রচার খুবই অনুপস্থিত। এবং এটি শুধুমাত্র ফেব্রুয়ারি মাস কেন্দ্রিক। যার ফলে বিজনেস হিসেবে এটি খুবই দূর্বল।
কেউ কেউ বলে বইয়ের পাঠক কমেছে,আপনার কী মনে হয়?
মাহবুবুর রহমান: এখন দুই ধরনের পাঠক রয়েছেন। এক হচ্ছে অনলাইন পাঠক, যারা মোবাইল কিংবা ল্যাপটপের স্কিনেই পড়েন। কিছু কিছু বই আছে কেনাও লাগে না। অনলাইনেই পাওয়া যায়। আরেক ধরনের পাঠক আছেন যারা ছাপা বই কিনে পড়েন। দুইটা মিলে যদি হিসেব করেন তাহলে দেখা যাবে পাঠক অনেক বেড়ে গেছে। এই বই লিখতে গিয়ে আমি নিজেও সহায়ক হিসেবে অনলাইন থেকে অনেক বই নিয়েছি। বই এখন আরো সহজলভ্য। সুতরাং পাঠক কমেনি বরং বেড়েছেই বলে আমি মনে করি।
বইমেলাকে আরও কীভাবে লেখক পাঠক ঘনিষ্ঠ করা যায়?
মাহবুবুর রহমান: একজন লেখক বইমেলাতে তার বই নিয়ে বলার সুযোগ পান মাত্র কয়েক মিনিট। আর সেখানে উপস্থিত থাকেন নিজের পরিচিত কয়েকজন মানুষ আর মোড়ক উন্মোচনের অপেক্ষায় থাকা লেখকরা। এখানে কোনো সাধারণ মানুষ, পাঠক থাকেন না। তাই বাস্তবে পাঠক লেখকের ইন্টারেকশন হচ্ছে না। এদিকটাতে বাংলা একাডেমি থেকে উদ্যোগ নিতে হবে আরও কীভাবে লেখক-পাঠকের ঘনিষ্ঠ করা যায়। এক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকেও কাজে লাগানো যেতে পারে।
বইমেলার আয়োজন নিয়ে বাংলা একাডেমির ভূমিকা কেমন?
মাহবুবুর রহমান: বইমেলা আয়োজন করার জন্য বাংলা একাডেমিকে অবশ্যই ধন্যবাদ দেওয়া উচিত। মেলার স্টল প্যাভিলিয়নগুলোর ডেকরেশন এত সুন্দর যে, তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। তবে একটা বিষয় না বললে নয়, সেখানে প্রচুর ধুলোবালি হয়। কিছু ব্যবস্থা যদি নেওয়া যায় তাহলে পরিবেশটা আরও বেশি সুন্দর হবে।
