স্বপ্ন পোড়ে আগুনে

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৪, ১২:৩৭ এএম

কিছু মৃত্যু জীবিতের ভাষা কেড়ে নেয়। এক ঘোর যন্ত্রণা-কষ্ট-কান্না তাকে নির্বাক করে। আর যে মরে কেবলমাত্র সেই-ই জানে, কী নিদারুণ যাতনায় কেটেছে জীবনের শেষ মুহূর্ত। আকস্মিক আগুনপোড়া মৃত্যুতে শুধু মৃতেরই ভাষা থাকে। কিন্তু সেই ভাষা জীবিতের দুর্বোধ্য। হঠাৎ প্রাণোচ্ছল মানুষ মৃত্যুর আগমুহূর্তে যখন দেখেন, প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা চারপাশ ছেয়ে গেছে আর্তচিৎকারে, তখন সে হয়ে যায় কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কেউ পুড়ে মরে আবার কেউ পুড়তে পুড়তে বেঁচে যায়। কিন্তু সেই বেঁচে যাওয়াতেও থাকে জীবনের গভীর মৃত্যুচিহ্ন। তাই নিয়েই সে আবার তাড়িত হয় জীবনসংগ্রামে।

বৃহস্পতিবার রাত এমনিতেই একটু অবসরের। পৌনে ১০টার দিকে বেইলি রোডের একটি ভবনে ভয়াবহ আগুনের ঘটনা ঘটে। সেখানে ৮টি রেস্তোরাঁ, একটি জুসবার ও একটি চা-কফির দোকান ছিল। ভবনে লাগা আগুনে এখন পর্যন্ত মারা গেছে ৪৫ জন। আহত হয়েছে ৬০ থেকে ৭০ জন। যাদের বেশিরভাগই ঢাকা মেডিকেল কলেজ, শেখ হাসিনা বার্ন ইউনিট ও রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে রয়েছে।

অগ্নিকান্ডের ফলে মৃত্যু হবে সাধারণ মানুষের। এরপর সেই দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করা হবে। জানা যাবে কী ধরনের অব্যবস্থাপনা ছিল। আরও জানার জন্য তদন্ত কমিটি হবে। সেই কমিটি রিপোর্ট দেবে। সৃষ্টি হবে আরেক ঘটনা। মধ্যবর্তী সময়ে মানুষ সব ভুলে যাবে। এভাবেই চলছে। এ পর্যন্ত যতগুলো অগ্নিকান্ড হয়েছে, যত মানুষ মারা গেছে বা আহত হয়েছে, কে রেখেছে তার খবর? কেমনই বা আছে আগুনসেদ্ধ মানুষের পরিবার? এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে শুক্রবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ‘আগুনপোড়া রাতে চির আঁধারে ৪৪’ প্রতিবেদনে এক মর্মস্পর্শী দৃশ্য ভেসে উঠেছে। যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে এর আগেও যারা অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছে, বৃহস্পতি ও শুক্রবার মারা গেছে, তাদের মৃত্যুর জন্য কে দায়ী? এ ধরনের ঘটনা হলে প্রতিবার যা  জানা যায়, এবারও তা-ই জানা গেল। জানা গেছে, ভবনটিতে একটা মাত্র সিঁড়ি রয়েছে। কোনো ধরনের ভেন্টিলেশন ছিল না। এবারও একটি তদন্ত কমিটি হয়েছে।

গ্যাস সিলিন্ডারের লিকেজজনিত কারণে আগুন লেগে থাকতে পারে বলে রেস্তোরাঁর কর্মীদের কাছ থেকে জানা গেছে বলে র‌্যাব সূত্র জানিয়েছে। ফায়ার সেফটি প্ল্যান দেখে ফায়ার সার্ভিস। রাজউক তদারকি করে বিল্ডিং কোড। কিন্তু এই ভবনে একটা মাত্র সিঁড়ি রয়েছে। ধোঁয়ার কারণে মানুষ যেখানে অচেতন হয়ে পড়েছিল, সেখানে কোনো ধরনের ভেন্টিলেশন ছিল না।  অফিস করার অনুমতি ছিল। কিন্তু অফিস না করে এখানে বিভিন্ন রেস্টুরেন্টসহ দোকান করা হয়েছে। এটা কীভাবে হলো? এর চেয়েও জরুরি হচ্ছে, এই অনিয়মের কথা এত দিন জানা যায়নি কেন? সমস্যাগুলো সমাধানের পথ কেন বের করা হয়নি? আসলে অব্যবস্থাপনা রুখতে নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও বাস্তবে এসবের কোনো ব্যবস্থা হয় না। ফলে কয়েক মাস পরপর হচ্ছে আগুন ট্র্যাজেডি।  চিকিৎসকরা বলছেন, মৃত্যুর কারণ ‘কার্বন মনোক্সাইড পয়জনিং’, যাকে সহজ ভাষায় বিষাক্ত কালো ধোঁয়া বলা যায়।  আহত ব্যক্তিরা আধা ঘণ্টা থেকে ৪৫ মিনিট বদ্ধ ঘরে কালো ধোঁয়ার মধ্যে আটকে ছিলেন। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কারও গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখবে ফায়ার সার্ভিস। তাতে নিহত-আহতদের পরিবারের কী হবে?

অগ্নিকান্ডের কোনো ঘটনায় পার হয় বছরের পর বছর। প্রতিটি ঘটনায় মামলা হয়। কিন্তু তদন্ত শেষ হয় না। হলেও ফলাফল জানা যায় না। জানা গেলেও পরবর্তী সময়ে কোনো কর্তৃপক্ষই পদক্ষেপ নেয় না। এটা কি বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, নাকি অন্য কিছু তা বলা মুশকিল। তবে এটা হলফ করে বলাই যায়, সাধারণ মানুষের এমন করুণ মৃত্যুর শতভাগ দায় কোনো কর্তৃপক্ষই নেবে না।

এক বিস্ময়কর মনোজাগতিক দেশে আমাদের বসবাস। যেখানে গুটিকয় ইচ্ছাতন্ত্রধারী ব্যক্তির কাছে বন্দি সাধারণ মানুষ। লোভাতুর, অর্র্থপিপাসু ও আত্মকেন্দ্রিক গোষ্ঠীর ব্যারিকেড ভেঙে সাধারণ মানুষ কোনো দিন প্রশান্তির জীবন সমাপ্তি আদৌ খুঁজে পাবে কি না, তা  বলা সম্ভব নয়। তবে এটা ঠিক, এভাবে কোনো সভ্য সমাজ বেশি দূর যায় না, যেতে পারে না। কোথাও জীবনের নিশ্চয়তা নেই। বাঁচতে চাইলে বাঁচতে হবে নিজের মতো। নগরসভ্যতা থেকে সেই পথ বহুদূর।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত