নির্বাচনে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কৌশল

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২৪, ১২:৪৬ এএম

তিনি এসে গেছেন। এসেছেন মানেই একেবারে ভিনি, ভিডি, ভিসি। এলাম, দেখলাম, জয় করলাম। এখনই তা বলা না গেলেও, এটা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না, পরিযায়ী পাখিরা যেমন সুদূর সাইবেরিয়া থেকে উড়ে এলেই আমরা আশ্বস্ত হতে পারি, শীতকাল পুরোপুরি এসে গেছে। তেমনি তিনি এলেও, সন্দেহ থাকে না যে ভোট আসছে। তিনি মাননীয় শ্রীল শ্রীযুক্ত মহামান্য নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী। তবে এই মুহূর্তে তার সবচেয়ে পছন্দের বিশেষণ সম্ভবত, ‘হিন্দু হৃদয় সম্রাট’। তিনি বলেন বটে সবকা সাথ, সবকা বিকাশ। বাস্তবে তিনি পক্ষপাতহীন। এ তার পরম বন্ধুও মানবেন না। পশ্চিমবঙ্গে গতবারের ইলেকশনেও তিনি বারেবারে এসেছিলেন। স্বভাবসিদ্ধ নাটকীয় স্টাইলে হাজারো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ভোটের ফল ঘোষণার পরে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও অস্বীকার করার উপায় নেই যে নরেন্দ্র মোদির মাটি কামড়ে এ রাজ্যে পড়ে থাকা পুরোপুরি বিফলে যায়নি।

পশ্চিমবঙ্গে লোকসভা আসনের ৪২টির মধ্যে বিজেপি জয় পেয়েছিল ১৮টি সিট। বাকি অধিকাংশ তৃণমূল। বহরমপুরে কংগ্রেসের অধীর চৌধুরী ও মালদাতেও আর একটি সিট কংগ্রেস পেয়েছিল। সংগতভাবেই প্রশ্ন উঠবে, এবার কী হতে পারে? এখনো ছবি আদৌ পরিষ্কার নয়। সবে ভোটের কাঠি বেজেছে। তিনি মহাধিপতি ইতিমধ্যেই বিজেপির হয়ে আসরে নেমে পড়েছেন। বিজেপি প্রধানমন্ত্রীর সফরকালেই বেশ কিছু আসনে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করে দিয়েছে। অন্যান্য দল এ ব্যাপারে এখনো অনেক পিছিয়ে। তবে সব দলের অন্দরেই প্রস্তুতি যে শুরু হয়ে গেছে তা নিয়ে সন্দেহ নেই। নির্বাচনের দিনক্ষণ অবশ্য আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো ঘোষিত হয়নি। তবে মনে হচ্ছে কয়েকদিনের মধ্যে তা হবে। সম্ভবত এপ্রিলের শেষে অথবা মে মাসের প্রথম সপ্তাহেই নিশ্চিত নির্বাচন হবে। ভারতের নির্বাচন মানে পুরাকালের রাজরাজড়ার রাজসূয় যজ্ঞের মতো বিশাল ব্যাপার। আধুনিক এক ঝাঁ চকচকে ইভেন্ট। কোটি কোটি টাকার লেনদেন চলবে, ভিভিআইপিদের দেখা যাবে শিল্পপতিদের টাকায় হেলিকপ্টারে চড়ে ঘুরে বেড়াতে, নেতারা অনেকেই দলিত বস্তি বা আদিবাসী কুটিরে খাবেন, রাত কাটাতেও পারেন। সঙ্গে থাকা ফটোগ্রাফার একের পর এক ছবি তুলে মিডিয়ায় পাঠাবেন। পরের দিন পাতা জুড়ে ছবি ছাপা হবে, দলিত আদিবাসীদের সঙ্গে দেশনেতা। টিভিতে ব্রেকিং নিউজ বারেবারে বলতে থাকবে, গরিবের ঘরে কত সামান্য খেয়েও এখনো কেমন হাসিমুখে আছেন মাননীয় অমুক বা মাননীয়া তমুক। সবই তো দেশসেবার নিমিত্ত। দেশের মানুষের জন্য এই কদিন রাতের ঘুম হারাম হয়ে যাবে মহামান্য নেতাদের।

ভারতের কথা না হয় আপাতত থাক। পরে বিস্তারিত বলা যাবে। পশ্চিমবঙ্গের রেজাল্ট কী হবে, এই প্রশ্ন ইতিমধ্যেই সব মহলেই উঠছে। আগেই বলেছি, জল্পনা যাই হোক না কেন, এখনো দিল্লি বহুদূর। ফলে নিশ্চিতভাবে আগাম পূর্বাভাষ অসম্ভব। তবুও কিছু কিছু লক্ষণ যা তাতে আন্দাজ করা যায় মোটামুটি ট্রেন্ড কোনদিকে। অন্যান্য রাজ্যের চেয়ে পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি অনেক আলাদা। এ রাজ্যের ভোটে সাম্প্রদায়িক বিভাজন একটা বড় ইস্যু। পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর, এমনকি আশি নব্বই দশকের ভোটে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ বিদ্বেষ এমন নোংরামির পর্যায়ে যায়নি। এখন যেভাবে রাজনৈতিক নেতাদের বচন খোলাখুলিভাবে আসছে তা কিন্তু কখনো এ রাজ্যে ছিল না। এই মেরুকরণের মূল কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে ভারতীয় জনতা পার্টি ও তার থিংকট্যাংক সংঘ পরিবারের। অনেকেই বলেন যে, সারা দেশে বিজেপি বা আরএসএসের যা রমরমা এ রাজ্যে তার সিকি ভাগ নয়। সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। বরং আমি দায়িত্ব নিয়ে বলব ১৯৪৭ পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনমানসে অন্য সম্প্রদায় নিয়ে চাপা অসন্তোষ ছিল। তা এখন ফুলেফেঁপে উঠেছে চরম হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কৌশলে।

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে অনুপ্রবেশ আর এক বড় ইস্যু। বিজেপির হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটির কল্যাণে বলা হয়ে থাকে যে দলে দলে ওপার থেকে লোকজন এপারে এসে জনবিন্যাস শুধু বদলে দিচ্ছে না অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে যাচ্ছে ‘অনুপ্রবেশের’ কারণে। মজা হচ্ছে, এই রটনার পেছনে যুক্তি কতটা তা কেউই খতিয়ে দেখছে না। বিজেপি তো দেখবেই না। কিন্তু বিরোধী দলগুলোর মধ্যেও সেভাবে সোচ্চার কোনো পাল্টা প্রতিবাদ চোখে পড়ে না। এমনকি বামেরাও এভাবে চুপচাপ থাকায় বিজেপির কৌশল গতি পাচ্ছে। মেরুকরণ হচ্ছে এটা নিশ্চিত। কিন্তু মোদি অমিত শাহ বা স্মৃতি ইরানি যত চেষ্টাই করুক না কেন, পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে একশো শতাংশ মেরুকরণ কখনো হবে না। গ্রামে গ্রামে একবার যান, দেখবেন এখনো সেখানে পড়শী হিন্দু মুসলমান দিব্যি পাশাপাশি বাস করেন। তবুও এখনো পর্যন্ত হাওয়া যা তাতে গতবারের আঠারো সিট বিজেপির বেড়ে কুড়ি বাইশটি হলে অবাক হব না। বিজেপির চরম হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির পরিসর কিন্তু তৈরি করে দিয়েছে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেসই। কেন্দ্র রামমন্দির করলে রাজ্য জগন্নাথ মন্দির নির্মাণে সক্রিয় থাকছে। কে বেশি ধর্মে নিষ্ঠাবান তার প্রতিযোগিতায় পেছনে চলে গেছে মানুষের মৌলিক সমস্যাগুলো। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সারা দেশের মতো এ রাজ্যেও ভালো নয়। পশ্চিমবঙ্গে শ্রমিকদের মতো সস্তা মজুরি দেশের অন্যান্য রাজ্যে নেই। ফলে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ভিড় বাড়ছে এ রাজ্যের মজুরদের। অধিকাংশ অসংগঠিত শ্রমিকদের দেখা পাওয়া যায় কেরল, দিল্লি, মুম্বাই, ব্যাঙ্গালোর ও অন্যান্য জায়গায়। নির্বাচন আসে যায়। প্রতিশ্রুতির বন্যা বয়ে যায়। কিন্তু ভোট হয়ে গেলে ছবিটা একই থাকে। কিছুই বদলায় না। মমতা ব্যানার্জি যথেষ্ট কৌশলী রাজনীতিক। তিনি বিলক্ষণ জানেন, কোন দেবতা কোন ফুলে তুষ্ট। তার রাজনীতির মূলমন্ত্রই হচ্ছে, চোরকে চুরি করতে বলে গৃহস্থকে সজাগ থাকতে বলা।

এনআরসির মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিল এলেও তৃণমূল কংগ্রেস হয় সংসদে নীরব থাকে বা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে বিজেপির সুবিধে করে দেয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই পাঁচ বছরে তৃণমূলের এই ভূমিকা খোঁজ নিলেই আপনি জানতে পারবেন। তবুও এবারের ভোটেও অ্যাডভান্টেজ নিঃসন্দেহে তৃণমূল কংগ্রেস। একে তো গ্রামে মমতার ইমেজ এখনো অক্ষুন্ন। সন্দেশখালী বড় ঘটনা হলেও, দুর্ভাগ্যবশত তার প্রভাব সারা রাজ্যে সেভাবে পড়বে বলে মনে হয় না। পাশাপাশি তৃণমূল সরকারের কিছু জনমুখী প্রকল্পে সার্বিকভাবে লোকে উপকৃত হয়েছেন তা কট্টর মমতা বিরোধী ছাড়া সবাই মেনে নেবেন। দুর্নীতি মমতা ব্যানার্জির আমলে আকাশছোঁয়া হয়েছে, এটা নিয়ে কোনো তর্ক নেই। কিন্তু আমাদের সামাজিক বোধ এমন ভোঁতা হয়ে গেছে বা করে দেওয়া হয়েছে, সেখানে দুর্নীতি নিয়ে প্রত্যন্ত গ্রামেও খুব কম মানুষ আজকাল মাথা ঘামান।

গতবারের ভোটের পরে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেছিলেন যে, বিজেপি হারলেও পশ্চিমবঙ্গে কট্টর হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি মোটেও পিছু হটেনি। হটবেও না। কথাটা গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখবেন যে, আরএসএসের নীতির সঙ্গে কিন্তু তৃণমূল সুপ্রিমোর কোনো বিরোধ নেই। নরেন্দ্র মোদি বা মমতা ব্যানার্জি কেউই গণতন্ত্র পছন্দ করেন এমন কথা অতি সাধারণ লোকেও বিশ্বাস করবে বলে মনে হয় না। পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকসংখ্যা মোট জনসংখ্যার আটাশ শতাংশের বেশিই। সাধারণভাবে মনে করা হয়, ওই সংখ্যক ভোট পুরোটাই তৃণমূল কংগ্রেস পাবে। এবার বোধহয় তা হবে না। পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময় থেকেই সংখ্যালঘু ভোটের একটা ভালো অংশ বাম কংগ্রেসের দিকে ঝুঁকছে। মুর্শিদাবাদ, মালদা বরাবরই কংগ্রেসের গড়। তবে বামেদের অবস্থাও হালে সেখানে ভালো। দুই বর্ধমান, নদীয়া, দিনাজপুরে বাম কংগ্রেস জোট হলে তাতে লাভবান হবে ইনডিয়া মোর্চা। দুই চব্বিশ পরগনায় বামেরা সুবিধে করতে পারে আইএসএফ বা ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টের সঙ্গে জোট হলে। গ্রামে গ্রামে বুথ রক্ষা করার শক্তি বাম কংগ্রেসের এই মুহূর্তে কম। তৃণমূলের লেঠেল বাহিনীর মোকাবিলা করার ক্ষমতা রয়েছে একমাত্র আইএসএফের। এত বছর বামেরা লড়াকু ছেলেমেয়েকে পেত, ছাত্র ফ্রন্টের মধ্য দিয়ে। ক্ষমতায় আসার পর থেকে তৃণমূল কংগ্রেস ইচ্ছে করে কলেজ নির্বাচন বন্ধ করে দিয়ে তরুণ প্রজন্মের বাম রাজনীতিতে ঢোকার এই সাপ্লাই লাইন বন্ধ করে আখেরে নিজেদের সুবিধে করে নেওয়ার পাশাপাশি তরুণদের বিপথগামী করে সামাজিক পরিস্থিতি জটিল করে দিয়েছে।

তবুও বললাম, এবারও মনে হয় ভোটের অঙ্কে জিতবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস। কেন্দ্রীয় সরকার নিজেও বোধহয় চায় পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস থাকুক। কল্পিত শত্রু না থাকলে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলাটাও তো জমবে না। ফলে বামেদের ফলাফল এবারও মনে হয় না কিছু পাল্টাবে। বহরমপুরে অধীর চৌধুরী বোধহয় এবারও জিতবেন। মালদাতেও কংগ্রেসের আসন অটুট থাকবে। দিনাজপুরে ইনডিয়া জোটের ফল ভালো হতে পারে। রেজিমেন্টেড বামেদের একমাত্র লক্ষ্য হোক, গণআন্দোলন। একমাত্র গণআন্দোলন। স্বৈরতন্ত্র ঠেকাতে এর কোনো বিকল্প নেই।

লেখক: ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত