অনেকেই বলে থাকেন আজকাল আর মহিলা সমিতির মতো নাটক হয় না। শুনে যুগপৎ হাসি পায় এবং তাদের সমসাময়িক তথ্যনির্ভরতার অজ্ঞানতার জন্য একটু করুণা হয়। মহিলা সমিতির যুগোবসান হয়েছে সেই পঁচিশ বছর আগে। মহিলা সমিতি ভেঙে ফেলাও হয়েছে, পরে সেখানে নতুন ভবন হয়েছে এবং শিল্পকলা একাডেমির সেগুনবাগিচায় প্রথমে দুটি এবং পরে একটি মঞ্চ হয়ে প্রায় প্রতিদিন নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে। এর মধ্যে মূলধারার প্রসেনিয়াম থিয়েটার ছাড়াও নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। পাশাপাশি মহিলা সমিতির নতুন ভবনেও কিছু নাট্যক্রিয়া চলছে। নাটক যারা করেন তাদের বসে থাকার উপায় নেই। এই একটি মাধ্যম যেখানে নিয়মিত চর্চা প্রয়োজন হয়, কারণ নাটকের একটা বড় অংশীদার হচ্ছে দর্শক। দর্শকের ভালো লাগা, দর্শককে নতুন কিছু উপহার দেওয়ার একটা নিত্যনৈমিত্তিকতার মধ্যে থাকতে হয় নাট্যদলগুলোকে। গত দুই যুগ ধরে নতুন তিনটি মঞ্চ পাওয়ায় দলগুলোকে নানা আঙ্গিকে নিরীক্ষা করার একটা প্রেরণা দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষণ থিয়েটারে মঞ্চ বিন্যাসের নতুন সুযোগ পাওয়ায় সেখানে এরেনা আঙ্গিকে নাটক শুরু হয়েছে। একেবারে হলটির প্রথম দিকেই রাঢ়াং নাটক করেছি আমরা। নাটকটির জনপ্রিয়তার কারণই হচ্ছে নতুন মঞ্চ বিন্যাস। চারদিকে গ্যালারিতে দর্শক বসে থাকে। অভিনয়টা হয় মাঝখানে। ফলে দর্শক তার কাছ থেকে একটা নতুন দর্শন বৈচিত্র্য পেয়ে থাকে। যদিও মহিলা সমিতিতে মঞ্চটি পরিহার করে আমরা দর্শকদের আসনগুলোর অবস্থান পরিবর্তন করে প্রসেনিয়াম ভেঙে আমরা বেশ কিছু নাটক মঞ্চায়ন করেছি। নাগরিক, ঢাকা থিয়েটার এবং আমরা বিভিন্ন সময় এসব নিরীক্ষা করে সফলও হয়েছি। বিভিন্ন নতুন দলও মাঝে মধ্যে এ রকম নিরীক্ষণ করে দর্শককে চমকে দিয়েছে। নাটকের বিষয়বস্তুও বিচিত্র। একদা বহু আগে ড্রয়িংরুমনির্ভর নাটক হতো। সেগুলোর বিষয়বস্তু যেমন পুরনো, তেমনি মঞ্চসজ্জাও ছিল প্রাচীন চিন্তার। খুব দ্রুতই বাংলাদেশে তা পাল্টে গেল। ড্রয়িংরুমের স্থান দখল করল উন্মুক্ত প্রান্তর, পথঘাট, নদীতীর, লোকালয় বা কৃষকের উঠান। ক্রমে নাটক একটা যুদ্ধক্ষেত্রের চেহারা নিয়ে ফেলল। দৃশ্যসজ্জার ক্ষেত্রে ইঙ্গিতবাহিতা এবং আধুনিক চিত্রকলার প্রতিফলন দেখা যায় প্রায়শই। মঞ্চসজ্জায় বেশ কিছু চিত্রশিল্পীও নতুন দৃশ্যসজ্জায় অংশ নিয়েছেন। আবার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ মঞ্চকর্মীরাও নাটকটি বুঝে দৃষ্টিনন্দন এবং ইঙ্গিতবাহী মঞ্চ নির্মাণ করে নাট্য প্রযোজনায় নতুন মাত্র যোগ করেছেন। একসময় নাটক ছিল খুবই বাস্তবসম্মত। ইঙ্গিতের কোনো স্থানই ছিল না।
কিন্তু সমকালীন নাট্যচর্চায় সেই বাস্তব বা অতিবাস্তবের কোনো স্থান নেই। নাট্যরচনায়ও নানা ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বাস্তবের সঙ্গে সম্পর্ক আছে বটে, কিন্তু বিষয়-ভাবনা থেকে শুরু করে উপস্থাপনায় আধুনিকতা সর্বত্রই লক্ষ করা যায়। অভিনয়শিল্পেরও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। যদিও আধুনিক অভিনয়টা স্পর্শ করে দিন দিন কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠছে। একসময় অভিনয়ে আবেগের চর্চার গুরুত্ব ছিল কিন্তু আবেগকে ভেঙে দিয়ে নতুনতর চর্চার উপস্থাপনার কথা ভাবা হয়েছে। গত অর্ধশতাব্দী ধরেই একসময় মেথড অভিনয়ই ছিল একমাত্র অভিনেতাদের অবলম্বন। কিন্তু অভিনেতাদের কাছে একসময় তা অকিঞ্চিৎকর হয়ে দাঁড়ায়। নতুন অভিনয় পদ্ধতির খোঁজ করতে গিয়ে অনেক মৌলিক চিন্তা চলে আসে। সেসব নাট্যমঞ্চে প্রয়োগে দর্শকদের মধ্যে একটা আলোড়নও তৈরি হয়ে যায়। অভিনয়ে মৌলিক চিন্তা একটা প্রয়োজনীয় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তাই আমাদের অভিনেতাদের কাছে দর্শকদেরও অনেক দাবি। এই দাবি মেটাতে গিয়ে পরিচালক ও অভিনেতাদের এক কঠিন সংগ্রামে নামতে হয়। সেসব অভিনেতাই টিকে যায়, য়ারা এই কঠিন কাছটির জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিয়েছেন। গত দুই যুগে নানাভাবে এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলেছে। দর্শকও এক ধরনের মানসিক অগ্রসরতা অর্জন করেছে।
এখানে একটা কথা বলা খুবই প্রয়োজন। গত তিন দশক ধরে দর্শকদের একটা বড় অংশ সাম্প্রদায়িকতা বা ধর্মীয় সংকটে পড়ে গেছে। যে পরিবারগুলো নিয়মিত নাটক দেখত তারাও সংস্কৃতিবিমুখ হয়ে পড়ছে। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃতি চর্চাও এত কমে গেছে, সেখান থেকে নাটকের নতুন দর্শক আসছে না। মুসলিম পরিবারগুলো একদা সংস্কৃতি চর্চায় এত আগ্রহী হয়ে উঠেছিল। যে কোনো নতুন নাট্যচর্চায় তারা অংশ নিতেন এবং আলোচনায় আগ্রহী হতেন। যে কোনো শিল্প নিয়ে যদি সমাজে আলোচনা না হয় তাহলে তা শুকিয়ে যায় এবং কোনো তরঙ্গ তোলে না। এক সংখ্যালঘু দর্শকদের মধ্যেই যদি এত বড় নাট্যচর্চা আবর্তিত হতে থাকে তাহলে তা সমাজের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক। নাট্যচর্চায় নতুন উপাদান যেভাবে আসছে তার জন্য যে সমঝদার দর্শক প্রয়োজন, তাতে ঘাটতি যদি ক্রমান্বয়ে বাড়তেই থাকে তাহলে এই শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হতে বাধ্য। এত বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলার বিভাগ আছে, সেখান থেকে প্রতি বছর বেরিয়ে আসছে শিক্ষার্থী, তাদের কর্মক্ষেত্রও সংকুচিত হয়ে পড়বে। প্রথমেই বলেছিলাম কোনো কোনো দর্শক ত্রিশ বছরের আগে মহিলা সমিতির নাট্যচর্চার কথা বলেন তারা আসলে এই দীর্ঘ সময়ে নাটক দেখেননি। এ রকম চর্চাবিহীন মানুষের সংখ্যাও দিন দিন বেড়ে চলেছে। এ কথাও সত্যি, নিরীক্ষার নামে বা সমসাময়িক বিষয়বস্তুর অভাবে অনেক নাট্যকর্মই মানুষের ভালো লাগার কথা নয়। সেটাও হতে পারে দর্শকের নাট্যবিমুখতার কারণ। কিন্তু তারপরও নাটকের মতো একটি গতিময় শিল্পকে শুধু মন্দিরের ঘণ্টা বাজানোর কাজেই নিয়োজিত থাকা সম্ভব নয়। তাকে প্রতিদিনের আধুনিকতার দাবি মেটাতেই হবে।
লেখক : নাট্যকার, নির্দেশক, অভিনেতা