বাংলা ভাষায় ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’ প্রকাশের পর অনেকে লেখালেখিতে হাত দিয়েছিলেন। তাদের একজন ভোলানাথ মুখোপাধ্যায়। না উপন্যাস, না প্রবন্ধ ধরনের কৌশলে তিনি লেখেন ‘আপনার মুখ আপুনি দেখুন’। সেখানে ওই সময়ের কলকাতা শহরের হালচাল তুলে ধরেছেন লেখক। লিখেছেন, ‘আজকাল অর্থকে রুধির বলে, অর্থাৎ দেহে রক্ত না থাকিলে শক্তি থাকে না, অর্থ না থাকিলেও শক্তি থাকে না।’ তিনি ওই লেখায় বুঝাতে চেয়েছেন অর্থই অনর্থের মূল। এই অর্থকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শহর হলো পাপ। কারণ কলকাতা বলে এমন কিছু আগে ভূ-ভারতে ছিল না। যেখানে ইংরেজরা শাসক হিসেবে বসবে আর ব্রাহ্মণরা তাদের সমান বাবু হয়ে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টা করবে। সেই চেষ্টার অংশ হিসেবে গাড়ি, বাড়ি, বউয়ের জন্য গহনা, মদের আয়োজন, বেশ্যালয়ে গমন, বাইজি নাচ এগুলো প্রতিযোগিতা শুরু হয় যেত। আর সে জন্য দরকার ছিল টাকার। সেই টাকা আসত কোন পথে? জমিদারি তো ছিলই। ব্যবসাও ছিল। সেই ব্যবসার ধরন কেমন ছিল তা নিয়ে পরে কখনো আলোচনা করা যাবে। তবে পানির মতো টাকার সরবরাহ বাধাহীন রাখার আয়োজন থাকতেই হতো। না হলে বিলাস-বৈভবে টান পড়ে যেত।
আর অন্যসব সভ্যতার মতো বাংলা অঞ্চলেও শহর গড়ে উঠেছে নদী এবং বাজারকে কেন্দ্র করে। তবে বাঙালির ব্যবসার ধরনটা যেন অন্যরকম বরাবরই। যেমন শোনা যায় দুধে পানি মেশানোর কথা। এ কৌতুক যেন প্রবাদের মতো হয়ে গেছে। দুধের সঙ্গে নাকি কুঁচো চিংড়িও পাওয়া যায় বাংলায়। কারণ গোয়ালা দুধ দুইয়ে তাতে যে নদীর পানি মিশিয়ে দিয়েছিল, তার সঙ্গে কুঁচো চিংড়িও ছিল। কেউ কেউ আবার এক কাঠি সরেস, গোয়ালাকে বলে দেয় পানিটা যেন ভালো মেশায় আর যা করে। ঢাকা শহরের বেড়ে ওঠার কাহিনিও একই রকম। যখন মেঘনা ব্রিজ ছিল না, তখনকার কথা। লোকে বলে তখন নোয়াখালী, কুমিল্লা এসব অঞ্চল থেকে মানুষ নিজের বাড়ির কলাটা-মুলাটা নিয়ে ফেরিতে উঠত। সেগুলো বেচতে বেচতে মেঘনা, গোমতী পার হতো। বিক্রির টাকায় তার ঢাকা যাওয়ার খরচ উঠে যেত। সেই যে ঢাকায় ঢুকত, এরপর অন্য ফিকিরে নেমে পড়ত। ঢাকায় এমন কৌতুকও চালু আছে যে, এক লোক গ্রাম থেকে এসেছে মতিঝিলে। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে উঁচু ভবন দেখছে। কয়তলা ভবন, সেটা গুনছে। তখন পাশে এক লোক এসে দাঁড়াল। বলল, কী করছেন। গ্রামের লোকটি বলল, ভবনটি কয়তলা গুনছি। তখন, ওই লোক বলল, এ শহরে ভবনের তলা গুনলে টাকা দিতে হয়। এ ঘটনাকে কেউ কৌতুক বলবে না ঢাকা শহরে। কারণ এখানে এ ধরনের ঘটনাই ঘটে। সেই মেঘনা নদীর ফেরির সময় পার হয়ে এই মেট্রোরেলের আমলেও একই ধরনের ‘ব্যবসা’ এখানে চালু আছে।
যেমন সেদিন, একজন জানালেন, তিনি কারওয়ান বাজার থেকে এক বস্তা পেঁয়াজ কিনেছেন। ভেবেছিলেন, বাজারে যখন-তখন দাম বেড়ে যায়, কিনে রাখা ভালো। কিনে কুলির মাথায় সেই পেঁয়াজ দিয়ে সামনে হাঁটছিলেন। হঠাৎ পেছন ফিরে দেখলেন, সেই কুলি উধাও, বস্তা উধাও। তিনি দ্রুত তার কাছে গেলেন যার কাছ থেকে পেঁয়াজ কিনেছিলেন। তিনি সেই আড়তে গিয়ে দেখলেন বিক্রেতা সাহেবটি বসে আছেন। তার পাশে ঠিক একটু আগের হারিয়ে যাওয়া বস্তাটি। দেখতে হুবহু এক। কিন্তু প্রমাণ করতে পারছেন না এ বস্তা তার। আমাদের আড্ডায় কথাটা উঠতেই কেউ কেউ বললেন এমনটা এ বাজারের ‘কমন’ ঘটনা। তবে সঙ্গে সঙ্গে একজন বলে উঠল, ওনারই-বা একসঙ্গে এক বস্তা পেঁয়াজ কেনার দরকার কী? পেঁয়াজ বেশি করে কিনে তিনি অসাধু ব্যবসায়ীদের দাম বাড়ানোর আরও সুযোগ করে দিচ্ছেন। এখন তো ওনার পেঁয়াজও গেল, ছালাও গেল।
ব্যবসার এ রূপ পৃথিবীর আর কোথাও আছে কি না জানি না। থাকার কথা নয়। কাছাকাছি ধরনের দুর্বৃত্তপনা হয় এটা ঠিক। যেমন নকল পণ্য তৈরি হয়, চোরাচালান হয়। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় এসব স্বভাব ব্যবসায়ীরা প্রকাশ করেন। তাদের অবশ্য দ্রুত আইনের আওতায় আনাও হয়। মনিটরিং চলে। কিন্তু বাঙালি ব্যবসায়ীর মনে এসবের দেখা নেই।
যেমন আগে গুলিস্তানে স্টেডিয়াম মার্কেটে অনেক চোরাই পণ্য বিক্রি হতো। এক লোক সেখান থেকে মোবাইল কিনতে গিয়েছেন। অনেক আগের কথা। নকিয়া বা এ ধরনের কোনো একটা লুক্রেটিভ স্মার্টফোন তখন বাজারে বেশ নাম কামিয়েছে। ভদ্রলোক গেলেন স্টেডিয়াম মার্কেটে সেই সেট কিনতে। এসব চোরাই সেট সাধারণত ছিনতাই-চুরি করা। কম দামে দামি সেট পাওয়ার আশায় তিনি গেলেন। তখনকার স্টেডিয়াম মার্কেটে একদল ঘুর ঘুর করত ক্রেতার আশায়। ওই ভদ্রলোক যাওয়ার পরপরই, কয়েকটি কিশোর এগিয়ে এলো তার দিকে। তিনি জানালেন কী চান। কিশোররা তাকে দাঁড়াতে বলে কোথায় চলে গেল। কিশোররা তাকে একটা মোবাইলের বাক্স দিল। বলল, দ্রুত টাকা দিয়ে চলে যান, পুলিশ আসবে। ভদ্রলোক বোকাই ছিলেন বোধহয়। তিনি টাকা দিয়ে দ্রুত সরে গেলেন। পরে বাক্স খুলে দেখেন মোবাইলের কেসের ভেতর মোবাইল নেই, বালি ভর্তি। এ ঘটনা হয়তো সত্য না। এ সময়ে এসে সত্য মানতে খুব কষ্ট হবে। কিন্তু ঢাকায় ব্যবসা জিনিসটাই গড়ে উঠেছে এ রকম করে।
এখানে বৃষ্টি হলেও জিনিসপত্রের দাম বাড়ে, না হলেও তাই। একবার যে জিনিসের দাম বাড়বে তা কমবে না। মেয়াদোত্তীর্ণ, বিষাক্ত রাসায়নিক মিশ্রিত খাদ্যপণ্য বিক্রির বিষয়গুলো তো প্রমাণিতই। এর কারণ সম্ভবত এমন যে, কলকাতায় যেমন বাঙালি ব্যবসায়ীরা ইংরেজদের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়েছিল, ঢাকায়ও তেমন উন্নতির উল্লম্ফনের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে ব্যবসায়ীরা অসাধু হয়ে উঠেছেন। এর কারণ, শহর হয়ে গেছে পাপের জায়গা। রাজধানী শহর গড়ে ওঠার ইতিহাস যেন মানুষ ঠকানোরই ইতিহাস।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক