শ্যামল এই বাংলায় বিস্তীর্ণ জনপদে শতবর্ষ আগেও রি-সাইকেল পদ্ধতিটি ব্যবহার হতো নকশিকাঁথায়। ব্যবহৃত বেশকটি শাড়ি একত্রে জোড়া দিয়ে জমিন রচনা করে তাতে আবার পুরনো শাড়ির রঙিন সুতা ব্যবহার করা হতো নতুন নকশা তোলার কাজে। এই সহজ জীবনঘনিষ্ঠ শিল্পচর্চায় নকশিকাঁথা সেলাই পদ্ধতিই হলো রি-সাইকেলের স্বর্ণালি অতীতের উদাহরণ। যদিও রি-সাইকেল শব্দটি বিদেশি কিন্তু এর কর্মপদ্ধতি অত্যন্ত পুরনো এবং এর কৌশল সম্পর্কে অনেকে পরিচিত। হয়তো নতুন প্রজন্মের কাছে পুরনো দিনের ঐতিহ্যগত কর্মপদ্ধতিটি অপরিচিত হতে পারে, কিন্তু রি-সাইকেল শব্দটির সঙ্গে বেশ পরিচিত মনে হবে।
কবি বলেছেন, ‘যেখানে দেখিবে ছাই উড়াইয়া দেখ তাই পাইলেও পাইতে পার অমূল্য রতন’। মানে যা কিছু অপ্রয়োজনীয়, তুচ্ছ তারও একটা মূল্য আছে, তবে একটু সাধনা করে পদ্ধতি মেনে কাজটা করতে হবে। রি-সাইকেল জিনিসটাও তেমনি, ফেলে দেওয়া জিনিসটাকে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে পুনরায় ব্যবহার করার উপযোগী করে গড়ে তোলা।
কৃষিপ্রধান এই দেশ কালের বিবর্তনে হয়ে গেল গার্মেন্ট প্রধান দেশ। প্রতিদিন যে পরিমাণ ওয়েস্টেজ ফেব্রিকস, কেমিক্যাল বের হয় গার্মেন্টস থেকে, সে পরিমাণ রি-সাইকেল, আপ-সাইকেল অথবা সাসটেইনেবল ব্যবস্থা গ্রহণ করলে পরিবেশের ক্ষতি অনেকাংশে কমে যেত। হালফ্যাশনের প্রোডাক্ট লাইন প্রোডাকশন করতে করতে, নদী-নালা, খাল-বিল দূষিত হয়ে কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করার পর বাতাসে কার্বন নিঃসরণ, বায়ুদূষণে জর্জরিত যখন আমাদের বায়ুম-ল ঠিক তখনই খবর আসে, চাপ আসে রি-সাইকেল ফ্যাশনের। তখন তড়িঘড়ি দৃষ্টিপাত হয় গ্রিন ফ্যাক্টরির প্রতি। ফ্যাশনের ঝাঁ-চকচকে পণ্যটির পেছনে তৈরির গল্পে কখনো সেরকম উঠে আসে না প্রকৃতি বিনাশের চিত্রধারা। যদি অত্যাধুনিক ফ্যাশন পণ্য প্রোডাক্টশন টেকনোলজির মতো, ফ্যাশন রি-সাইকেলের প্রযুক্তিও সয়লাব হতো তাহলে পরিবেশের এত ক্ষতিকর প্রভাব পড়ত না।
রি-সাইকেল এবং ফ্যাশন রি-সাইকেল কী?
ব্যবহার্য জিনিসের পুনর্ব্যবহারই রি-সাইকেল, তবে পুরনো জিনিস বা অতিরিক্ত জিনিসের সৃজনশীল কর্মপদ্ধতির কারণে সেটা আপ-সাইকেল প্রোডাক্টেও পরিণত হয়। মানে নতুনের চেয়েও আরও আধুনিক টেকসই ও মানানসই মনে হয়। রি-সাইকেল যে শুধু ফ্যাশন পণ্যই হবে সেরকম কিছু নয়, যেমন- সুতা, অ্যাকসেসরিজ, ডাইং বর্জ্য, ফ্যাক্টরির দূষিত পানি (টিটিপি প্ল্যান্ট) রি-সাইকেল পদ্ধতি ইত্যাদি।
ফ্যাশনে রি-সাইকেল পদ্ধতি অনুসরণে ওয়েস্টেজ ফেব্রিকসই বেশি ব্যবহার করা হয়। এ ক্ষেত্রে নিট এবং ডেনিম, ওভেন ব্যবহারকৃত কাপড় অথবা নতুন টুকরো কাপড়ে নিয়ে কাজ করা হয়।
রি-সাইকেল ফ্যাশন নিয়ে ডিজাইনারদের কাজ করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এর ফলে ট্রেন্ডি ফ্যাশনেবল পণ্য যেমন তৈরি করা যায়, তেমনি পরিবেশ রক্ষায় যথেষ্ট ভূমিকা রাখা যায়। উদ্ভাবনী শক্তিতে কাজে লাগানো যায় প্রতি সেন্টিমিটার কাপড়ও। রি-সাইকেল ফ্যাশনের উপাদান হিসেবে অগ্রণী ভূমিকা রাখে রি-সাইকেল ফাইবার থেকে সুতা তৈরির ক্ষেত্রে। ফেলে দেওয়া পানির বোতল থেকে প্লাস্টিকের টিপ বানিয়ে আধুনিক যন্ত্রযোগে সুতা তৈরি হচ্ছে। সেই সুতা দিয়ে তৈরি হয় খেলার জার্সি। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত হোসিয়ারি পণ্যের সব সুতাই কালেকশন করা হয় সোয়েটার ফ্যাক্টরির জুট উলেন কাপড় থেকে বিশেষ পদ্ধতিতে উল সুতা বের করে। পাশাপাশি ফেন্সি আইটেমের জন্য অবশ্য আমদানিকৃত সুতাই ব্যবহার হয়। যদিও সেটা আবার রি-সাইকেল করে নতুন পণ্য তৈরি করা যায়। তাহলে বিষয়টা দাঁড়াল এ রকম রি-সাইকেল ফ্যাশনের অনেক ধারা আছে, যেমন প্রথমে মূল উপাদানগুলো রি-সাইকেল করা যেমন- ফাইবার ও সুতা, দ্বিতীয়ত, কাপড়ের টুকরোগুলো প্যাচওয়ার্কের মতো ব্যবহার করা, তৃতীয়ত, কাপড়ের টুকরো থেকে স্পিনিং করে তুলা তৈরি করে আবার সুতায় রূপান্তরিত করে নতুন কাপড় তৈরি করে।
রি-সাইকেল ফ্যাশন কেন প্রয়োজন?
আসলে একটি সুস্বাদু ভূরিভোজ অথবা মেজবান শেষে হাত ধুয়ে ফেলার পর পরই এর আর একটি পর্ব শুরু হয় সঠিক ময়লা/বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজ। যদি ময়লা-আবর্জনার সঠিক সৎকার না করা হয় এটা দুর্গন্ধ ছড়িয়ে জীবন দুর্বিষহ করে তুলবে। ঠিক তেমনি ফ্যাশন প্রোডকশন করার আগে চিন্তা করতে হবে ফ্যাক্টরির ওয়েস্টেজ বা ঝুট ময়লার কী হবে? রি-সাইকেল বাধ্যতামূলক, আবার রি-সাইকেল ফ্যাশন বৈচিত্র্যেরও নিয়ামক। অবাক করার বিষয়, বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণের ১০ শতাংশের জন্য আমাদের পোশাক শিল্পের টেক্সটাইল ইউনিটই দায়ী। সারা পৃথিবীতে যে পরিমাণ দূষিত পানি উৎপন্ন হয় তার শতকরা ২০ ভাগ উৎপাদনের জন্য ফ্যাশন শিল্পই দায়ী। বর্তমানে ১ মিলিয়ন টনেরও অধিক টেক্সটাইল বর্জ্য উৎপাদিত হয় সারা বিশ্বে। পৃথিবীতে ৫ ভাগের এক ভাগ পানি দূষণের জন্য দায়ী গার্মেন্টস শিল্প। পরিবেশ দূষণের জন্য ৮ শতাংশ অংশীদার এই পোশাক শিল্প এবং দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে পরিবেশ কলুষিত করার ক্ষেত্রে। একটি ফ্যাশনেবল টি-শার্ট তৈরি করতে ২৫০০ লিটার পানির প্রয়োজন হয়। আর এক জোড়া জিনস প্যান্টের ওয়াশিং এবং ডাইং প্রসেসে প্রয়োজন হয় অন্তত সাত হাজার লিটার স্বচ্ছ পানি। একজন মানুষ তার সাত বছরে যে পানি পান করবে সে পরিমাণ পানি লাগে একটি ডেনিম প্যান্টের ওয়েট ওয়াশ প্রসেসে।
এ জন্যই বিদেশিরা পারমাণবিক বোমা বানালেও একটি গার্মেন্টস বানানোর দায়দায়িত্ব থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকে। সব দায়দায়িত্ব আমাদের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের ওপর। কারণ আমরা পরিবেশ বুঝি না, অর্থ বুঝি, সেটা নিজের দীর্ঘমেয়াদি সর্বনাশ ডেকে এনেও। তবুও উন্নতির সূচক আমাদের বাড়িয়েই নিতে হবে। সে জন্য বাধ্যতামূলকভাবে এখন রি-সাইকেল ফ্যাশনে মনোযোগী হতে হবে পরিবেশ রক্ষায়।
দেশীয় ফ্যাশনে রি-সাইকেল কর্মযোগ
বর্তমানে খাদি সুতা তৈরি হচ্ছে গার্মেন্টসের সিনথেটিক সুতা রি-সাইকেল করে। ন্যাচারাল ফাইবার ও সুতা বুননের কাজ হচ্ছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। কোলাজ আকৃতির প্যাচওয়ার্কের কাজ হচ্ছে ফেলে দেওয়া কাপড় রি-সাইকেল করে। সারা দেশে প্লাস্টিকের বোতল সংগ্রহ করার মাধ্যমে রি-সাইকেল করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সুতা তৈরি করা হচ্ছে, যা বছরে শতকোটি টাকা রপ্তানি ব্যবসার হাতছানি দিচ্ছে।
রি-সাইকেল ফ্যাশনকে অনেকে গরিব কাঙালের ফ্যাশন মনে করে। সব ধরনের ক্রেতার গ্রহণযোগ্যতা থাকে না এই পণ্যে। অনেকে ভাবেন জোড়াতালি দেওয়া পণ্যটি কে ক্রয় করবে টাকা দিয়ে। তবে একে আকর্ষণীয় সুরুচিপূর্ণ ফ্যাশনে পরিণত করাই একজন ডিজাইনারের মুন্সিয়ানা। মিরপুর, গাজীপুর, জয়দেবপুর, নারায়ণগঞ্জ, নীলফামারী, চট্টগ্রামসহ দেশের যত গার্মেন্টস ঝুটপট্টি রয়েছে সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে রি-সাইকেল ফ্যাশন উপাদানের মূল সূতিকাগার। যেখান থেকে অ্যাপারেলস, অ্যাকসেসরিজসহ সব উপাদান চলে যায় লোকাল রেডিমেড পোশাক তৈরির কারখানায়।
আন্তর্জাতিক বাজারে রি-সাইকেল ফ্যাশনের ভূমিকা
সারা বিশ্বে অত্যন্ত জনপ্রিয় হচ্ছে জিনস প্যান্ট। অথচ এই জিনস ফ্যাক্টরিগুলোই বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দূষিত পরিবেশ তৈরি করে। এক কিলোগ্রাম ডেনিম কাপড় থেকে বা উৎপাদন করতে প্রায় ৪০ থেকে ৬০ লিটার বর্জ্য তৈরি হয়। এ জন্য এখন ডেনিম উৎপাদনের ক্ষেত্রে রি-সাইকেল পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে, যাতে ‘জি-ওয়েস্ট’ নীতি অবলম্বন করা হয়। যেমন ওজোন ফেইডিং, ই-ফ্লো, এনজাইমভিত্তিক ব্লিচিং ওয়াটার লেজার ফেইডিং ইত্যাদি। নামিদামি ব্র্যান্ডগুলো যেমন মাড জিনস, লিভাইস, জিনোলজিয়া, এভারলেন ইত্যাদি কোম্পানি রি-সাইকেল ‘ওয়াটারলেস’ পদ্ধতিতে ডেনিম প্রোডাকশন করছে। এ ছাড়া ন্যানোবল টেকনোলজি, লেজার টেকনোলজি এবং সাসটেইনেবল গার্মেন্টস ডাইংয়ের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণের মাত্রা কমিয়ে আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। দেরিতে হলেও প্রত্যেক ডাইং ইউনিট কমপ্লায়েন্সের মূল শর্ত এখন রি-সাইকেল পদ্ধতির শতভাগ অনুসরণ করা।
রি-সাইকেল ফ্যাশনের ভবিষ্যৎ কী?
পরিধেয় পোশাকের চাহিদা পূরণের জন্য এর প্রোডাকশন নীতিমালাগুলোর মধ্যে গ্রিন ফ্যাক্টরির পরিবেশ গড়ে তোলা এখন অনেকখানিই বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। ইকো ফ্যাশন, রি-সাইকেল ফ্যাশন এখন নতুন করে ব্র্যান্ডিং হচ্ছে। প্রত্যেক কোম্পানি তাদের ব্র্যান্ডিংয়ে এখন জোর দিচ্ছে রি-সাইকেল ফ্যাশনের প্রতি। কারণ পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখতে হবে যারা পরিবেশ নষ্ট করে তাদেরই। অত্যন্ত আধুনিক টেকনোলজি বের হচ্ছে গার্মেন্টস ওয়েস্টকে রি-সাইকেল করে ব্যবহার করার জন্য। ডিজাইন ডেভেলপমেন্টের ক্ষেত্রে অব্যশই এখন ভাবতে হচ্ছে এর ওয়েস্ট ম্যাটেরিয়ালের ভবিষ্যৎ কী?
সুজলা, সুফলা, শস্য শ্যামলা এ দেশ সারা বিশ্বে গার্মেন্টস খাতে শীর্ষদের মাঝে অবস্থান করছে। কিন্তু দূষণের দিক দিয়েও অন্যদের চেয়ে তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে। এই দুই সহঅবস্থান কোনো জাতির জন্য কল্যাণকর নয়।
তাই গার্মেন্টস তথা ফ্যাশন ডেভেলপমেন্ট এবং প্রোডাকশনের জন্য রি-সাইকেল পদ্ধতি অনুসরণ নৈতিকভাবেই জরুরি। ডিজাইন শুধু ব্যবহার্য বিষয় না হয়ে, মানবের জন্য কল্যাণকর করে তৈরি করতে গেলে এর সৃজনশীলতায় শেষ পরিণতি নিয়েও ভাবতে হবে। না হলে আগামী প্রজন্ম, আগামীর পৃথিবী ফ্যাশনে উন্নতির কথা না বলে দায়ী করবে সুন্দর পরিবেশ বিনষ্টের জন্য। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় যে জাতি যত সর্বোচ্চ সচেতন সে জাতি তত বেশি উন্নত। সেটা মানব সৃষ্ট বর্জ্য হোক অথবা গার্মেন্টস শিল্পের বর্জ্য হোক। তাই গ্রিন ফ্যাশন, সাসটেইনেবল ফ্যাশন যাই বলি না কেন, মূল পদ্ধতি হলো রি-সাইকেল। এর অনুসরণই নিরাপদ ফ্যাশন চক্র গড়ে তোলা সম্ভব।
লেখক : ডিজাইনার ও ফেব্রিকস বিশেষজ্ঞ