ঝুঁকিপূর্ণ রেস্টুরেন্ট ও হোটেলের হিসাব নেই

২২৭৩ কারখানা অগ্নিঝুঁকিতে, মালিকদের বেশিরভাগই প্রভাবশালী, নেওয়া যাচ্ছে না শাস্তিমূলক ব্যবস্থা

আপডেট : ০৪ মার্চ ২০২৪, ১১:৩৯ এএম

বেইলি রোড ট্র্যাজেডির মতো দেশে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই শুধু টনক নড়ে সরকার বা সরকারের সংশ্লিষ্ট নজরদারি কর্র্তৃপক্ষের। শুরু হয় দৌড়ঝাঁপ। তাৎক্ষণিকভাবে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। পাশাপাশি তদন্ত শেষে আবারও জমা পড়ে কিছু সুপারিশ। বাড়ে সুপারিশের স্তূপের উচ্চতা। এ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের আগের তালিকা ধরে চলে বিশ্লেষণ। তালিকা পর্যালোচনা করে শুরু করা হয় হালনাগাদের কাজ। কিন্তু কিছুদিন পরই যেন বোবা হয়ে যান সংশ্লিষ্টরা। একইভাবে রাজধানীর বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর যেসব ভবন, রেস্টুরেন্ট ও কলকারখানা অগ্নিদুর্ঘটনার ঝুঁকিতে রয়েছে, সেগুলোর তালিকা হালনাগাদের তোড়জোড় শুরু হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকাসহ সারা দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে ২২৭৩টি কারখানা অগ্নিদুর্ঘটনার ঝুঁকিতে রয়েছে। ওইসব কারখানায় নেই নিরাপত্তার বালাই। কোনো আইনেরই তোয়াক্কা করছে না এসব কারখানা কর্র্তৃপক্ষ। ভবনগুলোতে নেই বিকল্প সিঁড়ি। নেই কোনো নজরদারি। যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। কারখানার মালিকদের মধ্যে বেশিরভাগই প্রভাবশালী হওয়ায় নেওয়া যাচ্ছে না শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়াতে ইতিমধ্যে এসব কারখানার মালিকদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও অবহিত করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রাজধানীর ঝুঁকিপূর্ণ কারখানাগুলোতে গতকাল রবিবার থেকে অভিযান শুরু হয়েছে। দেশের বাদবাকি জায়গায়ও শিগগিরই একই ধরনের অভিযান শুরু হবে বলে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন।

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, ফরিদপুর, সিলেট, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, চুয়াডাঙ্গা, ফেনীসহ অন্তত ৪৫টি জেলায় ওইসব ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা রয়েছে। কারখানা, রেস্টুরেন্ট, হোটেলসহ কোনো স্থাপনায় যাতে আর কোনো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা না ঘটে, সেজন্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কয়েক দফায় বৈঠক করেছেন। ওইসব বৈঠকে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যেসব কারখানায় পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম নেই, সেগুলোর বিরুদ্ধে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে বলা হয়েছে। এমনকি প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্টদের গ্রেপ্তারেরও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বৈঠকের আলোচনা যেসব বিষয় উঠে আসে, তার মধ্যে রয়েছে : রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝুঁকিপূর্ণভাবে গড়ে উঠেছে অসংখ্য রেস্টুরেন্ট। বাইরে চাকচিক্য থাকলেও এসব রেস্টুরেন্টের ভেতরটা যেন মৃত্যুফাঁদ। আবাসিক ভবনে রেস্তোরাঁর অনুমোদন না থাকলেও নিয়ম ভেঙে ব্যাঙের ছাতার মতো রেস্টুরেন্ট গড়ে উঠছে। একইভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে গড়ে উঠেছে কলকারখানা। জরাজীর্ণ ভবনে ছোট্ট সিঁড়িই আসা-যাওয়ার একমাত্র পথ। কোনো কোনো জায়গায় একমাত্র সেই পথও থাকছে তালাবদ্ধ। কাচঘেরা রেস্টুরেন্ট ভবনের সিঁড়িতে সিলিন্ডার রাখার নিয়ম না থাকলেও রাখা হচ্ছে অহরহ। এসব ভবনে বছরের পর বছর বৈদ্যুতিক লাইনগুলো পরীক্ষা করা হয় না। আবার সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর নিয়মিত তদারকির কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। মাঝেমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের লোকজন নামকাওয়াস্তে তদারকির নামে আসা-যাওয়া করলে কাজের কাজ কিছুই হয় না।

এ প্রসঙ্গে পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে বারবার বলা হলেও মানা হচ্ছে না প্রয়োজনীয় নির্দেশনা। কোনো বড় দুর্ঘটনার পরপরই আমরা নড়েচড়ে বসি। মুনাফালোভী অপরাধীরা মানুষের জীবনের পরোয়া না করেই নিজেদের বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। এখন সময় এসেছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার। ব্যাঙের ছাতার মতো হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও কলকারখানা গড়ে উঠেছে দেশের আনাচকানাচে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ২২৭৩টি কারখানায় অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম নেই বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। তা ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ রেস্টুরেন্ট ও হোটেলের হিসাব নেই বললেই চলে। ইতিমধ্যে আমরা নির্দেশনা পেয়েছি ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা, রেস্টুরেন্ট ও হোটেলগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অ্যাকশনে যেতে।’

এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘সব জেনেও ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে রাজউক, সিটি করপোরেশন, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও বিস্ফোরক পরিদপ্তরের যারা দায়িত্বে আছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে অনেকেই নিয়মের মধ্যে চলে আসবেন। কোনো কারখানার অনুমোদন ও অগ্নিনির্বাপণের সরঞ্জাম আছে কি না তা মনিটরিং করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর। আমরা শুধু শ্রমিকসহ সংশ্লিষ্টদের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখভাল করি। তার পরও আমরা কারখানাগুলো মনিটরিংয়ের আওতায় আনার চেষ্টা করছি।’

অগ্নিনির্বাপণের সরঞ্জাম না থাকা কারখানা এবং হোটেল ও রেস্টুরেন্ট কর্র্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাঈন উদ্দিন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এজন্য একটি তালিকা তৈরি করেছি। যারা আইন অমন্য করবে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বেইলি রোডের যে ভবনটিতে আগুন লেগেছিল সেখানে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। প্রতিষ্ঠানটিকে আগে নোটিসও দেওয়া হয়েছিল।’

পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। প্রাণহানির পাশাপাশি সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে। নানা অব্যবস্থাপনার মধ্যে কলকারখানাগুলোর কার্যক্রম চলছে। অনেক কারখানাতেই নেই অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা। তাদের অনেকে রাজনৈতিক পরিচয়ের দোহাই দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছেন। পোশাক ও কেমিক্যাল কারখানা, ইলেকট্রনিকস, টেক্সটাইল মিল ও ঝুটের গুদামগুলোতে নানা অব্যবস্থাপনা রয়েছে। গাজীপুরে ছোট-বড় প্রায় দুই হাজারের বেশি শিল্প-কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৫ ভাগ কারখানায় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই। কারখানা ও ভবনগুলোর কোটি কোটি টাকার সম্পদের পাশাপাশি লাখো কর্মী রয়েছেন মারাত্মক অগ্নিঝুঁকির মধ্যে। অনেক কারখানার মালিক ফায়ার লাইসেন্স নেওয়ার পর ফায়ার সেফটির দিকে আর নজর দেন না। আবার অনেক মালিক আইন মেনে ভবন তৈরি করেন না।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেসব কারখানা, হোটেল বা রেস্টুরেন্টে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই, সেগুলোর তালিকা করা হয়েছে। কারখানাগুলো মনিটরিং করা হচ্ছে। কোনো ধরনের ছাড় পাওয়ার সুযোগ নেই। বিষয়টি নিয়ে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ কাজ করছে। তা ছাড়া রাজউক ও সিটি করপোরেশনও কাজ করছে।’

রাজধানীতে রেস্তোরাঁয় অভিযান, আটক ২৮ : রাজধানীর বিভিন্ন হোটেল ও রেস্তোরাঁয় অগ্নি নিরাপত্তা নিশ্চিতে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। অভিযানে অগ্নি নিরাপত্তায় বিভিন্ন অনিয়ম পাওয়ায় ২৮ জনকে আটক করা হয়েছে।

গতকাল রবিবার ধানমন্ডি, গুলশান, মিরপুর, উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় এ অভিযান চালানো হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম) ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ‘রাজধানীতে বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় অভিযান চালানো হচ্ছে। অগ্নি নিরাপত্তায় অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দেখা গেলেই আমরা সতর্ক করছি। কিছু কিছু স্থানে আইনগত পদক্ষেপ নিচ্ছি। এখন পর্যন্ত রাজধানী জুড়ে ২৮ জনকে আটক করা হয়েছে। শুধু ধানমন্ডিতেই ১৫টি রেস্তোরাঁয় অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগে ১৯ জনকে আটক করা হয়েছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত