দেশের জনসংখ্যা যেমন বাড়ছে, প্রতিবছর পাল্লা দিয়ে বেকারত্বও বাড়ছে। অর্থনীতিতে সংকটের মধ্যেই দেশের বেকারত্ব হু হু করে বাড়ছে। একই সঙ্গে যার যত শিক্ষা, তার বেকার থাকার ঝুঁকি তত বেশি।
সরকারি হিসাব বলছে, যাদের কোনো শিক্ষা নেই, তাদের বেকারত্ব হাজারে ১৫৩ জন, কিন্তু স্নাতক বা স্নাকোত্তর শেষ করাদের মধ্যে বেকার হাজারে ৭৯৯ জন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ-২০২২-এ এ চিত্র উঠে এসেছে। এবার আসা যাক শিক্ষার স্তরের ভিত্তিতে কোন পর্যায়ে বেকার কত। জরিপের তথ্য বলছে, ২০২২ সালে যারা বেকার ছিলেন, তাদের মধ্যে ১ লাখ ৫৩ হাজারের কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। এ হারটি বেকারদের মধ্যে সবচেয়ে কম। যারা কমপক্ষে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেছেন, বেকার মধ্যে তাদের সংখ্যা ৩ লাখ ২২ হাজার। ৭ লাখ ৩৯ হাজার বেকার তাদের মাধ্যমিক শিক্ষাস্তর পার করেছেন। আবার কমপক্ষে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাস্তর শেষ করাদের মধ্যে ৫ লাখ ৩৬ হাজার বেকার ছিলেন। একই সময়ে ৭ লাখ ৩৯ হাজার বেকার, যারা কি না বিশ^বিদ্যালয় থেকে কমপক্ষে স্নাতক শেষ করেছিলেন। বাদবাকি ৩৩ হাজার বেকার অন্যস্তরের। সব মিলিয়ে ২৫ লাখ ৮২ হাজার বেকার ছিলেন ২০২২ সালে। জরিপে তথ্যের বিশ্লেষণ তুলে ধরে বিবিএস বলছে, যাদের কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, তাদের মধ্যে বেকার হাজারে মাত্র ১৫৩ জন। যারা কমপক্ষে প্রাথমিক শিক্ষার স্তর পার করেছিলেন, তাদের মধ্যে বেকার রয়েছেন হাজারে ৩২২ জন। কমপক্ষে মাধ্যমিক শিক্ষা রয়েছে, এমন শিক্ষিতদের মধ্যে হাজারে ৭৩৯ জন বেকার রয়েছেন। তবে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পার করাদের মধ্যে এ হার কিছুটা কম। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করাদের মধ্যে বেকার হাজারে ৫৩৬ জন।
কিন্তু যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক বা স্নাকোত্তর শেষ করেছেন, দেশে তাদের বেকার থাকার হার বেশি। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২ সাল শেষে এমন উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে হাজারে ৭৯৯ জন বেকার রয়েছেন। অন্যস্তরের শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্ব হাজারে ৩৩ জন। অর্থাৎ শিক্ষা যত বেশি, বেকার থাকার ঝুঁকি তত বেশি।
নারী-পুরুষের হিসাবে দেখা যায়, শিক্ষিত পুরুষের তুলনায় শিক্ষিত নারী বেকারত্বের প্রবণতা বেশি। পরিসংখ্যান বলছে, অশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ, যেখানে পুরুষের হার শূন্য দশমিক ৮৭ শতাংশ, সেখানে নারীর হার ১ দশমিক ৪৯ শতাংশ। কমপক্ষে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেছেন, এমন শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্ব ১ দশমিক ৬৯ শতাংশ। যেখানে পুরুষ ১ দশমিক ৭৩, নারী ১ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
মাধ্যমিক স্তর শেষ করাদের মধ্যে বেকারত্ব ২ দশমিক ৮২, যেখানে পুরুষ ৩ দশমিক ২৬ ও নারী ২ দশমিক ২২ শতাংশ। উচ্চ মাধ্যমিক স্তর শেষ করাদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৮ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এই স্তরে পুরুষ বেকারত্বের হার ৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ, যেখানে নারীর হার ৯ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ।
এ ক্ষেত্রে দেখা যায়, যেসব নারীর শিক্ষিত হওয়ার প্রবণতা যত বেশি, তাদের বেকারত্বের প্রবণতাও বেশি। বিশেষ করে, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করাদের মধ্যে গড় বেকারত্ব ১২ শতাংশ। কিন্তু পুরুষের তুলনায় নারীরা এ ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে। বিশ^বিদ্যালয়ের গ-ি পেরোনো পুরুষদের বেকারত্বের হার ৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ, যেখানে নারীদের হার ১৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
নারীরা উচ্চশিক্ষিত হওয়ার পরও বেকারত্ব বাড়ার কারণ হিসেবে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০১৬ থেকে ২০২২ পর্যন্ত হিসাবে দেখা যায়, উচ্চশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ কমেছে। উচ্চশিক্ষায় তাদের অংশগ্রহণ কম থাকার কারণে দেশের নীতিনির্ধারণী জায়গায় তাদের অংশগ্রহণ কম। উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ কম থাকার কারণে ম্যানেজারিয়াল পদবিগুলোতেও তাদের কর্মসংস্থান কম।
এই অর্থনীতিবিদের মতে, নারীদের অংশগ্রহণ কম হওয়ার পেছনে সামাজিক বৈষম্য, কর্মক্ষেত্রের বৈষম্য এবং বাল্যবিয়ের কারণও কাজ করে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারলে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়বে।
এর আগে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ২০১৬-১৭ সালের জরিপে দেখিয়েছিল, দেশে বেকারের হার ৪ দশমিক ২ শতাংশ। সরকারি উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাধ্যমিক থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের ৩৩ শতাংশের বেশি পুরোপুরি বেকার। শিক্ষিত ও অশিক্ষিত বেকারদের মধ্যে তারতম্য রয়েছে।
শিক্ষিতদের বড় একটি অংশ পছন্দসই কাজ না পাওয়ায় বেকার হয়েছে। তারা ‘ভালো’ কাজ পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। ‘ভালো’ কাজ না পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার মতো আর্থিক সামর্থ্য তাদের রয়েছে। কিন্তু অশিক্ষিত বেকারদের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়। এ কারণে এই শ্রেণিতে বেকারত্ব কম।
জানা গেছে, বাংলাদেশে শিক্ষিত তারুণ্যের বড় একটি অংশ বেকার থাকলেও ভারতীয়, শ্রীলঙ্কানসহ বিদেশি কর্মীরা কাজ করছেন। এর কারণ কাজের জন্য যে দক্ষতা প্রয়োজন, বাংলাদেশি তরুণদের অনেকের মধ্যে তা নেই। বাস্তবতা হচ্ছে, ভারত বা শ্রীলঙ্কার ডিগ্রির মান বাংলাদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তুলনায় অনেক ভালো। এ কারণেই নিয়োগকারীরা বিদেশি কর্মী নিয়োগ দিচ্ছেন।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বিদেশি কর্মীরা সুযোগ পাওয়ার আরও একটি কারণ রয়েছে, বিদেশি কর্মীরা কাজে যতটা মনোযোগী হন, বাংলাদেশি তরুণরা হয়তো ততটা হন না। তারা ভালো সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন, কাজ পরিবর্তন করতে আগ্রহী থাকেন। এসব কারণে তাদের চেয়ে বিদেশিদের প্রাধান্য দিয়ে থাকেন নিয়োগকারীরা। তবে মূল পার্থক্য দক্ষতায়।
