৭ মার্চের ভাষণ পুরো জাতিকে একটি পরিবারে পরিণত করেছিল

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২৪, ০৮:১৮ এএম

রাজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণ দিয়েছিলেন একটি বিশেষ ঘটনার প্রেক্ষিতে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে ১৬২টি আসনে নির্বাচন হয়েছিল। এর মধ্যে ১৬০টি আসনে জয়ী হয়েছিল আওয়ামী লীগ। শুধু তাই নয়, পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান মিলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু পাকিস্তানের তখনকার সামরিক শাসকগোষ্ঠী ও অধিকাংশ পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনীতিকরা আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা ইচ্ছুক ছিল না। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, ক্ষমতা পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনীতিকদের হাতে রাখা। নানা ঘটনার পরে অবশেষে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদ অধিবেশন ডাকেন। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে ১ মার্চ অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য মুলতবি ঘোষণা করেন। জাতীয় পরিস্থিতি কখন কী হয় তা জানার জন্য আমরা তখন রেডিও শুনতাম। তখন সংবাদপত্র তো পাওয়া যাবে পরদিন সকাল পেরিয়ে হয়তো দুপুরে। আর টেলিভিশন তখন ছিল না বললেই চলে। তাই কী হচ্ছে না হচ্ছে তা জানার একমাত্র মাধ্যম ছিল রেডিও। আমার মনে আছে, আমরা কয়েকজন স্কুলের মাঠে রেডিও শুনছিলাম। যখন ১ মার্চ অধিবেশন মুলতবি হওয়ার শুনলাম তখন আমরা যে কয়েকজন ছিলাম তখন একসঙ্গে মিছিল করা শুরু করলাম। কিছুক্ষণ মিছিল করার পর আমাদের মনে হলো, এখানে তো লোকসংখ্যা কম। আমরা তাহলে থানা শহরে যাই। তখন আমরা পনেরো-ষোলোজন মিলে মিছিল করতে করতে থানা শহরে গেলাম। পথে আমাদের সঙ্গে আরও মানুষ যুক্ত হলো। যত সময় যায় মানুষের সংখ্যা শুধু বাড়ছিল। আমরা যেমন মিছিল নিয়ে গিয়েছিলাম তেমনি চারদিক থেকে মিছিল আসছিল। এক মহাযজ্ঞ।

এরপর তো বঙ্গবন্ধু ২ মার্চ ঢাকায় এবং ৩ মার্চ সারা দেশে একযোগে হরতাল ঘোষণা করলেন। সারা দেশে স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালিত হলো। ৩ মার্চ বঙ্গবন্ধু পল্টন ময়দানের বিশাল জনসভায় সমগ্র পূর্ব বাংলায় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। সেখানেই বললেন, ৭ মার্চ একটি জনসভা হবে সেখানে সিদ্ধান্ত হবে সামনে কীভাবে আন্দোলন এগিয়ে নেওয়া হবে। তখন কিন্তু বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই পূর্ব পাকিস্তান চলছিল। সরকারি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা মেনে চলছিলেন। আমাদের বাড়ি থেকে নোয়াখালীর চৌমুহনীর দূরত্ব ছিল আট কিলোমিটার। এটা হেঁটে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। বর্ষাকালে নৌকায় যাওয়া যেত। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, আমরা ঢাকায় যাব। ৬ তারিখ বিকেলে আমরা বের হলাম। কয়েকজন মিলে আমরা চৌমুহনী গেলাম। সেখানকার কয়েকজন বলল, তোমরা কোনোভাবেই ট্রেনে উঠতে পারবে না। তোমরা সোনাপুর চলে যাও, যেখান থেকে ট্রেন ছাড়ে। আমরা বাসে করে চলে গেলাম সোনাপুর। তারপর সেখানে গিয়ে দেখি ট্রেন ভরে গেছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমরা সবাই ট্রেনের ছাদে উঠলাম। সেই ট্রেনে গেলাম আমরা লাকসাম। সেখানে  থেকে একটা লোকাল ট্রেন পেলাম যেটা চাঁদপুর যাবে। আমরা আবার সেটাতে উঠলাম। চাঁদপুর থেকে উঠতে হবে লঞ্চে। লঞ্চঘাটে লঞ্চ অনেক আছে কিন্তু মানুষ তার থেকেও বেশি। জায়গা পাওয়া যায় না। আমরা অনেক লঞ্চ মিস করলাম। সেটা একজন আবার লক্ষ করেছিল। তিনি বললেন, এই তোমরা এই লঞ্চে চলো। আর আমরা একটা লঞ্চে উঠতে পারলাম। শুধু তাই নয়, যেখানে ভাড়া ছিল পাঁচ টাকা সেখানে আমাদের কাছ থেকে ভাড়া নিলেন দুই টাকা। তখন যেন সবাই একটি পরিবারের মানুষ হয়ে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর কথায় সব হচ্ছে। রেসকোর্সে যারা যাচ্ছে তারা সবাই তার কথা শুনতে যাচ্ছে। সঙ্গে যাদের দেখছে সবাইকে আপন মনে করছে। কেউ বাদাম কিনলে সবাইকে দিয়ে খাচ্ছে। কেউ পানি খেলে সবাইকে দিচ্ছে। সব যেন একাকার হয়ে গিয়েছিল। তারপর সকাল ৯টার দিকে আমরা সদরঘাটে এলাম। ফুটপাতে যা পাওয়া যায় তাই কিনে খেলাম। তখন চারদিক থেকে শুধু মিছিলের স্রোত যাচ্ছে রেসকোর্স ময়দানের দিকে। আমরা সেই স্রোতে মিশে গেলাম। এসে বসলাম টিএসসি থেকে একটু দূরে। চারদিকে শুধু স্লোগান। ডেউয়ের মতো ভেসে বেড়াচ্ছে। কেউ স্লোগান ধরলেই গলা মেলানোর লোকের অভাব নেই। ‘তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা; পিন্ডি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা; বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো বাংলাদেশ স্বাধীন করো, শেখ মুজিবের পথ ধরো বাংলাদেশ স্বাধীন করো, তুমি কে আমি কে, বাঙালি বাঙালি।’ চলছে তো চলছে। বিরাম নেই। সবার হাতে একটি করে বাঁশের লাঠি। আমরা বুঝেছি যে, বঙ্গবন্ধু আমাদের একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেবেন, সেটা নিয়ে আমরা গ্রামে ফিরে যাব। তিনি সেই নির্দেশনাই দিলেন। প্রস্তুত হতে বললেন, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলতে বললেন। বলে দিলেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। তিনি সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তুলতে বলছিলেন।

আমাদের মাথার ওপরে কিন্তু হেলিকপ্টার ঘুরে বেড়াচ্ছিল। তিনি সব হিসাব করে কিন্তু ভাষণ দিয়েছিলেন। তার কথা মতো আমরা গ্রামে ফিরে এলাম এবং সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তুললাম। সেখানে যুবক ছেলেরা প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করল। আর্মি অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকদের আমরা খুঁজে বের করলাম এবং প্রশিক্ষণ নিলাম। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চে আমাদের কী করতে হবে তা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। আর আমরা দেশের সবাই মিলে যে একটি পরিবার আমাদের যে নিজেদেরই নিজেদের সাহায্য করতে হবে সেটা ৭ মার্চে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। যারা সেদিন রেসকোর্সে উপস্থিত ছিল তারা সবাই নিজেদের একটি পরিবারের লোকই ভেবেছিলেন।

লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠক , সভাপতি (ব্রিগেড ’৭১)

অনুলিখন : এনাম-উজ-জামান

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত