বর্তমান বিশ্বের আধুনিক বিজ্ঞান এমন সব উন্নতি সাধন করেছে যা সাধারণ চিন্তাধারার বাইরে। আমাদের বিবেক-বুদ্ধি সেগুলো দেখে বিস্মিত ও বিহ্বল হয়ে পড়ে। বর্তমানে মানুষের উদ্ভাবনগুলো সৌরজগৎ ভেদ করে মহাকাশের বিশালতাকেও ছেদ করেছে। এমনকি মঙ্গলগ্রহ-সহ সব গ্রহে তাদের দীপ্ত পদচারণা পরিলক্ষিত হচ্ছে।
আজ থেকে এক শতাব্দী পূর্বে এসব অলীক স্বপ্ন এবং রূপকথার কাল্পনিক জিনিস ছিল। যদি কেউ এই ধরনের চিন্তা ও ধারণা করত, তবে তাকে পাগল মনে করা হতো। আর আজকের বিশ্বে এগুলো বাস্তবতার ইতিহাস গড়েছে। অথচ চৌদ্দশত বছর আগে আরবের মরুভূমিতে মদিনার মসজিদের মিম্বার থেকে আকাশের বিশালতা ও দূরত্ব সম্পর্কে অনেক আয়াত উচ্চারিত হয়েছিল, যা নিয়ে বহু শতাব্দী ধরে অস্পষ্টতা ছিল। আর বর্তমানে এই আধুনিক ও উন্নত শতাব্দীতে এসে মানুষের গবেষণা ও বিজ্ঞান সেগুলোকে সত্য ও সঠিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছে। এখানে এমন কিছু আয়াত উপস্থাপন করছি যা মহাবিশ্বের বিশালতা নিয়ে গবেষণা করা বিজ্ঞানীদেরও অবাক করেছে।
চন্দ্র-সূর্যের আবর্তন ও কক্ষপথ : যখন কেউ জানত না যে, চন্দ্র-সূর্য একটি নির্দিষ্ট হিসাব ও কক্ষপথ অনুযায়ী তাদের কাজ সম্পাদন করে থাকে, তখন আল্লাহতায়ালা এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘সূর্য ও চন্দ্র আবর্তন করে নির্ধারিত কক্ষপথে।’ -সুরা আর রহমান, আয়াত ০৫
নোনা জল ও মিষ্ট জলের সমন্বয়ে প্রবাহিত সাগর : মহাবিশ্বের স্রষ্টা মহান আল্লাহ পৃথিবীতে নোনা জল এবং মিষ্ট জলের মধ্যে পার্থক্য বর্ণনা উল্লেখ করে বলেন, ‘তিনিই দুই সাগরকে এভাবে প্রবাহিত করেন যে, তারা পরস্পর মিলিত হয়, কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদের মধ্যে থাকে এক অন্তরাল, যা তারা অতিক্রম করতে পারে না।’ -সুরা আর রহমান, আয়াত ১৯-২০
সূর্য ও পৃথিবীর প্রদক্ষিণ : প্রাচীনকালে এটি বিশ্বাস করা হতো যে, পৃথিবী স্থির এবং সূর্য তার চারপাশে ঘূর্ণায়মান। একটি তত্ত্ব এটাও ছিল যে, সূর্য তার জায়গায় স্থির। কিন্তু কোরআনে বলা হয়েছে, ‘সূর্য আপন গন্তব্যের দিকে পরিভ্রমণ করে। এগুলো মহাপরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ (আল্লাহ) কর্র্তৃক স্থিরীকৃত (ব্যবস্থাপনা)।’ -সুরা ইয়াসিন, আয়াত ৩৮
সৌরজগৎ ও ছায়াপথ : বিজ্ঞানীরা আজ অবগত হয়েছেন, সূর্যকে যে স্থির বলে মনে করা হতো, আসলে তার সমগ্র সৌরজগৎ এমনকি সমগ্র ছায়াপথসহ একটি অজানা গন্তব্যের দিকে চলমান। চৌদ্দশত বছর আগে আরবে যখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ছায়াতলে ইসলামের বিকাশ ঘটেছিল, তখনকার জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতেন যে, চাঁদ, সূর্য ও নক্ষত্ররাজি আসলে আকাশে ঝুলন্ত প্রদীপ সদৃশ ও স্থির। কিন্তু কোরআনে তাদের এই ধারণাকে খণ্ডন করে বলা হয়েছে, ‘সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় চন্দ্রের নাগাল পাওয়া। রজনীর পক্ষে সম্ভব নয় দিবসকে অতিক্রম করা। আর প্রত্যেকেই নিজ নিজ কক্ষপথে ভেসে বেড়ায়।’ -সুরা ইয়াসিন, আয়াত ৪০
আকাশ ও মহাকাশের সম্প্রসারণ : আকাশকে তার জায়গায় স্থির বলে মনে করা হতো। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান যখন মানুষকে এই আকাশ ও মহাকাশের বিশালতায় প্রবেশাধিকার দিয়েছে, তখন প্রকাশ পেয়েছে যে, এটি ক্রমাগত সম্প্রসারিত হচ্ছে। আল্লাহতায়ালা কোরআনে বলেন, ‘আমি আকাশ নির্মাণ করেছি আমার ক্ষমতাবলে এবং আমি অবশ্যই মহাসম্প্রসারণকারী।’ -সুরা জারিয়াত, আয়াত ৪৭
অবশ্যই একজন মুসলিম হিসেবে এটি আমাদের জন্য গর্বের বিষয় যে, আজ বিজ্ঞান যা আবিষ্কার করেছে ও করছে সবই চৌদ্দশত বছর আগেই কোরআন আমাদের সেটার সূত্র দিয়েছে। একই সঙ্গে আমাদের জন্য এটাও গর্বের বিষয় যে, এই কোরআন আমাদের জন্যই নাজিল হয়েছে। আল্লাহতায়ালা এটিকে মানব জীবনের সম্পূর্ণ জীবনবিধান হিসেবে প্রেরণ করেছেন এবং আমাদের বলেছেন, ‘এতে (কুরআনে) চিন্তাশীল ও বিচক্ষণ মানুষের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’
আজকের বিশ্ব জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প-সংস্কৃতির বিশ্ব। উন্নত বৈজ্ঞানিক বিকাশের বিশ্ব। যুগ-যুগান্তর ধরে মুসলমানরাই বৈজ্ঞানিক বিপ্লব ঘটিয়েছেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, আজ আমরা আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য ভুলতে বসেছি। যে কারণে অন্যরা এই ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে। অথচ আমাদের উচিত ছিল, কোরআন গবেষণা করে বৈজ্ঞানিক বিপ্লব ঘটানো। মুসলমানরা জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা থেকে পিছিয়ে আসার ফলে সে শূন্যস্থান পূরণ করে সামনে এগিয়ে এসেছে অন্যরা। যার ফলে তারা বিপুল শক্তি-সামর্থ্য নিয়ে সারা বিশ্বকে শাসন করছে। তারা আজ ভাগ্য নিয়ন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ পাশ্চাত্যের এই জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রাগ্রসরের পেছনে রয়েছে মুসলিম বিজ্ঞানীদের বিশাল অবদান।
