হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ২৫টি মামলায় দুই দিনে (গত সোম ও মঙ্গলবার) অন্তত ২৬ আসামির জামিন হয়েছে। মামলাগুলোতে মাদকের (হেরোইন) পরিমাণ কমপক্ষে ৫০ গ্রাম থেকে ১ হাজার ৫৬ গ্রাম পর্যন্ত উল্লেখ আছে। আইনের বিধান অনুযায়ী, অভিযোগ প্রমাণ সাপেক্ষে এসব মামলায় সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। তবে, রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল বুধবার ও বৃহস্পতিবার (১৪ মার্চ) দুই দিনে এসব মামলায় আসামিদের জামিন স্থগিত করেছেন সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার আদালত। গত তিন বছর বা এর কম সময়ে দায়ের হওয়া গুরুতর এসব মামলায় জামিনের ঘটনাকে ‘অস্বাভাবিক’ বলেছেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা এ এম আমিন উদ্দিন।
তিনি বলেছেন, তারা আশ্চর্য হয়েছেন। অতীতে হাইকোর্টের কোনো বেঞ্চে এমন হয়নি। এতে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের বিচারপতি তার বিচারিক ক্ষমতার সঠিক প্রয়োগ করেননি বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
মামলার নথি অনুযায়ী, ঢাকার কেরানীগঞ্জ, গাজীপুরের কালীগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, কক্সবাজার, নাটোরসহ বিভিন্ন জেলার সংশ্লিষ্ট থানাগুলোতে ২০২১ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে ৯৩০ গ্রাম, ৫০০ গ্রাম, ৩০০ গ্রাম, ২৮৫ গ্রাম, ২০০, ১০৩, ৮০ ও ৭৭ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের এসব মামলাগুলো রুজু হয়। গত ১১ ও ১২ মার্চ মামলাগুলোতে জামিনের পর গত বুধবার ১২টি মামলায় এবং বৃহস্পতিবার ১৩টি মামলাসহ ২৫টি মামলায় অন্তত ২৬ আসামির জামিনের আদেশের ওপর আট সপ্তাহের স্থগিতাদেশ দিয়েছেন চেম্বার আদালতের বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম। হাইকোর্টের জামিন আদেশের বিরুদ্ধে আপিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে রাষ্ট্রপক্ষ।
জানা গেছে, হাইকোর্টের একটি দৈত বেঞ্চে এই জামিনের আদেশগুলো হয়েছে। এই বেঞ্চে দুদক, মানিলন্ডারিং সংক্রান্ত রিট মামলা ও ফৌজদারি রিভিশন মামলার শুনানি হয়।
বৃহস্পতিবার বেলা দুইটার পর সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সারওয়ার হোসেন বাপ্পি, একেএম আমিন উদ্দিন মানিক। তবে, অ্যাটর্নি জেনারেল জামিনকে অস্বাভাবিক বললেও বিচারপতির নাম উল্লেখ করেননি।
তিনি বলেন, ‘আমরা জামিনের এসব ঘটনায় তো আশ্চর্য হয়ে গেলাম যে, এত পরিমাণ মাদক পাওয়া গেছে, এই মামলাগুলোতে সর্বোচ্চ শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড। এটা তে জামিন হয়ে যায়! এটা (জামিন) আমাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। এত বেশি পরিমাণ মাদকের মামলায় এর আগে জামিন হতে দেখিনি। আমার কাছে কষ্টদায়ক মনে হয়েছে যে, একদিন বা দুইদিনে এতগুলো জামিন হয়ে গেছে, আমার কাছে খুব হতাশাজনক মনে হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জামিনের ক্ষেত্রে আদালতকে এই ধরণের সিদ্ধান্ত আসতে হবে যে, এই মামলায় আসামির খালাস পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। বিচারক হিসেবে তার যে দায়িত্ব আছে, সেই দায়িত্বটা তিনি দেখবেন, আইন দেখবেন। উনার (বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি) বিবেচনায় উনি সঠিক মনে করেছেন। কিন্তু আমাদের বিবেচনায় এটা ঠিক হয়নি।’
এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, ‘মাদকের মামলা নিয়ে আমরা এত পরিমাণ কথা বলছি। এখন এ ধরনের মামলায় যদি আসামিকে ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে সমাজের কি অবস্থা হবে? এটা আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। মাদকের মামলাগুলোকে অন্য মামলাগুলোর সঙ্গে একই তুলনায় বিচার করা যাবে না। মাদকের মামলাগুলো কঠোরভাবে দেখতে হবে এই কারণে যে, মাদক একটা সমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। মানুষকে শেষ করে দিচ্ছে। মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর আইন করেছে। মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। সেই মৃত্যুদণ্ডের বিধান যেখানে আছে, সেখানে জামিনের ক্ষেত্রেও আদালত তার বিশ্লেষণটা সঠিকভাবে করতে হবে। জামিনের ক্ষেত্রে দুই বছর জেলে আছে, ছয় মাস জেলে আছে, এটা কোনো কারণ হতে পারে না।’
এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা যেহেতু আপিল বিভাগে গিয়েছি, আমাদের কাছে মনে হয়েছে উনি (বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক) সঠিকভাবে বিচারটা করেননি। আমাদের যে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তিনি বিরোধীতা করেছেন। শুনানি করেছেন। কিন্তু আদালত উনার বক্তব্যটা আমলে না নিয়ে জামিন দিয়েছেন। উনি (বিচারপতি) তার বিচারিক ক্ষমতাকে সঠিকভাবে প্রয়োগ করেননি।’
বিষয়টি প্রধান বিচারপতির নজরে আনা হবে কি না- এমন প্রশ্নে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা বলেন, ‘কোনো মামলায় আমরা যদি মনে করি যে, সঠিকভাবে বিচার হয়নি, আইন অনুযায়ী আমাদের যে বিধান আছে, আমরা আপিল করি। আমরা আপিল করেছি। এটা তো কোর্টে (আপিল বিভাগ) আসবেই। আজকে চেম্বার জজ ফিক্সড (আপিল বিভাগে) করে দিয়েছেন। এখন কোর্ট নিজেরাই দেখবেন। এতগুলো মামলা শুনানিতে আসবে। তখন নিশ্চয় তাদের (আপিল বিভাগ) দৃষ্টিগোচরে আসবে যে, এত মামলায় হঠাৎ জামিন হলো কেন?’
একাধিক মামলার নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০২২ এর ১৯ ডিসেম্বর নাটোরের উত্তর বড়গাছা এলাকায় ১ হাজার ৫৬ গ্রাম (১ কেজি ৫৬ গ্রাম) হেরোইন উদ্ধারের পর মোস্তাকিম হোসেন মুন্না (৩২) ও মো. শাহাদাৎ আলী নামে দুজনকে আসামি করা হয়। মুন্নার কাছ থেকে ৮৪০ গ্রাম ও শাহাদাতের কাছ থেকে ১০৭ গ্রাম করে ২৪০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় ২০ ডিসেম্বর নাটোর সদর থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় একটি মামলা হয়। গত ১১ মার্চ হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে জামিন পান শাহাদাৎ আলী। তবে, তার জামিনের আদেশের ওপর গত বুধবার স্থগিতাদেশ দেন চেম্বার আদালত। এ মামলার নথিতে শাহাদাত আলীর আইনজীবী হিসেবে নাম রয়েছে অ্যাডভোকেট রায়হানা নাজনীন জুইয়ের। তার সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করে বলেন, আসামি হাইকোর্টে জামিন পেলেও এখনও কারামুক্ত হননি। আর চেম্বার আদালতের আদেশের বিষয়টি তিনি এখনও জানেন না।
গত বছরের ২৫ মে কক্সবাজারের ঝিলংজার খুরুলিয়া দরগাপাড়াস্থ কক্সবাজার- চট্টগ্রাম মহাসড়কের একটি কমিউনিটি সেন্টারের সামনে থেকে শ্যামলী পরিবহণের একটি বাসে তল্লাশি চালিয়ে ৯৩০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধার করে পুলিশ। এ মামলায় আসামি করা হয় এমরান (৩৮) ও নুরুল হক বাবুলকে (৪১)। গত সোমবার হাইকোর্টের ওই বেঞ্চে জামিন পান এমরান। তবে, রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে গত ১৩ মার্চ এমরানের জামিনের ওপর স্থগিতাদেশ দেন চেম্বার আদালত। মামলার নথিতে আইনজীবী হিসেবে নাম রয়েছে অ্যাডভোকেট নূর আহমেদের। তবে, একাধিকবার মোবাইলে যোগাযোগ করেও তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
২৫ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হিসেবে শুনানিতে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সাইফুদ্দিন খালেদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে জানান, জামিনের বিরুদ্ধে যথাসাধ্য বিরোধীতা করে তিনি শুনানি করেছিলেন। কিন্তু আদালত তা আমলে নেননি। তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি এমন ছিল যে, সোমবার হয় তো কোনো গ্রাউন্ডে (যুক্তি) একজন আসামির আইনজীবী জামিন নিয়ে গেলেন। পরদিন অন্য আইনজীবী তার আসামির পক্ষে জামিনের দরখাস্ত দিয়ে বলেন, ওই আসামি জামিন পেলে তিনিও জামিন পাবেন। এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে নোট দেওয়ার পর চেম্বার আদালতে আবেদন করা হয়।’
