শিক্ষার্থীদের দিয়ে ফাঁদ পেতেছে চীনা প্রতারক চক্র

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০২৪, ১১:৫১ এএম

দেশজুড়ে বিভিন্ন প্রতারণার ফাঁদ পেতেছে এক শ্রেণির চীনা নাগরিক। এই প্রতারক চক্রের মূল অস্ত্র চীনে পড়তে যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা। এদের ব্যবহার করে বিভিন্ন অ্যাপস খুলে, জুয়ার সাইট চালিয়ে এবং অনলাইনে মালটিলেভেল মার্কেটিংয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তারা কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করছে।

ঢাকার বিমানবন্দর থানা এলাকা থেকে সম্প্রতি এমন চক্রের তিন বাংলাদেশি চাইনিজ শিক্ষার্থীকে ৩০টি ভারতীয় সিমসহ গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

ডিবি সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগের ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিমের ইনচার্জ এডিসি মো. সাইফুর রহমান আজাদ ও এসি শিপ্রা রাণী দাসের নেতৃত্ব অভিযানে গ্রেপ্তার তিনজন হলেন রাকিবুল ইসলাম রাতুল (২৪), আসাদুজ্জামান রাজু (২৯) ও মামুন হাওলাদার (২৭)।

ডিবির দাবি, বাংলাদেশ থেকে অনেক শিক্ষার্থী চীনে মেডিকেল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য যায়। সেখানে গিয়ে তারা চাইনিজ ভাষায় পারদর্শী হয়ে ওঠে এবং চীনের বিভিন্ন প্রতারক চক্রের সঙ্গে তাদের সখ্য গড়ে ওঠে। পরে দেশের সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করতে তারা নিজেরাই চাইনিজদের সঙ্গে সংঘবদ্ধভাবে প্রতারণায় নামে। এ চক্রের মূলহোতা চাইনিজরা। বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় তাদের প্রতারণার ফাঁদ রয়েছে। তারা ভালো, বাংলা বা ইংরেজি বলতে পারে না। তাই তারা চীনে পড়তে চাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে। চাইনিজ ভাষায় পারদর্শী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের দিয়ে তারা প্রতারণার কাজটি করছে।

গোয়েন্দা পুলিশ জানায়, চাইনিজরা চীনেও প্রতারণার ক্ষেত্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাজে লাগায়। আবার কিছু শিক্ষার্থীকে কীভাবে টাকা ইনকাম করা যায় এ বিষয়ে মগজ ধোলাই করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়। এসবের মূল পরিকল্পনাকারী হচ্ছে চীনের দুজন—গাগা ও চিং চং। তারা প্রতারণার জন্য চীনে একটি সার্ভার স্থাপন করেছে। সেখান থেকে চিং চং বিকাশ, নগদসহ ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে প্রতারণা করে। এরপর ক্রিপ্টো কারেন্সির মাধ্যমে টাকা তাদের দেশে নিয়ে যায়।

গ্রেপ্তার রাতুল, রাজু ও মামুন সম্পর্কে ডিবি জানায়, তারা বাংলাদেশ থেকে পড়াশোনার উদ্দেশ্যে চীনে গিয়েছিল। সেখানে সবাই তথ্য-প্রযুক্তি সম্পর্কে যথেষ্ট পারদর্শী হয়ে ওঠে। চাইনিজরা তাদের বলে, তারা কিছু অ্যাপস তৈরি করেছে। অ্যাপস ব্যবহার করে অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করা সম্ভব। তাদের সেই কার্যক্রমে কিছু বাংলাদেশি সিম, বিকাশ/নগদ অ্যাকাউন্ট, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট প্রয়োজন। সবাই মূলত স্বল্পসময়ে অবৈধভাবে অধিক উপার্জনের আশায় এ প্রতারণার কাজে যুক্ত হয়ে চাইনিজদের বাংলাদেশি সিম বিকাশ/নগদ অ্যাকাউন্ট, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সরবরাহ করে। প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে কিছু মানুষকে প্রতারিত করতে সক্ষম হওয়ার পর তারা এ কাজ অব্যাহত রাখে এবং স্বল্পসময়ে অনেক টাকা আয় করে।

ডিবি আরও জানায়, রাতুল, রাজু, মামুন অনলাইনে মালটিলেভেল মার্কেটিং, অনলাইন ফিন্যান্সিং, বেটিং সাইট, সি-ফাইন্যান্স, লোন অ্যাপস, হানিট্রাপেও সরাসরি জড়িত। গ্রেপ্তাররা চাইনিজ প্রতারক চক্রের হয়ে বাংলাদেশি এজেন্ট হিসাবে কাজ করে। এ চক্রে দেশি-বিদেশি আরও নানা লোকজন জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য মিলেছে। চক্রটি মানুষকে অনলাইনে টাকা উপার্জনের কিংবা পার্টটাইম চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়ে আত্মসাৎ করে থাকে। তারা সিম রেজিস্ট্রেশনের সময় কৌশলে একাধিক ফিঙ্গার প্রিন্ট সংগ্রহ করে একটি মোবাইল ফোনে ১০০টি বিকাশ অ্যাকাউন্ট তৈরি করে। লালমনিরহাট, জামালপুর, সাভারসহ বিভিন্ন স্থানের প্রতিনিধিদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সংগ্রহপূর্বক সাভার ইপিজেডে চাইনিজ প্রতারকের মাধ্যমে মূল পরিকল্পনাকারী গাগা ও চিং চং নামক দুই চাইনিজের সঙ্গে বাংলাদেশি চাইনিজ ছাত্ররা মূল লিঙ্ক হিসাবে কাজ করে। প্রতারণার কাজে তারা ভারতীয় সিম ব্যবহার করে। এর আগেও অ্যামাজন, দারাজ, ফ্লিপকার্ট, পিকাবোর মতো মালটিন্যাশনাল কোম্পানির নামে ভুয়া সাইট খোলা হয়েছিল। তখন দুই চীনা নাগরিকসহ ১২ জনকে গ্রেপ্তার করেছিল ডিবি। এঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে নতুন করে এ চক্রের সন্ধান মেলে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত