‘১১ মাস ঘরে বন্দী রাখে মাফিয়ারা’

আপডেট : ২০ মার্চ ২০২৪, ০৯:৩৬ পিএম

শরীয়তপুর সদর উপজেলার আংগারিয়া ইউনিয়নের উত্তর ভাসানচর গ্রামের ফেরদাউস মাদবর। দালালের উচ্চাভিলাষী কথায় ২০২২ সালের মার্চে ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে ইউরোপ যাত্রায় সঙ্গী হয়েছিলেন। কিন্তু লিবিয়ায় গিয়ে তার যাত্রা থেমে যায়। কারণ সেখানে দেশীয় দালালরা তাকে ওই দেশের মাফিয়াদের কাছে বিক্রি করে দেন। তারপর মুক্তিপণ হিসেবে সেই মাফিয়ারা দাবি করেন ১১ লাখ টাকা। পরিবার টাকা দিতে না পারায় দীর্ঘ ১১ মাস মাফিয়ারা তাকে বদ্ধ ঘরে বন্দী করে রাখেন। এ সময় তাকে প্রচন্ড শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেছে দালালরা। গত ডিসেম্বরে অসুস্থ শরীর নিয়ে দেশে ফিরেছেন। কাঁধে করে এনেছেন ১৫ লাখ টাকার ঋণ।  

ভুক্তভোগী ফেরদাউস কান্নাজড়িত কণ্ঠে দেশ রূপান্তরকে বলেন, অবৈধ পথে লিবিয়া যাওয়ার পর দালালরা আমাকে মাফিয়াদের হাতে তুলে দেয়। তারা একটি ঘরে আমিসহ ৫০ জনকে বন্দী করে রাখেন। মুক্তিপণ হিসেবে দাবি করেন ১১ লাখ টাকা। টাকার জন্য হাত-পা বেঁধে আমাকে মারধর করে তার ভিডিও ধারণ করতো মাফিয়ারা। সেই ভিডিও আমার পরিবারের কাছে পাঠানো হত। এ ভিডিও দেখে আমার বাবা ৬ লাখ টাকা ম্যানেজ করে তাদের পাঠায়। বাকি টাকার জন্য রোজ মারধর করতো। 

দীর্ঘ ১১ মাস আমাকে খেতে দেওয়া হয় পাঁচ টাকার রুটি আর লবণাক্ত পানি। সেই খাবার খেয়ে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। এভাবে অন্ধকার ঘরে অমানবিক জীবন পার করেছি। এক পর্যায়ে তারা আমাকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। জেলখানায় কয়েক মাস থাকার পর আমি ছাড়া পাই। তারপর বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে ফের দেশে ফিরেছি।

গত ডিসেম্বরে বাড়ি ফেরার পর হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিয়েছি। তবুও এখনও পুরোপুরি সুস্থ হতে পারিনি। তাই কোন কাজ করতে পারি না। এদিকে বিদেশে পাড়ি দেওয়ার আগে সুদে নেওয়া ঋণ বাড়তেই আছে।  ইতালি যাওয়ার স্বপ্নে স্থানীয় এক সুদ কারবারির কাছে ৬ লাখ টাকা ঋণ করেছিল আমার বাবা। শর্ত ছিলো লাখে মাসে দিতে হবে ২ হাজার টাকা। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধ না হলে সুদের টাকা আরও বাড়বে। সুদ নেওয়ার সময় স্থানীয় মুরব্বিদের স্বাক্ষী রাখা হয়েছিল। আর বাকি ৫ লাখ টাকা নিয়েছিলাম কয়েকটি এনজিও থেকে।

এনজিও থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি জমা দিতে হয়। আমারসহ কয়েকজন আত্মীয়ের জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি জমা দিয়ে পৃথকভাবে এক লাখ করে  ৫ লাখ টাকা জোগাড় করেছিলাম। মোটা অঙ্কের এ টাকা সংগ্রহে আমার তেমন কষ্ট হয়নি। তবে এখন ঋণের টাকা শোধ করতে না পেরে খুবই অর্থকষ্টে দিন পার হচ্ছে। 

অবৈধপথে ইউরোপ যাত্রায় আমার মোট ২২ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। যার ১৮ লাখ টাকা আমি সুদ ও এনজিও মাধ্যমে পেয়েছি। এখনও সুদের ১০ লাখ টাকা আমি পরিশোধ করতে পারিনি। কারণ বছর শেষ হলেও সুদের টাকায় বাড়তে থাকে। আমার মতো আরও দুইজন সুদ ও এনজিও থেকে টাকা নিয়ে গিয়েছিল। এখন তারা বাড়ি বিক্রি করে দেনা শোধ করতে হচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত