মৃত্যুর কাছে হেরে গেল আনিকার উচ্চশিক্ষা অর্জনের স্বপ্ন। তিনি মেঘনা নদীর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার চরসোনারামপুর এলাকায় গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ডুবে যাওয়া ভ্রমণতরীর যাত্রী ছিলেন। দুই দিন পেরিয়ে গেলেও তার মরদেহ উদ্ধার করতে পারেননি উদ্ধারকারী দল।
আনিকা আক্তার (১৯) নরসিংদীর বেলাবো উপজেলার দড়িকান্দি গ্রামের দারু মিয়ার মেয়ে। তিনি বান্ধবীর সঙ্গে নৌকায় ঘুরতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন। শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে বালুবাহী বলগেটের ধাক্কায় তাদের বহনকারী ট্রলারটি ডুবে যায়। এ ঘটনায় আরও নিখোঁজ পাঁচজন।
আনিকা চলতি বছর নরসিংদী মডেল কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছেন। বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছিলেন। দুই ভাই সোহেল মিয়া আর মেহেদি হাসানের মধ্যে সে ছিল একমাত্র আদরের ছোটবোন। বড় দুই ভাই কর্মজীবী। বেশি পড়াশোনা করেননি। তাদের প্রচেষ্টায় আনিকার শিক্ষাজীবন চলছিল। আনিকাসহ সবার স্বপ্ন ছিল সে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করবে। পরিবারের সম্মান বৃদ্ধি করবে।
আনিকার বড়ভাই সোহেল মিয়ার সঙ্গে কথা হয় মেঘনা নদীর ভৈরবপাড়ে। তিনি জানান, শুক্রবার বাড়ি থেকে তার বান্ধবী রুবার বাড়িতে বেড়াতে যায়। সেখান থেকে তার সঙ্গে বিকেলে ভৈরবের মেঘনা ব্রিজ দেখতে এসে নদীভ্রমণের জন্য আনিকা ও তার বান্ধবী রুবা নৌকায় ওঠেন। নৌকায় ভ্রমণের সময় একটি বালুবাহী বলগেটের সঙ্গে ভ্রমণতরীর ধাক্কা লেগে নদীতে ডুবে যায়। রুবা সাঁতার কেটে প্রাণে বেঁচে ফিরলেও ডুবে যায় আনিকা। পরে রুবা মোবাইলে ঘটনা জানায় তাকে। খবর শুনেই ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন তিনি। কিন্তু
বোনের মরদেহের সন্ধান পাননি এখনো।
ভ্রমণতরী ডুবির ঘটনায় এখন পর্যন্ত তিনজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এরা হলেনÑ শহরের কমলপুর এলাকার সুবর্ণা বেগম (২০), ভৈরব হাইওয়ে পুলিশের কনস্টেবল সোহেল রানার স্ত্রী মৌসুমী বেগম (২৫) ও আমলাপাড়া এলাকার চন্দন দের শিশুকন্যা আরাদ্ধ দে (১২)।
এখনো নিখোঁজ আছেন ভৈরব হাইওয়ে থানা পুলিশের কনস্টেবল সোহেল রানা (৩২), মেয়ে মাহমুদা (৭) ও ছেলে রাইসুল (৫), ভৈরবের আমলাপাড়ার দোলন দে (৩৫) এবং আনিকা আক্তার (১৯)।
গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার চরসোনারামপুর এলাকায় এ দুর্ঘটনাটি ঘটে।
খবর পেয়ে ভৈরব নদী ফায়ার সার্ভিস ও নৌ ফাঁড়ির সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার কাজ করেন।
ভৈরব ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার আজিজুল হক রাজন ও নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মনিরুজ্জামান জানান, শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে ভৈরব থেকে ২০ জন যাত্রী নিয়ে একটি ভ্রমণতরী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের চরসোনারামপুর এলাকায় পৌঁছলে একটি বালুবাহী বলগেটের সঙ্গে ধাক্কা লেগে ডুবে যায়। এতে ১২ জন সাঁতরে তীরে উঠতে পারলেও আটজন নিখোঁজ হয়। পরে সুবর্ণা বেগমের লাশ উদ্ধার করে দমকলকর্মীরা।
গতকাল সকাল ৮টার দিকে কিশোরগঞ্জ ও ভৈরবের ডুবুরি দল ও দমকলকর্মীরা এসে আবার উদ্ধার কাজ শুরু করে।
পরে সকাল ১০টার দিকে বিআইডব্লিউটিএর উদ্ধারকর্মীরা এসে যোগ দেন। তাদের সমন্বিত উদ্ধার দল দুপুর ১টার দিকে ডুবে যাওয়া ট্রলারটি গভীর পানির নিচে শনাক্ত করেন। এ সময় ট্রলারটির আশপাশ থেকে নিখোঁজ পুলিশের কনস্টেবল সোহেল রানার স্ত্রী ও আমলাপাড়া এলাকার শিশু আরাদ্ধ সরকারের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ সময় কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ রাসেল শেখ, ভৈরবের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) একেএম গোলাম মোর্শেদ খান, আশুগঞ্জের নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং উদ্ধার কাজ পর্যবেক্ষণ করেন।
