ডলার সংকট ও রিজার্ভ করার জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধিকে দায়ী করেছেন প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী। তিনি বলেছেন, ‘গত তিন বছরে দেশে ডাকাতি হয়েছে। আমি হিসাব করে দেখেছি, বৈশ্বিক চাপে রেখে তেল কোম্পানিগুলো ১৪ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় দেড় লাখ কোটি ডলার নিয়ে গেছে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশ ভালো করেছে, অনেক এগিয়ে গেছে এ কথা উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা যে ইশতেহার দিয়েছিলাম মানুষ তা গ্রহণ করেছে। এজন্য এটি মনিটরিং করা দরকার। সে অনুযায়ী কাজ কতটুকু করা সম্ভব হলো এ নিয়ে বিআইডিএস একটি গবেষণা কার্যক্রম হাতে নিতে পারে। সেখানে উন্নয়নের সবকিছু উঠে আসবে। কেননা আমরা একেকজন একটু একটু করে যা জানি তাই বলি। অথচ কী পরিমাণ কাজ হয়েছে তা মূল্যায়ন করা দরকার।’
গতকাল রবিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস) আয়োজিত এক সেমিনারে জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী এসব কথা বলেন।
‘আপকামিং দ্য ইকোনমিক মেনিফেস্টো অব দ্য আওয়ামী লীগ : ট্রেন্ডস অ্যান্ড চ্যালেঞ্জস ফর টুমোরোস বাংলাদেশ’ শীর্ষক এ সেমিনারটি হয়েছে দিনব্যাপী।
সেমিনারের প্রথম অধিবেশনে ‘অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রবণতার সারমর্ম : স্মার্ট বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ’ বিষয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের মহাপরিচালক বিনায়ক সেন। তার সঞ্চালনায় সেমিনারের এ পর্বে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী মেজর জেনারেল (অব.) আবদুস সালাম। সেখানে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা মসিউর রহমান ছিলেন বিশেষ অতিথি। এ ছাড়া আরও চারটি প্রবন্ধ উপস্থাপিত হয় এ অধিবেশনে।
বিকেলের অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী ও শিক্ষা এবং সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী প্রমুখ।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, দেশে আয়বৈষম্য বাড়ছে। ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে আর গরিবরা হচ্ছে গরিবতর। তবে গরিবদের কেউ কেউ ধনী হচ্ছে। সেই তুলনায় ধনীদের দ্রুততম সময়ে আরও ধনী হওয়ার প্রবণতা বেশি। এ পরিস্থিতি দূর করতে হবে। আর এখন উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এটা শুধু হলেই চলবে না, সেই অবস্থান ধরেও রাখতে হবে।
দ্বিতীয় অধিবেশনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এমএম আকাশ বলেন, ‘কভিডের পর দেশের সব অর্থনৈতিক সূচকে আমরা পিছিয়ে গিয়েছি। সেখান থেকে ইশতেহারে একটা রিকভারি প্ল্যান আমাদের আছে কি না, এটি এখন দেখার বিষয়।’ এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘খেলাপি খুঁজতে গেলে দেখা হয় তিনি কোন দল করেন। তিনি আওয়ামী লীগ করেন কি না। অনিচ্ছাকৃত খেলাপি আওয়ামী লীগ হলে ভিন্ন চিন্তা করতে হয়। স্বজনপ্রীতি হয়।’
অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেন, ‘দেশে ফরেন এক্সচেঞ্জ (বৈদেশিক মুদ্রা) আসতে শুরু করেছে। সর্বজনীন পেনশন আইন হয়েছে। দেশ উন্নতির দিকে যাচ্ছে। অনেকেই বলেছিল আমরা শ্রীলঙ্কার মতো হয়ে যাব কিন্তু তা হয়নি। অনেক আন্তর্জাতিক ব্যাংক ও সংস্থা আমাদের ঋণ দিতে এগিয়ে এসেছে। দেশে যেভাবে নতুন বিনিয়োগ আসছে তা ভালো দিক। বিশেষ করে জার্মান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সৌদি আরব বিনিয়োগে এগিয়ে আসছে।’
ড. মসিউর রহমান বলেন, বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের চাকরি না হলে শিক্ষা বেশিদূর এগোবে না। বাড়ির কাছাকাছি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হওয়ায় দেশে নারী শিক্ষার হার বাড়ছে। শতভাগ ছেলেমেয়ে স্কুলে যায়। তিনি মনে করেন, ওপরের দিকে শিক্ষার মান কমেনি।
ড. মশিউর বলেন, ইশতেহারে আর্থিক সংস্কার বলা হয়েছে, এ বিষয়ে সম্পূর্ণ দায়িত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। সরকার সেখানে হাত দেবে না।
ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী বলেন, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এটি গবেষণা আকারে করা হয়েছে। এটি হচ্ছে জনগণের কাছে রাজনৈতিক দলের অঙ্গীকার।
ইশতেহারের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষণ দরকার বলে মন্তব্য করেন অর্থনীতিবিদ মো. সাব্বির আহমেদ। তিনি বলেন, ইশতেহার শুধু কেন নির্বাচনের সময় আলোচনা হবে বরং প্রতি বছরই এটির কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে তা নিয়ে পর্যালোচনা করা দরকার। এজন্য মনিটরিং সেল করতে হবে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুস সাত্তার মণ্ডল বলেন, ইশতেহারের বিষয়গুলো নিয়ে আরও বিশ্লেষণ করতে হবে। কথা অনুযায়ী কাজ কতটুকু হলো সেটি দেখতে হবে।
অনুষ্ঠানের প্রথম সেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী আবদুস সালাম। তিনি বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার জন্য রাজস্ব আহরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ১০ থেকে ১১ দশমিক ১ শতাংশ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। মুদ্রা সরবরাহ, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে প্রধান হাতিয়ার নির্ধারণ করা হয়েছে নীতি ও সুদহার ব্যবহার।
বিনায়ক সেন বলেন, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় বিনিয়োগের হারকে যে ৩২ থেকে ৩৪ শতাংশে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে, তা একটি উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের জন্য যথেষ্ট নয়। শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি, অবহেলিত নগর দরিদ্রদের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া, বিদ্যালয়ে ও কর্মসংস্থানে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, কর-জিডিপির হার বৃদ্ধি, আয়বৈষম্য কমিয়ে আনাসহ ৯টি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে বলেছেন তিনি।
মূল্যস্ফীতি, মুদ্রা বিনিময় হার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক মনজুর হোসেন। তিনি বলেন, খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত উভয় মূল্যস্ফীতিই যখন ৯ শতাংশের বেশি, তখন জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানি তেলের দামের সঙ্গে অনেক বিষয় সম্পর্কিত। ফলে মূল্যস্ফীতিকে গুরুত্ব দিতে হলে তেলের দাম কখন বাড়াতে হবে, সেই সময়টাকেও মাথায় রাখা উচিত।
