জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ কিন্তু বিচারে অনিশ্চয়তা 

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২৪, ০৪:৫৪ পিএম

১৪ বছরে ৫৫টি মামলার রায় হয়েছে। শতাধিক ফাঁসির দণ্ডাদেশ, ২৫ জনের আমৃত্যু কারাদণ্ডসহ দেড়শোর বেশি আসামির সাজা হয়েছে। পৃথিবীতে যুদ্ধাপরাধের বিচার হয়েছে বা হচ্ছে এমন দেশগুলোতে এত অল্প সময়ে এতসংখ্যক রায়ের নজির নেই। তবু স্বাধীনতার ৫৩ বছরেও মানবতাবিরোধী সংগঠন হিসেবে জামায়াত, আলবদর, আলশামসের বিচার না হওয়ার হতাশা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন প্রতিক্রিয়া জানা গেছে।

তবে তারা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করতে ট্রাইব্যুনালের এই অর্জনকে সফলতা হিসেবেই দেখছেন। যদিও জামায়াত, আলবদর, আলশামসের বিচার নিকট ভবিষ্যতে শুরু হবে কি না, তা নিয়ে তাদের সন্দেহ রয়েছে। এ ছাড়া ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর আপিল বিভাগে বিচারাধীন মামলা শুধু বাড়ছে। এমন প্রেক্ষাপটে আজ ২৫ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ১৪ বছর পার করে ১৫ বছরে পড়ল।

মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে ২০১০ সালের ২৫ মার্চ ঢাকার পুরনো হাইকোর্ট ভবনে স্থাপিত হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বিচারকাজে গতি আনার লক্ষ্যে দুই বছর পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ নামে আরও একটি আদালত গঠন করা হয়। ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনাল-২-এর প্রথম রায়ের পর একই বছরের নভেম্বর পর্যন্ত মাত্র ১১ মাসে আরও ৯টি মামলার রায় হয় দুটি ট্রাইব্যুনালে। তবে, ছয় শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার পর থেকে বিচারের গতি কমতে শুরু করে। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে একটি ট্রাইব্যুনালে (ট্রাইব্যুনাল-১) বিচারকাজ চলতে থাকে। এখন বছরে গড়ে দুই থেকে তিনটি মামলার রায় হচ্ছে ট্রাইব্যুনালে।

জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ কিন্তু বিচারে অনিশ্চয়তা: একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের পাশাপাশি সংগঠন হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী জামায়াত, আলবদর, আলশামসের মতো সংগঠনের বিচারের দাবি বহু পুরনো। ২০১৩ সালের ১৫ জুলাই জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমকে দেওয়া আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায়ে একাত্তরে জামায়াতের বিতর্কিত ও নৃশংস ভূমিকার জন্য একে একটি ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে উল্লেখ করে ট্রাইব্যুনাল। 

অন্যদিকে জামায়াতকে ২০০৮ সালের নভেম্বরে নির্বাচন কমিশনের দেওয়া নিবন্ধনের বৈধতা নিয়ে রিটের পর ২০১৩ সালের ১ আগস্ট হাইকোর্ট দলটির নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয়। গত বছরের ২০ নভেম্বর আপিল বিভাগে জামায়াতের আপিল খারিজ হয়। ট্রাইব্যুনালের এমন পর্যবেক্ষণ ও হাইকোর্টের রায়ের পর জামায়াতের বিচারের দাবি আরও জোরালো হয়। সরকারের নির্দেশনার পর একই বছরের আগস্টে জামায়াতের বিষয়ে তদন্ত শুরু করে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। প্রতিবেদন প্রসিকিউশনে জমা দেওয়া হয় পরের বছরের ২৭ মার্চ। এতে জামায়াতের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ও গুরুতর সাতটি অভিযোগ আনা হয়।

ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরদের ভাষ্য, যখন তারা প্রতিবেদনটি যাচাই ও বিশ্লেষণ করে বিচারের জন্য অভিযোগ আকারে ট্রাইব্যুনালে দাখিল করবেন, তখন দেখা যায়, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনে ব্যক্তির পাশাপাশি সংগঠনের বিচারের বিধান নেই। সরকারের পক্ষ থেকে তখন আইনের সংশোধন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলা হয়। এরপর আইন সংশোধনের অংশ হিসেবে খসড়াতে আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় ব্যক্তির পাশাপাশি সংগঠন, সাংগঠনিক দায়, অভিযুক্ত ব্যক্তি বা সংগঠন এসব শব্দচয়ন যুক্ত করা হয়। কিন্তু আইন সংশোধনের অপেক্ষার প্রহর ১০ বছরেও শেষ হয়নি। 

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পৃথিবীর অন্যান্য দেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সঙ্গে তুলনা করলে এই কয়েক বছরে এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের শতভাগ সফলতা। তবে, জামায়াত ও পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না করলে এই বিচার অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কিন্তু এই বিচার এখন সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় নেই। যে কারণে যে উৎসাহ, উদ্যমে বিচারকাজ শুরু হয়েছিল, তাতে ভাটা পড়েছে।’

তিনি বলেন, ‘কেন জামায়াতের, পাকিস্তানিদের বিচার হচ্ছে না, সেটা সরকার ভালো বলতে পারবে। হয়তো আমেরিকার চাপ আছে। জামায়াতকে আমেরিকা মডারেট ইসলামী পার্টি মনে করে। পাকিস্তান আমেরিকার সহযোগী। তাদের বিচার করতে গেলে আমেরিকার সঙ্গে সরকারের একটা বিরোধ হতে পারে, যেটা সরকার চাইছে না।’

আইন সংশোধনের উদ্যোগের বিষয়ে জানতে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও কোনো সাড়া মেলেনি।

১৪ বছরে শতাধিক ফাঁসির রায় : ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন শাখার সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৫৫ মামলার রায়ে সাজাপ্রাপ্ত আসামির সংখ্যা ১৪৯ জন। এর মধ্যে ১০৬ জন আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে ট্রাইব্যুনালে। সর্বোচ্চ এই সাজা কার্যকর হয়েছে ছয়জনের। ফাঁসির দণ্ডাদেশ নিয়ে কারাগারে আছে ৫০ আসামি। এ ছাড়া সর্বোচ্চ দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে অর্ধেক (৫০ জন) এখনো পলাতক। অন্যদিকে ট্রাইব্যুনালের রায়ে আমৃত্যু কারাদণ্ডাদেশ হয়েছে ২৫ আসামির। এর মধ্যে ১২ জন এখনো পলাতক। দুজন (গোলাম আযম ও আব্দুল আলীম) সাজা খাটা অবস্থায় মারা যান। এ ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় হয়েছে ১২ আসামির বিরুদ্ধে। এই সাজার আসামিদের মধ্যে দুজন এখনো পলাতক। বিভিন্ন মেয়াদে সশ্রম কারাদণ্ড (২০ বছর পর্যন্ত) হয়েছে ছয়জন। এখন ট্রাইব্যুনালে ৩০টি মামলায় শুনানি ও বিচারের পর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যে ১৮টি মামলা রয়েছে সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে। আর সাক্ষ্য শেষে যুক্তিতর্কের পর্যায়ে আছে আটটি মামলা। অন্যগুলোর মধ্যে তিনটি রয়েছে অভিযোগ গঠনের পর্যায়ে। আর দুটি মামলা এখনো বিচারের পর্যায়ে আসেনি। ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০টি মামলা রয়েছে তদন্তের পর্যায়ে। 

ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর রানা দাসগুপ্ত দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিচারের যে গতি ছিল, সেই গতি হয়তো নেই। এটি এখন আলোচনাতেও নেই। কিন্তু বিচারকাজ কিন্তু অব্যাহত আছে। বছরে দুটি-তিনটি রায় হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালে রায় হচ্ছে, কিন্তু আপিলে শুনানি নিয়মিত হচ্ছে না। প্রশ্ন হচ্ছে, ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর, সাক্ষী, আসামি সবাই এখন বার্ধক্যে। কয়েক বছর পর আসামি বেঁচে থাকবে না, তখন বিচার করে কী হবে?’

জামায়াতের বিচার প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে জনগণের আকাক্সক্ষা থাকা সত্ত্বেও আইনের সংশোধনী না আনায় আমরা ধরে নিচ্ছি, নিকট ভবিষ্যতে সরকার আইনি উদ্যোগ নেবে এ রকম কিছু মনে হচ্ছে না।’

আপিল নিষ্পত্তিতে ধীরগতি : মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ট্রাইব্যুনালে রায় হলেও ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ড, আমৃত্যু কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের করা ৪০ আপিল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে এখনো বিচারাধীন। এসব আপিলের মধ্যে বেশিরভাগই ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) মামলা। আপিল বিভাগে ২০১৭ সালের ১৫ মে জামায়াতের দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আমৃত্যু কারাদণ্ড বহাল থাকার রায়ের পর আরেকটি আপিল নিষ্পত্তি হতে অপেক্ষা করতে হয় সাড়ে ছয় বছরের বেশি সময়। গত বছরের ১৪ নভেম্বর জামালপুরের শামসুল হক ওরফে বদর ভাইয়ের সাজা কমে ১০ বছর (ট্রাইব্যুনালের রায়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড) কারাদণ্ড দেয় আপিল বিভাগ।

অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন যুক্তরাষ্ট্র সফরে থাকায় তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। অতিরিক্ত জেনারেল এস এম মুনীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডেথ রেফারেন্সসহ অন্যান্য আপিল নিষ্পত্তি হয় কার্যতালিকার ভিত্তিতে এবং তা আদালতের ইচ্ছাধীন বিষয়। এ ক্ষেত্রে আদালত ও অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে যৌথ উদ্যোগ থাকে। কিন্তু আপিলগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করতে হবে, এ রকম কোনো তথ্য নেই।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত